× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ত্রয়োদশ সংসদ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও প্রার্থিতা

মোহাম্মদ জয়নুল বারী

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৬ এএম

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও প্রার্থিতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনোনয়পত্র বৈধ বা অবৈধ হওয়া নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এর প্রাসঙ্গিক কিছু বিধিবিধান নিয়ে আলোচনা করা যায়। সংবিধানের ৭১(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো ব্যক্তি একই সময়ে দুই বা ততোধিক নির্বাচনী এলাকার সংসদ-সদস্য হইবেন না। কিন্তু একই সময়ে দুই বা ততোধিক নির্বাচনী এলাকা হতে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় বাধা নেই। তিনি যদি একাধিক নির্বাচনী এলাকা হতে নির্বাচিত হন তাহলে নির্বাচনের ত্রিশ দিনের মধ্যে তিনি কোন নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করতে ইচ্ছুক, তা নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে।

বিগত শতকের ৮০’র দশকে এরশাদবিরোধী ৩ জোটের আন্দোলনের সময় ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে বাম জোট প্রস্তাব করে যে ৮ দলীয় জোটনেত্রী শেখ হাসিনা ১৫০ আসনে এবং ৭ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৫০ আসনে প্রার্থী হবেন। এতে দুই নেত্রী সর্বাধিক আসনে জয়লাভ করার সম্ভাবনা ছিল। ফলে প্রকারান্তরে নির্বাচন অকার্যকর হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তখন রাষ্ট্রপতি এরশাদ ১৯৮৬ সালে অধ‍্যাদেশের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (RPO,1972) সংশোধন করে এর ১২(১) ধারায় বিধান করেন যে, একজন ব্যক্তি একই সময়ে সংসদের সাধারণ নির্বাচনে পাঁচটির বেশি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ২০০৮ সালে আইন সংশোধন করে আসনের সংখ্যা ৫টি থেকে কমিয়ে ৩টি করা হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২(১) ধারা আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৭১(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো ব্যক্তির একই সময়ে দুই বা ততোধিক অধিক আসনে প্রার্থী হতে বাধা নেই। সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য কোনো আইন প্রণয়ন করা যায় না, সংসদ এমন কোনো আইন প্রণয়ন করলে আইনের যে অংশটুকু অসামঞ্জস্যপূর্ণ সেটুকু বাতিল হবে।

আবার একাধিক আসনে বিজয়ী প্রার্থীকে সংবিধান অনুসারে নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে কমিশনকে জানাতে হবে তিনি কোন আসনের প্রতিনিধিত্ব করবেন। কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ধারা ৬৭ অনুযায়ী একাধিক আসনে বিজয়ী প্রার্থীকে নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেট প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে হবে তিনি কোন আসনে প্রতিনিধিত্ব করতে চান। সাধারণত ৭ দিনের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ হয়ে যায় এবং তিনি আরও ১৫ দিন অর্থাৎ মোট ২২ দিন সময় পাবেন এটিও সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই প্রতীয়মান হয়।

কোনো ব্যক্তির একাধিক আসনে প্রার্থী হওয়ার বিধান নির্বাচনে কূটকৌশল গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জনপ্রিয় বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা দুই বা তিনটি আসনে প্রার্থী হন এবং একাধিক আসনে জয়ী হলে একটি আসন রেখে অন্য আসন বা আসনসমূহ ছেড়ে দেন। এভাবে ছেড়ে দেওয়া আসনে আবার নির্বাচন হয় এবং দলের নেতৃত্বের আশীর্বাদপুষ্ট নেতা সেখানে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন। এ ক্ষেত্রে নিজ দল আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে থাকলে জয়লাভ সহজ হয়। অনেক সময় অন্য নির্বাচনী এলাকায় জয়ী হতে না পারা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে এরকম আসন থেকে নির্বাচিত করে সংসদে আনা হয়। একাধিক আসনে বিজয়ীর ছেড়ে দেওয়া আসনে আবার নির্বাচন আয়োজন করতে হয় এবং এতে কমিশন ও প্রশাসনের হয়রানি ও রাষ্ট্রের ব‍্যয় বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ ও আর্থিক সংশ্লেষের পরিমাণ বিবেচনায় সংবিধানের এ বিধানটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন : সংবিধানের ৬৬(২)(খ) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার বা থাকার অযোগ্য হবেন। বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনকারী দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য হবেন। কিন্তু যে দেশগুলোর নাগরিকত্ব গ্রহণকালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয় (দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ নেই), সেরকম কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জনকারীকে ওই দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পুনরায় গ্রহণ করতে হবে। বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের মনোনয়নপত্র বাছাইকালে বিষয়টি নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা দেখা দেয়। সাধারণত প্রার্থীগণ বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের একটি পত্র সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস বা হোম অফিসে প্রেরণের অনুলিপি/রিসিপ্ট দাখিল করেন এবং মনোনয়ন বৈধ করার জন্য প্রভাব বিস্তার, অসদুপায় অবলম্বন কিংবা উচ্চ আদালতে মামলা ইত্যাদি কোনো পন্থাই বাকি রাখেন না। তারপর নির্বাচন হয়ে গেলে ব্যতিক্রম ব্যতীত আর কেউ খোঁজ রাখে না। ফলে আদৌ অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ কার্যকর হয়েছিল কি-না জানা যায় না। এমপি/মন্ত্রী হয়েও বিদেশি নাগরকিত্ব বহাল থাকার কথা শোনা যায়। নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধন বা পরিপত্র জারি করে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ নিশ্চিতকরণে প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করতে পারে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য বিধান : গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হবে। দলীয় প্রার্থীর নাম একজন ভোটার কর্তৃক প্রস্তাবিত এবং একজন ভোটার কর্তৃক সমর্থিত হতে হবে। কিন্তু একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে তার নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটারের অন্তত ১% ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত সমর্থন তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। ২০০৮ সালে ১/১১ সরকারের আমলে এ বিধানটি করা হয়। ফলে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের বাইরে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া কঠিন হয়েছে। রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সকল আসনের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে থাকেন, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার দলের নেতৃত্ব বা সদস্যদের মতামত গ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পদ্ধতি গণতান্ত্রিক বা অংশগ্রহণমূলক করার কোনো বিধান আরপিওতে করা হয়নি। এর বাইরে থেকে একজন সৎ, যোগ্য ব্যক্তি প্রার্থী হতে চাইলে তাকে এলাকাভেদে ২-৫ হাজার ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর গ্রহণ করে দাখিল করতে হয়। অনেক ভোটার তার এনআইডি নম্বর, ভোটার নম্বর (জানাও কঠিন), মোবাইল নম্বর দিয়ে সমর্থক হতে চান না বা নিরাপদ বোধ করেন না। রিটানিং অফিসার তন্মধ্যে ৫/১০ জনকে যাচাই করেন এবং কোনো ভুল পেলে মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন। এটিও বৈষম্যমূলক। ২০২৪ সালের নির্বাচনে একটি জেলায় একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর ১% সমর্থকের একাধিক জনকে জোর করে ধরে নিয়ে প্রতিপক্ষ লিখিয়ে নেয় যে তারা সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করেননি এবং রিটার্নিং অফিসার মনোনয়ন বাতিল করেন। পরবর্তীতে ওই রিটার্নিং অফিসার প্রত্যাহার হন। প্রার্থীদের জন্য বৈষম্যমূলক, ভোটারদের জন্য হয়রানিমূলক এবং নির্বাচন পরিচালনাকারীদের জন্য সমস‍্যা সৃষ্টির এসব বিধান পুনর্বিবেচনা করা সমীচীন।

সংস্কার এবং পরিবর্তন নিয়ে এত আলাপ-আলোচনার পর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো সংস্কার ছাড়াই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। বছরের পর বছর যারা সুশাসন, সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে সরব থাকেন তারা দায়িত্ব পেয়েও তেমন কিছুই করতে পারেননি। দেখা যাক, রাজনৈতিক দলসমূহের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে কী কী সংস্কার প্রতিশ্রুতি থাকে এবং কতটুকু বাস্তবায়ন হয়।


মোহাম্মদ জয়নুল বারী

কলাম লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা