× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খালেদা জিয়া

আপসহীন নক্ষত্রের চিরবিদায়

মেশকাত সাদিক

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৫ এএম

আপসহীন নক্ষত্রের চিরবিদায়

অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হঠাৎ মৃত্যু আমাকে চরমভাবে আঘাত করেছে। ঠিক কী দিয়ে শুরু করব তা আজ মাথা থেকে আসছেই না। একেবারে ছাত্রজীবন থেকে শুরু করলে লেখা বড় হয়ে যায়। আবার শুরু না করলেও লেখা অপূর্ণ রয়ে যায়। তাই রাজনীতি বোঝার বয়স থেকেই শুরু করি। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। দেখলাম স্বৈরাচার এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন। তখন গণমাধ্যম বলতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিও। দুটি প্রচার যন্ত্রই এরশাদের গুণকীর্তনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করত। আর বাদবাকি সময় এরশাদ আমলের তথাকথিত সুশাসনের পরিকল্পনামাফিক কল্পিত সংবাদ প্রচার করত। আমরা কিছুটা নিরপেক্ষ সংবাদের প্রত্যাশায় সন্তোষ রেডিওতে বিবিসি’র সংবাদ শুনতাম। সংবাদ শোনা এবং এই সংবাদের বিষয়ে বড়দের কাছে বিশ্লেষণ শোনাই ছিল মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

এরশাদ আমলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ঘোষণা দিলেও শেখ হাসিনা সেই পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল। কিন্তু বেগম জিয়া অংশ নেননি। এই থেকে শুরু হলো বেগম খালেদা জিয়ার অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার সুদৃঢ়তা। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আপসহীনতা, গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে আপসহীনতা। পক্ষান্তরে পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ, পরবর্তীতে আবার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে আওয়ামী লীগ যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়। অবশ্য আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ প্রায় সবকটি দল স্বৈরাচার এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের এমন ঠকরাজনীতির পরও মোটামুটি সকলের ধারণা ছিল আ.লীগ ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু নির্বাচনের পর ফলাফল বলে দিল বাংলাদেশের মানুষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন। বেগম জিয়ার ব্যক্তিত্ব, আপসহীনতা ও সরল-রাজনীতিকে পছন্দ করেন। আওয়ামী লীগ তার ব্যাপক ধূর্তামির একটি শক্ত জবাবও পেয়ে গেল। কিন্তু ভারতের ষড়যন্ত্র থেমে গেল না। ভারতের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে আ.লীগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। সুতরাং প্রথমবার বিফল হলেও ‘র’-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে ভারত এগোতে লাগল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক দল জামায়াত ‘র’-এর পরিকল্পনায় পা দিল এবং বিএনপির বিরুদ্ধে আ.লীগের সঙ্গে যূথবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামল। আ.লীগ ও জামায়াতের শক্তিশালী কর্মীবাহিনী নিয়ে নেকড়ের মতো বিএনপির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলো। এই সময়ের একটা করুণ স্মৃতি মনে পড়ে। তখন আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। স্থানীয় পত্রিকায় লিখি। বন্ধুরা জানত। নির্বাচনের পর স্কুলে গেলাম। কয়েকজন আ.লীগের বন্ধু আমাকে দেখে কটাক্ষের হাসি হাসছে। আর আমি অসহায়ের মতো স্কুলের মাঠ দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলের বারান্দার দিকে যাচ্ছি। ক্লাসরুমের কাছাকাছি হতেই আমার একজন হিন্দু বন্ধু বলেছিল, ওরে কিছু ক’স না। ওর মা হেরে গেছে!

বাস্তবতা হলো, সেদিন থেকেই ম্যাডামকে মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করে এসেছি। এরপর শুরু হলো ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের আ.লীগের দুঃশাসনকাল। এই সময়ে জামায়াত বুঝতে পারল, বিএনপির বিরুদ্ধে আ.লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে কী ভয়াবহ ফলাফল। আ.লীগ জামায়াতের ব্যাপারে কতটা নৃশংস হতে পারে! ফলে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত আবারও জোটবদ্ধ হয়ে আ.লীগের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হলো। ২০০১ সালের নির্বাচনে আ.লীগের চরম বিপর্যয় হলো বিএনপি-জামায়াত জোটের কাছে। এই জোট মূলত ম্যাডাম খালেদা জিয়ার অনিন্দ্য নেতৃত্বের নিরাপস বাস্তবতা। ম্যাডাম জিয়ার মন্ত্রিসভায় জামায়াতের দুজন মন্ত্রীও স্থান পেলেন।

আবারও ‘র’-এর নজর পড়ল ম্যাডামের ওপর এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ কান্ডারি তারেক রহমানের প্রতি। ‘র’ নিয়ন্ত্রিত কিছু মিডিয়া ও এনজিও ম্যাডাম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত করার হীনষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। কারণ স্বাভাবিক নির্বাচনে আ. লীগ আর কখনও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এটি ভারত ও আ. লীগ বুঝতে পারল। আ. লীগ শুরু করল জ্বালাও পোড়াওয়ের রাজনীতি। মাসের পর মাস হরতাল দিয়ে জিম্মি করা হলো দেশকে। গান পাউডার দিয়ে শত শত মানুষ পুড়িয়ে মারল। ‘র’-এর সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় ‘একুশে আগস্ট’ গ্রেনেড হামলার নাটক সাজানো হলো। ৬৪ জেলায় মূর্খ-মুসলিম নামধারীদের ‘র’-এর ছত্রছায়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে একযোগে বোমা হামলা করা হলো। বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে ‘র’ নিয়ন্ত্রিত কিছু গণমাধ্যম দিনের পর দিন অপপ্রচার চালাতে লাগল। সাংবিধানিক বিধিনিষেধকে অমান্য করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মানি না বলে ধৃষ্টতা দেখাল আ.লীগ। এরপর ‘র’ -এর এজেন্ট সেনানায়ক মইন ইউ আহমেদ [লেন্দুপ দর্জির সমতুল্য] ক্ষমতা দখল করে, ভারতীয় দাস ফখরউদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা করল। ২০০৮ সালের এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনে আ. লীগ ব্যাপকভাবে জয়ী হলো। এরপর শুরু হলো তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে রাজনৈতিক হত্যা। জামায়াতকে ঘায়েল করে শুরু করল ম্যাডাম জিয়ার ওপর নিপীড়ন। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব কার্যত ভারতের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। ‘র’ নিয়ন্ত্রিত আ.লীগ সরকার বাংলাদেশের মানুষের ওপর বিশেষ করে মুসলমানদের সীমাহীন নিপীড়ন-নির্যাতন করে। সরকারের কোনো অর্গানকে ‘র’ নির্ভর করতে আ. লীগ বাদ রাখেনি। ম্যাডাম জিয়া দেশে থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়েই রইলেন।

বস্তুত তার সংগ্রাম ও নেতৃত্ব গুণাবলি উচ্চারিত হলেই সময় থমকে যায়। বাংলাদেশপন্থীদের দেশপ্রেমের স্মৃতির ভাঁজ খুলে যায়। রাজপথের ধুলো, কারাগারের দেয়াল, মিছিলের স্লোগান, সবকিছু একসঙ্গে ভেসে ওঠে ইথারে। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন নন শুধু, বাংলাদেশ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের জন্য তিনি সংগ্রাম, অবিচলতা, কঠোরতার সুদীর্ঘ-রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়ের প্রতীক। রাজনীতিতে তার পথচলা ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। কিন্তু দেশপ্রেমে থেমে যাওয়া তার অভিধানে ছিল না কখনও। মহান স্বাধীনতার ঘোষক সৎ-রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর দেশ যখন শোক ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন, তখন এক শোকাহত স্ত্রী দেশের কথা ভেবেই ধীরে ধীরে রাজনীতির বাস্তবতায় পা রাখেন। অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, তিনি কেবল আবেগী প্রতীক হয়ে থাকবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেন, রাজনীতি তার কাছে নিছক উত্তরাধিকার-ই নয়, বরং পবিত্র দায়িত্ব। তাই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিলে তার চির-আপসহীন অবস্থান। কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব, আন্দোলনের চাপ সবই ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের নিয়মিত অংশ। তিনি পিছু হটেননি। আপস করেননি। বরং বারবার ঘোষণা দিয়েছেন। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে মূল্য দিতেই হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো মধ্যপন্থা নেই। বারবার তাকে তাই কারাগারে যেতে হয়েছে। তিনি দেশের জন্য তা হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। তবে বিনা-অপরাধে কারান্তরীণ করার ইতিহাস কারাগারের দেয়ালে লেখা রবে চিরকাল। দেশকে ভালোবেসে হারিয়েছেন প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র। হারিয়েছেন হাজার হাজার আত্মীয়-পরিজন, স্বজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীকে। পুত্র তারেক রহমানকে নির্বাসিত করা হয়েছে। এরপর ম্যাডামকে বিনা চিকিৎসায় দিনের পর দিন হাজিরা দিতে হয়েছে আদালতে। সামান্য আপস করলেই তিনি রাজকীয়ভাবে বিদেশ যেতে পারতেন। স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু বিদেশ পাঠানোর জবাবে তিনি বারবার বলেছেন, ‘এই দেশ, এই দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।’ পৃথিবীর কোনো দেশে তাকে পাঠাতে পারেনি কেউ। কিন্তু অমোঘ মৃত্যু তাকে ডেকে নিয়ে গেল চিরতরে। তিনি আর ফিরবেন না ধূলিধরায়। তবে তিনি মানুষের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার দেশপ্রেম ও সত্য প্রতিষ্ঠায় আপসহীনতা চির-অম্লান হয়ে থাকবে পৃথিবীর ইতিহাসে। 


মেশকাত সাদিক

কলাম লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা