× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

শীতের নীরব আঘাত

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৮ এএম

শীতের নীরব আঘাত

বাংলাদেশে শীত একটি পরিচিত ঋতু। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কুয়াশা, হিমেল বাতাস ও ক্রমশ কমতে থাকা তাপমাত্রা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কিছুটা শ্লথ করে দেয় এটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু যখন এই শীত স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয়, তখন তা আর নিছক ঋতুপরিবর্তনের ঘটনা থাকে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার আশঙ্কা মানে হলো এবারের শীত মানুষের জীবন, জীবিকা ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। শৈত্যপ্রবাহ এক ধরনের নীরব দুর্যোগ। এটি বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হঠাৎ আঘাত হানে না, আবার শব্দ, ধ্বংস বা নাটকীয় দৃশ্যও তৈরি করে না। অথচ এর প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের শরীর, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে চেপে ধরে। শীত যত তীব্র হয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশে শীতের প্রকোপ সর্বত্র সমান নয়। উত্তরাঞ্চল, নদীবেষ্টিত এলাকা, চর ও হাওর অঞ্চলে শীতের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা পড়ে, সূর্যের দেখা মেলে দেরিতে, আর ঠান্ডা বাতাস দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। ফলে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে শীত আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে। কৃষক মাঠে যেতে পারেন না, দিনমজুররা কাজ হারান, নৌপথে চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় বাজারে যাতায়াত কমে যায়, পণ্য পরিবহনে দেরি হয়। শহরাঞ্চলেও কুয়াশার কারণে যানবাহনের গতি কমে, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ভাটা পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়, বিশেষ করে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের ক্ষেত্রে শীত তাদের নিয়মিত পড়াশোনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা না দিলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। কৃষি খাতে অতিরিক্ত ঠান্ডা বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট করতে পারে, শাকসবজির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, আলু ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলে রোগ দেখা দেয়। কৃষকরা অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়েন, লাভের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। পশুপালন খাতেও শীতের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গবাদিপশু ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হলে দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যায়। অনেক দরিদ্র পরিবার, যাদের আয়ের বড় উৎস গবাদিপশু, তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পণ্য সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যার চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এভাবে শীত ধীরে ধীরে অর্থনীতির নিচুস্তরে অস্থিরতা তৈরি করে।

শৈত্যপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। ঠান্ডাজনিত রোগ-সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, হাঁপানিÑ শীতের সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায়, যা বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। শীতজনিত মৃত্যু অনেক সময় নীরবে ঘটে। এসব মৃত্যু খুব কম ক্ষেত্রেই আলোচনায় আসে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো প্রতিরোধযোগ্য। পর্যাপ্ত গরম কাপড়, উষ্ণ আশ্রয়, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা পেলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব। প্রশ্ন হলোÑ এই নীরব মৃত্যুগুলো রোধে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা কার্যকর?

শীত কেবল রাষ্ট্রের নয়, সমাজেরও দায়িত্ব পরীক্ষা করে। বিত্তবান ও সক্ষম মানুষের উচিত এই সময়ে এগিয়ে আসা। একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা উষ্ণ খাবারের ব্যবস্থা কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এটি দান নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব। আবহাওয়া পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলবায়ু অভিযোজনকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে শীতকে আর অবহেলা না করা হয়।

পরিশেষে বলতে চাই, তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রিতে নেমে আসা শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি আমাদের প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বাস্তব পরীক্ষা। শীত একদিন কেটে যাবে, কিন্তু এই সময়ে আমরা কী করলামÑ সেটিই সমাজ ও ইতিহাস মনে রাখবে। এই শৈত্যপ্রবাহ হোক আতঙ্কের নয়, বরং সচেতনতা, দায়িত্ব ও সহমর্মিতার উপলক্ষ। কারণ শীতের নীরব আঘাত মোকাবিলা করা যায় কেবল সম্মিলিত দায়িত্ববোধ দিয়েই।

 

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা