বিশ্ব রাজনীতি
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৪ পিএম
বিশ্ব-রাজনীতির আকাশে আবারও ঘন কালো মেঘ। একদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি। এই অস্থিরতার কেন্দ্রে যে নামটি ঘুরে ফিরে আসছে, তা হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প। একসময় যাকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যতিক্রমী’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেছিলেন, আজ তিনি বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক অনিবার্য ঝড়ের প্রতীক। তার বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও হুমকির রাজনীতি শুধু আমেরিকার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়াÑ সর্বত্রই এই ঝড়ের আঁচ অনুভূত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র
নিজেকে বরাবরই ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ইতিহাসের
পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই দাবির আড়ালে রয়েছে শক্তি ও দম্ভের রাজনীতি। বিশ শতকের
শুরু থেকেই লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের নজির অসংখ্য। গুয়াতেমালা, চিলি, নিকারাগুয়া,
পানামাÑ একটির পর একটি দেশে সরকার পরিবর্তন, সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা অর্থনৈতিক চাপে
নতিস্বীকার করানোর ইতিহাস আছে।
শীতল যুদ্ধের
(কোল্ড ওয়ার) সময় ‘কমিউনিজম ঠেকানোর’ অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র বহু দেশে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে
হস্তক্ষেপ করেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ তার সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক
যুদ্ধ, আফগানিস্তান অভিযান কিংবা লিবিয়ায় ন্যাটো হস্তক্ষেপÑ সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের
নেতৃত্বে সামরিক শক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। ফলাফল হিসেবে কোথাও স্থিতিশীলতা আসেনি। বরং
যুদ্ধ, উদ্বাস্তু সংকট ও রাষ্ট্রের ভাঙন ত্বরান্বিত করেছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসই ট্রাম্প
যুগের রাজনীতিকে বোঝার ভিত্তি তৈরি করে। কারণ ট্রাম্প নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি। তিনি
বরং পুরনো আগ্রাসী ধারাকেই আরও প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক ভাষায় সামনে এনেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের
রাজনৈতিক স্লোগান ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। কথাটি শুনতে দেশপ্রেমিক মনে হলেও বাস্তবে
এর অর্থ দাঁড়ায়Ñ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে যেকোনো দেশকে চাপ দেওয়া, প্রয়োজনে হুমকি
দেওয়া কিংবা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত করা। ট্রাম্প কূটনীতির চেয়ে ব্যবসায়ীর মতো দরকষাকষিতে
বিশ্বাসী। তার কাছে আন্তর্জাতিক চুক্তি মানে লাভ-ক্ষতির হিসাব। লাভ না হলে চুক্তি ভাঙতে
দ্বিধা নেই। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা, ইরান পরমাণু চুক্তি বাতিল করা
কিংবা ন্যাটো মিত্রদের প্রকাশ্যে তিরস্কারÑ এসবই ট্রাম্পের একতরফা নীতির উদাহরণ।
ভেনেজুয়েলা ট্রাম্প
যুগের আগ্রাসী নীতির একটি জীবন্ত উদাহরণ। তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক
ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। কিন্তু সংকটের বড় অংশই তৈরি হয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার
কারণে। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা
আরোপ করে। তেলের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। সাধারণ
মানুষ খাদ্য ও ওষুধ সংকটে পড়ে। গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা সাধারণ
জনগণকেই বেশি ভুগিয়েছে। সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও দেশটির অর্থনীতি ভেঙে
পড়েছে। এটি শুধু ভেনেজুয়েলার গল্প নয়। এটি গোটা বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, অর্থনৈতিক
অস্ত্র কীভাবে আধুনিক আগ্রাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের আগ্রাসী
ভাষা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য নয়। ইউরোপীয় মিত্ররাও তার সমালোচনার শিকার হয়েছে।
ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইউরোপ যথেষ্ট খরচ করছে না। বাণিজ্য ইস্যুতে ইউরোপীয়
ইউনিয়নের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশ্নে ইউরোপ যখন নেতৃত্ব
দিতে চেয়েছে, তখন ট্রাম্প সেই প্রচেষ্টাকে তুচ্ছ করেছেন। এর ফলে ট্রান্সআটলান্টিক
সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে। ইউরোপ নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে আরও স্বনির্ভর হওয়ার
কথা ভাবতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বরাবরই
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির প্রধান ক্ষেত্র। ট্রাম্প যুগে ইরান এই আগ্রাসনের প্রধান
লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ইরান পরমাণু চুক্তি বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কঠোর
নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তেলের রপ্তানি সীমিত করা হয় এবং প্রকাশ্যে সামরিক হামলার হুমকিও
দেওয়া হয়।
এই নীতির ফলে
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-ইসরায়েল
শত্রুতা আরও প্রকাশ্য হয়েছে। পুরো অঞ্চল এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অথচ এই
চাপেও ইরান নীতিগতভাবে নতি স্বীকার করেনি। বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য আরও জটিল হয়েছে।
এশিয়ায় ট্রাম্পের
আগ্রাসনের প্রধান অস্ত্র বাণিজ্য যুদ্ধ। চীনের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করে তিনি বৈশ্বিক
সরবরাহ ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেন। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি
পুনর্বিবেচনার চাপ দেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কখনও হুমকি, কখনও বৈঠকÑ এই দ্বৈতনীতিও
এশিয়াকে অনিশ্চিত করেছে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কৌশল চীনকে আরও সংগঠিত
করেছে। আঞ্চলিক দেশগুলো এখন দুই শক্তির মাঝে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে।
ট্রাম্পের নীতির
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক ব্যবস্থায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বহুপাক্ষিক
কাঠামো গড়ে উঠেছিলÑ জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক চুক্তিÑ সেগুলোর ওপর
আস্থা কমেছে। একক শক্তির সিদ্ধান্তই মুখ্য হয়ে উঠেছে। ফলে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা জানে না, আগামীকাল কোন নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক তাদের
জন্য অপেক্ষা করছে। বিশ্ব-রাজনীতি যেন নিয়মের বদলে শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরাসরি
এই আগ্রাসনের লক্ষ্য না হলেও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব এড়াতে পারে না। বাণিজ্য, রেমিট্যান্স,
জ্বালানি ও খাদ্য বাজারÑ সবকিছুই বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা
বাড়লে জ্বালানির দাম বাড়ে। বাণিজ্য যুদ্ধ হলে রপ্তানি বাজারে চাপ পড়ে। তাই বাংলাদেশের
মতো দেশের জন্য প্রয়োজন সতর্ক কূটনীতি। বহুপাক্ষিকতার পক্ষে থাকা। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের
নীতি জোরালোভাবে তুলে ধরা।
ট্রাম্প ঝড়ে
কাঁপছে দুনিয়াÑ এই কথাটি শুধু একটি শিরোনাম নয়। এটি বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতির বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ইতিহাস দীর্ঘ। ট্রাম্প সেই ইতিহাসকে আরও উন্মুক্ত ও আক্রমণাত্মক
করেছেন। ভেনেজুয়েলা থেকে ইরান, লাতিন আমেরিকা থেকে এশিয়াÑ সবখানেই এই ঝড়ের ছাপ।
আমি মনে করি, আগ্রাসন কখনও চিরস্থায়ী সমাধান দেয় না। শক্তির রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাত জন্ম দেয়। তাই প্রয়োজন সংলাপ, সমঝোতা ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা। সুতরাং ঝড় নয়, মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে শান্তি ও সৌহার্দ্য।
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক