উচ্চ মূল্যস্ফীতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২৮ এএম
দেশের অর্থনীতির ভিত কাঁপাচ্ছে, মানুষের নিদারুণ কষ্ট বাড়াচ্ছে এক অদ্ভুত সংকট দাম বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমছে আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে। দেশের রোজনামচায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এতটাই ঊর্ধ্বমুখী যে, স্বাভাবিক বাজেটে মানুষ আর জীবনধারণ করতে পারছে না। এর মূল কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত দুই-তিন বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে।
পক্ষান্তরে মজুরি না বাড়ায় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতেই আয়বৈষম্য আরও চোখে পড়ার মতো। শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতার ছবি। সাধারণ মানুষের আয়ের বৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধির মধ্যে যেহেতু সঠিক সামঞ্জস্য নেই, তাই মানুষকে প্রতিদিনের বাজার থেকেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
৯ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
‘দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে
এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর অনেক দেশই কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে
মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ নীতি সুদহার বাড়ানোসহ নানা
উদ্যোগ নিলেও কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদন
অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ। এটি পুরো
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশের দেশ ভারতে মূল্যস্ফীতির হার এখন দশমিক ২৫
শতাংশ। দেউলিয়া অর্থনীতি থেকে ফিরে আসা শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ১ শতাংশ।
জেন-জির বিক্ষোভে নেপালে ওলি সরকারের পতন ঘটলে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেয়
একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এর প্রভাবও আছে মূল্যস্ফীতিতে। দেশটির অন্তর্বর্তী
সরকারের সামগ্রিক প্রচেষ্টায় এই হার ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। মূল্যস্ফীতিতে
পাকিস্তানই এখন বাংলাদেশের কাছাকাছি। দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এর
বাইরে ভুটান ও মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৩ দশমিক
৮৭ শতাংশ।
বলাবাহুল্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে
কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তা কোনো সুফল বয়ে আনেনি। এমনকি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেশকিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে বাজারের আমদানিপ্রবাহ ঠিক
রাখার চেষ্টা করে। এতসব উদ্যোগের পরও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি মূল্যস্ফীতি। ব্যবসায়ীরা বলেছেন,
নীতি সুদহার বাড়ানোয় ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়েছে। এতে করে বেড়েছে ব্যবসার খরচ। ফলে বিনিয়োগকারীরা
নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ কথা মানতে হবে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ
সরকারের শাসনামলে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ
ছিল। ২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার বিদায় নেওয়ার পর জনগণের মধ্যে
বিশ্বাস ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে কিছুটা হলেও
স্বস্তি দেবে। সেই লক্ষ্যে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ও মূল্যস্ফীতি কমাতে
নিত্যপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক-কর প্রত্যাহার, নীতি সুদহার বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপ
নিয়েছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই কাজে আসেনি। বরং মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলছে। সেই
সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জিনিসপত্রের দামও।
আমরা মনে করি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে একাধিক কারণ
কাজ করছেÑ সরবরাহ শৃঙ্খলার দুর্বলতা, সিন্ডিকেটের মতো ব্যবসায়িক অনিয়ম এবং কিছু ক্ষেত্রে
অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয়ের ঘাটতি। বিশ্লেষকরা বলছেন, পণ্যের সরবরাহ থাকলেও বাজারে কৃত্রিম
সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে, যা বাজার নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর দুর্বলতাকে আরও বিশৃঙ্খল
করেছে। অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণীদের জন্য মূল্যস্ফীতি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যাই
নয়Ñ এটি জনজীবন-সংকটও। এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দারিদ্র্যের হার পুনরায় বাড়ার সম্ভাবনা
থাকছে, যা বিগত দুই দশক ধরে অর্জিত কিছু অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে
পারে।
সাম্প্রতিক বাস্তবতা
আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি জটিল অর্থনৈতিক কাজ। এর জন্য
দরকার সমন্বিত নীতি, দৃঢ় বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ শৃঙ্খলা,
শক্তিশালী তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সিন্ডিকেট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ
গ্রহণ এবং যথাযথ আইন প্রয়োগ। শুধু শুল্কহার কমানো বা নীতিগত ঘোষণায় কাজ হবে নাÑ প্রকৃত
জায়গায় বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ
এশিয়ার গড়ে মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিছু অগ্রগতি দেখালেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে
পিছিয়ে যাচ্ছে। এই সত্যকে মেনে আমাদেরকে সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রেই আরও কঠোর, স্বচ্ছ
ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখা দরকার, অর্থনীতি শুধু নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়Ñ এটি মানুষের
জীবনের মান নির্ধারণের বিষয়। তাই দরকার মানুষের জীবনকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে
রেখে উচ্চ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ করা। এই ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে সংকট শুধু আজকের সুসময়ের
দিকে আঘাত করবে নাÑ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকেও বিপন্ন করবে।