শীতে জনজীবন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৩৬ পিএম
শীতকাল প্রকৃতির জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অনেক সময় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গত কয়েক দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহ, ঘনকুয়াশা ও শীতলবাতাস সেই দুর্ভোগের আভাসই দিল। তীব্র শীতের প্রকোপে দেশের প্রতিবেশ-পরিবেশ এখন কার্যত বিপর্যস্ত। নগর থেকে গ্রাম সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে সমানভাবে। এই মৌসুমে কেন এমন শীত তার কারণ খুঁজছেন আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। এবারের শীত একদিকে যেমন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে, তেমনি শীতকালীন বিভিন্ন রোগব্যাধির মাত্রাকে বাড়িয়ে তুলেছে, একইভাবে কৃষিক্ষেত্রে চাষাবাদের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এতে জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ, কৃষি খাত এবং শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য। অনেকেই মনে করছেন, এবারের শীত ও কুয়াশার আধিক্য সারা দেশে দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ বাড়াতে পারে।
৮ জানুয়ারি প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ ‘তীব্র শীতে আক্রান্ত মানুষ এবং শস্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনে শীতে প্রাণ-প্রকৃতি
ও পরিবেশের যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে তার চিত্রই উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ৪৪ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে
যাচ্ছে এই মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ। আবহাওয়া অফিস বলছে, এটি অব্যাহত থাকবে
আরও কিছুদিন। পাশাপাশি থাকবে কুয়াশার দাপটও। জানা গেছে, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে শীতের
প্রকোপ বেড়ে চলছে। এরই মধ্যে ৩১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। শীতের এই
তীব্রতায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। অর্থনৈতিক কার্যক্রম মন্থর হয়ে পড়েছে। ঘন
কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে কাজে বের হতে পারছেন না শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও
ভাসমান ছিন্নমূল মানুষ। তাদের সংসারে চলছে এক ধরনের হাহাকার। ফুটপাত ও খোলা জায়গায়
আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন অনেকে। শীতের তীব্রতার প্রভাব পড়ছে বোরো
ধানের বীজতলায়। দীর্ঘ সময় কুয়াশা, রাতে শিশির ঝরা ও দিনের সূর্যের আলো কম থাকায়
কোথাও কোথাও এই বীজতলা হলুদ বর্ণ ধারণ করছে। অন্যদিকে তীব্র শীতে সারা দেশে
ঠান্ডাজনিত রোগবালাই বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে হালকা জ্বর, শরীর
ব্যথা, মাথাব্যথা, শরীর দুর্বল লাগা ও ক্ষুধামান্দ্যসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব
বেড়েছে। নোয়াখালীতে ঠান্ডা-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত
হয়ে ৫৭ শিশুর মৃতের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে আবহাওয়াবিদ ড. মো.
বজলুর রশীদ বলছেন, শীতের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে সর্বোচ্চ (দিনের) ও সর্বনিম্ন
(রাতের) তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়া। সাধারণত এ পার্থক্য ১০ ডিগ্রির নিচে থাকলে
তখন শীতের অনুভূতি বাড়তে থাকে।
বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিবছরই শীতে অসহায় মানুষের মৃত্যু সংবাদ আমাদের
বিবেককে নাড়া দেয়, অথচ স্থায়ী সমাধান আজও অধরা। শীতের প্রকোপে দিনমজুর, রিকশাচালক,
খেটে খাওয়া মানুষ কাজে যেতে পারছেন না। কুয়াশার কারণে সকালবেলা কাজ শুরু হতে দেরি হচ্ছে,
আয় কমছে। ফুটপাতে বসবাসকারী মানুষদের জন্য শীত হয়ে উঠেছে মৃত্যুঝুঁকির সমান। পর্যাপ্ত
শীতবস্ত্রের অভাবে অনেকেই রাত পার করছেন খোলা আকাশের নিচে। বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, এবার
শীতার্ত মানুষের পাশে সরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উপস্থিতি
সেভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে না।
এবারের শীতে বড় আঘাত পড়ছে কৃষিতে। বোরো মৌসুমের শুরুতে তীব্র ঠান্ডা
ও কুয়াশা শস্যক্ষেতের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। শাকসবজি ও আলুর ক্ষেতে ছত্রাকজনিত
রোগ বাড়ছে। বহু স্থানে শীতজনিত রোগে ফসল নষ্ট হচ্ছে। ফলে কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আগাম প্রস্তুতি নিতে পারছেন নাÑ এটিও উদ্বেগজনক।
এটা সত্য যে, শীতকাল মানেই স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি চাপ। এ সময় ঠান্ডাজনিত
রোগ হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। শিশু ও প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। গ্রামাঞ্চলে এখনও
অনেকে খোলা আগুনে গা গরম করেন, যা অগ্নিকাণ্ড ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে
শীতকালীন রোগীর চাপ বাড়লেও পর্যাপ্ত ওষুধ, শয্যা ও চিকিৎসক সংকট থেকে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও সমাজের আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। আমরা
মনে করি, সরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন সহায়তা আরও বাড়ানোর দরকার। শুধু তাই
নয়, এই সহায়তা যেন সময়মতো ও প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছে তা নিশ্চিত করতে হবে। এই
ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন।
কৃষকদের জন্য শীতসহনশীল বীজ, রোগবালাই প্রতিরোধে কৃষি পরামর্শ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের
জন্য প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য খাতে শীতকালীন রোগ মোকাবিলায় বিশেষ প্রস্তুতি,
গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা ও বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন
সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থবানদের শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
শীত আমাদের জন্য নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবছর একই দুর্ভোগ নতুন করে প্রশ্ন
তোলে আমরা কি প্রস্তুত? আমরা মনে করি, মানবিক দায়বদ্ধতা, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যকর
ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই শীতের এই বিপর্যয়কে সহনীয় করা সম্ভব। শীতকে নয়, সবার লক্ষ্য
হোক শীতজনিত বিপর্যয়কে জয় করা।