× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খালেদা জিয়া

এই মৃত্যু একটি যুগের সমাপ্তি

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৭ পিএম

এই মৃত্যু একটি যুগের সমাপ্তি

২০২৫ সালটি শেষ হলো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয়তাবাদী শক্তির এক বটবৃক্ষ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল ও তাকে দলমতনির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষের চোখের পানিতে চিরবিদায়ের মাধ্যমে। ২৩ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে উদ্বেগ বিরাজ করছিল। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া। সেদিন ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি জানায়, ‘আমাদের প্রিয় জাতীয় নেতা আর আমাদের মাঝে নেই।’


১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশে দিনাজপুর জেলা) বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। সেখানে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। স্বামীর জীবদ্দশায় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে হয়নি, বরং পরিস্থিতি ও সময় তাকে বাধ্য করেছে রাজনীতিতেতে আসতে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদতবরণ করেন। জিয়ার মৃত্যু দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। বছরের পর বছর ক্যু আর পাল্টা ক্যুর পর দেশে যে স্থিতিশীলতা জিয়াউর রহমান ফিরিয়ে এনেছিলেন, তার অবর্তমানে তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠাতা হারানো বিএনপি তখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। ঠিক সেই সময়ই দলের অভ্যন্তরীণ বিভেদ মেটাতে এবং জিয়ার আদর্শ ধরে রাখতে খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের চাপে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েও তিনি যেভাবে গৃহকোণ ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন, তা ছিল বাংলাদেশের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা। ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু সেই পদে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা ছিল আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ৯ বছরের সেই দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন, বারবার কারাবরণ ও গৃহবন্দি হয়েছেন, কিন্তু তৎকালীন সামরিক শাসকের কোনো প্রলোভন বা রক্তচক্ষু তাকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তার অনমনীয় নেতৃত্বের মুখে স্বৈরশাসক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ঘটে। যার অধিকাংশ কৃতিত্ব ছিল বেগম খালেদা জিয়ার।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম একটি সময়, একটি দর্শন, একটি আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। আপসহীনতা, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে যিনি কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন। আন্দোলন, সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের এক অগ্নি-মশাল নিভে গেল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তার দৃঢ়তা, আপসহীনতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবিচল অবস্থান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের অবসান হলো, যা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ শুধু একজন নেত্রীর চলে যাওয়া নয়, বরং আপসহীন সংগ্রামের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, যা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তার ইন্তেকাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ‘উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি' হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় রাজনীতির ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তাকে আজীবন স্মরণীয় করে রাখবে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের সরকারপ্রধান এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা, দ্বন্দ্বে জর্জরিত কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাস গড়া এক অধ্যায়। তার অনুপস্থিতি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, সমগ্র জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক শূন্যতা তৈরি করেছে।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর অন্যতম প্রধান ধারক। তিনি বিশ্বাস করতেন- এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি তাদের নিজের হাতেই থাকতে হবে। তার পররাষ্ট্রনীতি ছিল সুসংহত ও মর্যাদাপূর্ণ। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করেছিলেন। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার কঠোর অবস্থান তাকে দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছিল।

গত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের দেড় দশকে বেগম খালেদা জিয়াকে যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা বিশ্ব-রাজনীতিতে বিরল। দুর্নীতির কথিত অভিযোগে তাকে ২০১৮ সালে কারারুদ্ধ করা হয়। বয়স ও ভগ্নস্বাস্থ্য সত্ত্বেও তিনি যেভাবে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা তার সংগ্রামী জীবনেরই অংশ। কনিষ্ঠ পুত্র কোকোর ইন্তেকালের বেদনা এবং বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েও তিনি নিজ দেশের মাটি ছেড়ে যাননি। তার এই নিভৃত বেদনা ও ধৈর্য্য তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আরও উচ্চ আসনে বসিয়েছে। তার সংগ্রামী জীবন ও সংগ্রাম কেবল একটি দলের ইতিহাস নয়, বরং তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের এক জীবন্ত দলিল। ক্ষমতার গদি নয়, বরং জনগণের ভালোবাসা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। তার প্রয়াণের পরও তার অটল আদর্শ, আপসহীন চেতনা এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আগামী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

২০২৪-এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার উত্তাল বিপ্লবে যখন দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান প্রতিবেশী ভারতে তখন খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন। হাসিনার পতনের পরদিনই, ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আদেশে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তার দীর্ঘ ৬ বছরের কারাবাস ও কার্যত গৃহবন্দিত্বের। যে নেত্রীকে তিলে তিলে শেষ করার জন্য ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ থেকে ‘সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি’ বানানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল আওয়ামী সরকার, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি মুক্ত হন বীরের বেশে, আর তার নির্যাতনকারী লুকিয়ে তার সমর্থক ও দলীয় নেতাকর্মীদের ফেলে রেখে দেশ ছাড়া হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি অনিবার্য নাম, একটি যুগ, একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং এক দীর্ঘ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছেন ও থাকবেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিনের বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার জীবন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনী নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক প্রামাণ্য দলিল। তার ইন্তেকালে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও, কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেনÑ গণতন্ত্রের বাস্তবতা, বিরোধী রাজনীতির পরিসর, রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা-সেগুলো আজও অমীমাংসিত।
খালেদা জিয়া কেবল একটি নাম ননÑ একটি অসমাপ্ত সংগ্রাম। তার জীবনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বুঝতে সাহায্য করে। এই উপলব্ধিই তার প্রতি প্রকৃত শ্রুদ্ধা, তাকে স্মরণ করা মানে তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া এবং একটি অধিকতর ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র গড়ার অঙ্গীকার করা। রাজনৈতিক আদর্শে মতবিরোধ থাকলেও বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীনতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার অবদানের প্রশ্নে এদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ  একমত। তার মৃত্যুতে দলমতনির্বিশেষে শোক, সমবেদনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে সেটা প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়াও ইতিহাসের পাতায় কীর্তিমান হয়ে থাকবেন প্রাসঙ্গিক।



এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা