তারেক রহমান
আলহাজ্ব এম এ লতিফ ভুঁইয়া
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ে পা দিলো। দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সময়ের গর্বিত সন্তান তারেক রহমান। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলের চতুর্থ চেয়ারম্যান হলেন তিনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন দলটির প্রথম চেয়ারম্যান। তার শাহাদত বরণের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার দ্বিতীয় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তারপর তৃতীয় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সংগ্রামে, সংকটে ও রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে প্রায় সাড়ে চার দশক দলটিকে নেতৃত্ব দিয়ে রাজনীতির শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ধারাবাহিকতার পর তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব গ্রহণ কেবল দলীয় নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ।
কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বদল কেবল দলীয় ঘটনা নয়; অনেক সময় তা একটি
দেশের রাজনীতির গতিপথ, জনগণের আশা-নিরাশা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলনও বয়ে
আনে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব
গ্রহণ তেমনই এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্বাসন, ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক
ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে এই নেতৃত্বে পৌঁছানো নিছক পদে আসীন নয়Ñ এটি একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক
উত্তরাধিকার, জনগণের প্রত্যাশা এবং সময়ের দাবির মিলনবিন্দু।
পিতা
শহীদ জিয়ার রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকার, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ
লড়াইয়ের সমান্তরালে তারেক রহমান নিজেকে গড়ে তুলেছেন মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে।
একসময় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন, মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলেন, তাদের
কথা শুনেছেন। তাই বলা যায়, স্বীয় যোগ্যতায় তিনি এই পদে আসীন।
তারেক
রহমানের জীবনে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ এক অস্বাভাবিক ও অগণতান্ত্রিক অধ্যায়। সে সময় জরুরি
অবস্থা জারি করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত, রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ এবং দুই প্রধান
রাজনৈতিক ধারাকে দুর্বল করার যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন
তারেক রহমান। বাস্তবতা হলো, ওয়ান-ইলেভেনের মূল লক্ষ্যই ছিল রাজনীতিকে ‘মাইনাস
ফর্মুলা’তে রূপ দেওয়া। বিশেষ করে, তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে
দেওয়া। সে সময় তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, গ্রেপ্তার ও শারীরিক-মানসিক
নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে আওয়ামী সরকারের ১৬ বছরের দুঃশাসন তাকে দমনের যে
চেষ্টা হয় বাস্তবে তা উল্টো ফল বয়ে আনে। কারাগার ও পরবর্তী নির্বাসিত জীবন তারেক
রহমানকে রাজনীতির বাইরে ছিটকে ফেলতে পারেনি, বরং সময়ের সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন
প্রতিরোধের প্রতীক। সেই অধ্যায় পেরিয়ে আজ তারেক রহমান আবারও রাজনীতির কেন্দ্রে। আজ
এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হলোÑ অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ ক্ষণস্থায়ী হলেও গণতান্ত্রিক
আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘস্থায়ী।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা সহজ ছিল না। একসময়ের ছাত্ররাজনীতি
থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসা, নির্বাসিত জীবন, মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতাÑ
সবকিছুর মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে
দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাকে সাংগঠনিকভাবে পরিণত করেছে। এই সময়ে বিএনপি একাধিক সংকট
অতিক্রম করেছেÑ দমন-পীড়ন, নেতৃত্বশূন্যতা, আন্দোলনের ব্যর্থতা ও পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ।
তবুও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং রাজনীতির মূলস্রোতে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের
অনন্য সাধারণ ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার
পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনায় যে দলটি সাহসী ভূমিকা রেখেছিল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর
রহমানের হাত ধরে যে রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়েছিলÑ জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র
ও উন্নয়নের সমন্বয়। সেই ধারার উত্তরাধিকার আজ তারেক রহমান। তাই তার নেতৃত্ব কেবল দলীয়
নয়, এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনের ধারক ও বাহক হওয়ার দায়িত্ব।
নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে তার সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। বাংলাদেশের রাজনীতি
আজ গভীর সংকটে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল, নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ, মতপ্রকাশের
স্বাধীনতা সংকুচিত, অর্থনীতি চাপের মুখে, তরুণ সমাজ হতাশ। এই বাস্তবতায় জনগণ একটি বিশ্বাসযোগ্য,
দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যৎমুখী নেতৃত্ব খুঁজছে। বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের
ওপর সেই প্রত্যাশার ভার এসে পড়েছে।
তবে প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে সম্ভাবনা। তারেক রহমান এমন এক প্রজন্মের
নেতা, যিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ নয়, বরং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন; যেখানে প্রযুক্তি
হবে সহায়ক, কিন্তু শাসন হবে জনগণের ইচ্ছায়। তার রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার উঠে আসেÑ
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, বিকেন্দ্রীকরণ; দমন নয়, সংলাপ; প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলন। এই
দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশকে বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের করে আনতে পারে।
তারেক রহমানের আরেকটি বড় শক্তি হলোÑ তার দলীয় কাঠামোর প্রতি গুরুত্ব।
তিনি জানেন, শক্তিশালী দল ছাড়া শক্তিশালী গণতন্ত্র সম্ভব নয়। তাই তৃণমূল পুনর্গঠন,
তরুণ নেতৃত্ব তৈরি, নারী ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা এসব বিষয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে জোর
দিয়েছেন। বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতি যদি সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নীতিনির্ভর হয়, তবে তা
দেশের রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে জনগণের নিরাপত্তা
মানে শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়; নিরাপত্তা মানে ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের
শাসন এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। এই বিস্তৃত অর্থে যদি বলা হয় ‘বাংলাদেশ তারেক রহমানের
হাতেই নিরাপদ’Ñ তবে সেটি কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং একটি দায়িত্বপূর্ণ উচ্চারণ। কারণ একটি
বড় বিরোধী দল বা সম্ভাব্য শাসক দলের নেতা হিসেবে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত, ভাষা ও কৌশল
দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে তার দায়িত্ব আরও বেড়েছে এই কারণে
যে- দলটি বহু বছর ক্ষমতার বাইরে। এই সময় বিএনপির ভুলত্রুটি, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং
অতীতের বিতর্কগুলো থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেমন স্বাভাবিক,
তেমনি ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতিও হতে হবে নৈতিক ও নীতিগতভাবে শক্ত।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরিÑ নেতৃত্ব মানেই অলৌকিক সমাধান
নয়। তারেক রহমানের সাফল্য নির্ভর করবে তিনি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি করতে পারেন,
ভিন্নমতকে কতটা শ্রদ্ধা করেন, দল ও দেশের স্বার্থে কতটা আত্মসমালোচনায় প্রস্তুত থাকেন।
একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার ধারণা এই পরীক্ষায় তারেক রহমান উত্তীর্ণ। দেশবাসীও
মনে করে আগামীর বাংলাদেশ তার কাছেই নিরাপদ।
তারেক রহমান একজন
ধৈর্যশীল, সংযত ও দৃঢ়চেতা মানুষ। শহীদ জিয়ার রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকার,
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ লড়াইয়ের সমান্তরালে তারেক রহমান নিজেকে গড়ে
তুলেছেন। আজ সরাসরি তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন নেতৃত্বশূন্যতায় ভোগা দলটি নতুন করে
সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনীতিতে ভারসাম্য ফেরার সম্ভাবনাও তৈরি
হচ্ছে। এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের রাজনীতি আজ গভীর আস্থার সংকটে। দীর্ঘদিনের
অগণতান্ত্রিক সরকারের কারণেÑ সংঘাত, দমন-পীড়ন ও বিভক্তির রাজনীতি মানুষকে ক্লান্ত
করেছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো নিজেকে কেবল একটি দলের
নেতা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা। আমরা মনে করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে যদি বিএনপি
একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে তা
কেবল দলীয় সাফল্য হবে নাÑ এটি হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ।
পরিশেষে বলবো- অভিনন্দন, নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আমরা মানি, আপনার পথ সহজ নয়, কিন্তু সম্ভাবনাময়। আপনার সিদ্ধান্তে, দূরদর্শিতায় ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় যদি জনগণের স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তবে বাংলাদেশ সত্যিই নিরাপদ থাকবেÑ গণতন্ত্রে, মর্যাদায় এবং ভবিষ্যতের আশায়। এই নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তির নয়, কোনো দলের নয়Ñ এটি রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব আজ আপনার কাঁধে। নিরাপত্তা মানে ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও নাগরিক মর্যাদা। সেই অর্থে বলা যায়Ñ বাংলাদেশ তারেক রহমানের হাতেই নিরাপদ।
আলহাজ্ব এম এ লতিফ ভুঁইয়া
রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক