জুলাই সনদ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম
দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি মনে করে, ইতোমধ্যে শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হলেও এর বেশিরভাগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদের মূল চেতনা উপেক্ষিত রয়েছে। টিআইবির আশঙ্কা, সংস্কার কমিশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপেক্ষা করে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করলে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়ার বদলে আবারও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। সংস্থার মতে, দুর্নীতি দমন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলীয় প্রভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি সনদের লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নাগরিকদের আস্থা ফেরাতে হলে কেবল ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান সংস্কার জরুরি। অন্যথায়, জুলাই সনদের চেতনা অনুযায়ী স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত না হলে সকল উদ্যোগ ব্যর্থ হবে।
১২ জানুয়ারি রাজধানীতে টিআইবি কার্যালয়ে
এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও নিজস্ব বিবেচনার
ভিত্তিতে একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করার মৌলিক দিকগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে। টিআইবির মতে, সংস্কারের নামে তৈরি এই আইনি কাঠামো
কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার
পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের
সংস্কার অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ কমিশন ও জাতীয়
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি। দুদক
সংস্কারে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে
সাজা মার্জনার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা ‘দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়ার ফাঁদ’ হিসেবে
রয়ে গেছে। তার দাবি, টিআইবির কিছু
সুপারিশ বাস্তবায়িত হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপেক্ষিত থাকার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের।
এ কথা সত্য যে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কার, গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও সুশাসনের
প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রণীত জুলাই সনদ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই সনদের মাধ্যমে
রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নাগরিক অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য
নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
(টিআইবি) যে পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছে তা সত্যিই গভীর উদ্বেগের এবং জুলাই আন্দোলনে
আত্মত্যাগকারীদের প্রতি নির্দয় অবমাননা ছাড়া কিছু নয়। জুলাই সনদের মূল চেতনা এভাবে
উপেক্ষিত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
টিআইবির বক্তব্য অনুযায়ী, সনদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার কাগজে-কলমে
থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর
কার্যকর ভূমিকা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি
দেখা যাচ্ছে না। বরং নানা ক্ষেত্রে পুরনো চর্চা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তই প্রাধান্য
পাচ্ছে, যা সনদের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জুলাই সনদের অন্যতম মূল কথা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক
প্রভাবমুক্ত রাখা। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নিয়োগ, পদায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে
দলীয় তথা মহল বিশেষের আনুগত্য এখনও বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা
ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং নাগরিক আস্থা দুর্বল হচ্ছে। টিআইবি যথার্থভাবেই প্রশ্ন তুলেছে, যদি
প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হয়, তবে সনদের প্রতিশ্রুতি কতটা অর্থবহ থাকে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতার ঘাটতি। জুলাই সনদ নাগরিকদের
কাছে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা বাড়ানোর কথা বলেছিল। কিন্তু টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে,
বড় ধরনের নীতিগত ব্যর্থতা বা অনিয়মের পরও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে না। অনুসন্ধান
কমিটি গঠন বা আশ্বাসের মধ্যেই দায় সারা হচ্ছে, দৃশ্যমান শাস্তি বা সংস্কার খুব কমই
দেখা যাচ্ছে। আমরা মনে করি, টিআইবির সংবাদ সম্মেলন কেবল সমালোচনা নয়Ñ এটি একটি সতর্কবার্তা।
গণতন্ত্র ও সুশাসন কোনো এককালীন ঘোষণায় প্রতিষ্ঠিত হয় নাÑ এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহসী সংস্কার। জুলাই সনদ যদি সত্যিই একটি রূপান্তরের দলিল হয়,
তবে তাকে প্রতিদিনের শাসনচর্চায় প্রতিফলিত করতে হবে।
সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত টিআইবির এই পর্যবেক্ষণকে প্রতিপক্ষের
অভিযোগ হিসেবে না দেখে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ,
গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের দায়িত্বও এখানে কম নয়। জুলাই সনদের মূল চেতনা বাস্তবায়নের
দাবিতে সোচ্চার না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি আরেকটি বিস্মৃত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত
হবে। তাই এই পর্যবেক্ষণকে ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমরা আরও মনে করি,
এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে জুলাই সনদ কেবল একটি নীতিগত দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তাই সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত টিআইবির পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর
পদক্ষেপ নেওয়া। গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
করা।