× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

বৈশ্বিক বৈষম্য প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩২ এএম

বৈশ্বিক বৈষম্য প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় এবং সম্পদের বণ্টনে অসমতা এক দশক ধরে একই রকম আছে। জাতীয় আয়ের বড় অংশই ধনিকশ্রেণির মানুষের পকেটে চলে যাচ্ছে। স্বল্পসংখ্যক ধনীর হাতেই রয়েছে বেশি সম্পদ। প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন ২০২৬ সালে দেখা গেছে, দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশের মালিকানা সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এর মধ্যে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর কাছেই রয়েছে মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আর ৪ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পদের মালিকানা ৫০ শতাংশের হাতে। আয়ের ক্ষেত্রেও অসমতা প্রায় একই রকম। জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশই চলে যায় শীর্ষ উপার্জনকারী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। অন্য দিকে নিম্ন আয়ের ৫০ শতাংশ মানুষের সম্মিলিত আয় মাত্র ১৯ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে দেশের সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের আয়ের ব্যবধান সামান্যই কমেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই ব্যবধান ২২ থেকে কমে ২১ হয়েছে। বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মানুষের বার্ষিক গড় মাথাপিছু আয় ৬ হাজার ১০০ ইউরো বা ৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৫৪ টাকা (ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে)। আর গড় সম্পদ ৩০ হাজার ইউরো বা ৪২ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ টাকা (ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে)। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও বেশ কম, মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী লিঙ্গবৈষম্যের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে বৈষম্যের চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। আয় ও সম্পদ বণ্টনে ভারসাম্য আনতে যে ধরনের অগ্রগতি দরকার, তা এখনও সীমিত। ১০ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বিশ্বে আয় ও সম্পদ বণ্টনে বৈষম্যের চিত্রটিও ফুটে উঠেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে ব্যক্তিগত সম্পদের তিন-চতুর্থাংশই রয়েছে ১০ শতাংশ ধনীর হাতে। তার মধ্যে ৩৭ শতাংশ আবার ১ শতাংশ শীর্ষ ধনীর হাতে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈষম্যের বৈশ্বিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি। বাংলাদেশের ১ শতাংশ মানুষের কাছে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ২৪ শতাংশ। আর মোট জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ রয়েছে তাদের হাতে। কোন দেশে বৈষম্যের মাত্রা কেমন, তার ওপর বৈশ্বিক প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট-২০২৬’ বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন তথ্য দিয়েছে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে মানুষের আয়ের চেয়ে সম্পদের বৈষম্য অনেক বেশি। আয় ও সম্পদ উভয় বিবেচনায় দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের শীর্ষ বৈষম্যের দেশ। আয় বৈষম্যে দ্বিতীয় অবস্থানে কলম্বিয়া। সম্পদ বৈষম্যে দ্বিতীয় রাশিয়া। আয় বৈষম্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। ভারত ও পাকিস্তানে বৈষম্য বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে বিশ্বের ৪০টি দেশের বৈষম্যের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বৈশ্বিক বৈষম্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ৪০টি দেশের ওপর আলাদা পর্যালোচনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বৈষম্য মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং গত এক দশকে খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। আয়ের বিবেচনায় দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়ের মানুষ মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ উপার্জন করে। যেখানে নিচের ৫০ শতাংশের আয় মাত্র ১৯ শতাংশ। সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য আরও বেশি। শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে মোট সম্পদের প্রায় ৫৮ শতাংশ। আর শীর্ষ ১ শতাংশের হাতে রয়েছে ২৪ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধনী ১ শতাংশ মানুষের গড় সম্পদ ৭ লাখ ২৩ হাজার ২৩৮ ইউরো। প্রতি ইউরো ১৪২ টাকা ধরে, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে, নিচের দিকের ৫০ শতাংশের গড় সম্পদ এক হাজার ৪২২ ইউরো বা প্রায় দুই লাখ টাকা। তাদের হাতে রয়েছে সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তাদের ওপরের ৪০ শতাংশের কাছে রয়েছে সম্পদের ৩৭ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে ৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশে ওপরের দিকে আয়ের ১০ শতাংশ মানুষের কাছে রয়েছে জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, নিচের দিকের আয়ের ৫০ শতাংশের কাছে রয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশ। মাঝখানের স্তরে বাকি ৪০ শতাংশের কাছে রয়েছে ৪০ শতাংশ আয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় বছরে দুই হাজার ৮২০ ডলার। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্টে ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ১৫২ ইউরো। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী সাত হাজার ১৪৫ ডলার। একই পরিমাণ টাকা দিয়ে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন পরিমাণ পণ্য ও সেবা পাওয়া যায়। এ কারণে জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে পিপিপি ব্যবহার করা হয়, যাতে বিভিন্ন দেশের মানুষের প্রকৃত আয়ের ক্ষমতা, জীবনমান এবং অর্থনৈতিক অবস্থার ন্যায্য ও সঠিক তুলনা করা যায়।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি অর্জন করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টন করা সম্ভব হয়নি। ফলে উন্নয়নের সুফল সামান্য কিছু বিত্তবান পরিবারের হাতে চলে গেছে। এতে ধনী-দরিদ্রের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবধান আরও বেড়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সুরক্ষা দেওয়া। ১৯৭০ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কর্তৃক ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শীর্ষক পোস্টারের কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে থাকার কথা। সেই পোস্টারে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে আমরা ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। এখন ২২ হাজার পরিবারের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে বিদ্যমান আয়বৈষম্য ছিল অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয় শহর থেকে গ্রামে। ফলে বিত্তবান ও বিত্তহীনের মাঝে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে থাকে দ্রুতগতিতে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ এক নতুন যুগে পদার্পণ করেছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তার মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবদরদি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে জনগণ প্রত্যাশা করে। ভবিষ্যতে যারা সরকার গঠন করবেন, তাদের মনে রাখতে হবে জনগণ যদি বিরূপ হয়, তাহলে মহাশক্তিধর সরকারও ব্যর্থ হতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এটি বলা যায় যে, অন্তর্বর্তী সরকার দারিদ্র্যবিমোচন ও বৈষম্য দূরীকরণের তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তাই ভবিষ্যতে যারা সরকার গঠন করবেন, তাদের দারিদ্র্যবিমোচন ও বৈষম্য নিরসনের ইস্যুটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এটি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হবে দ্রুত একটি গণমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা, যার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে দারিদ্র্য হ্রাস পেতে পারে। 

 

 ড. মিহির কুমার রায়

গবেষক ও অর্থনীতিবিদ, সাবেক ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা