বঙ্গোপসাগর দূষণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩০ এএম
আমাদের একটি সাগর বা উপসাগর আছে। বিপুল সম্পদে ভরা এই বঙ্গোপসাগর আমাদের সমৃদ্ধির বিশাল আধার। সম্প্রতি সেই সাগর ঘিরে এসেছে বিরাট দুঃসংবাদ। সেই দুঃসংবাদ দূষণের। বঙ্গোপসাগরে আশঙ্কাজনক হারে মাছের সংখ্যা কমছে। বিপরীতে বাড়ছে এক ধরনের জেলিফিশ। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেমের ওপর চালানো এক জরিপ ও গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্লাস্টিক দূষণ সাগরের দুই হাজার মিটার (দুই কিলোমিটার) গভীরে পৌঁছেছে। ৬ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ-সংক্রান্ত কমিটি গবেষণা প্রতিবেদনটি জমা দেয়। গবেষকরা বলছেন, জেলিফিশের আধিক্য সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এরা মাছের খাবার, ডিম ও পোনা খেয়ে ফেলে। ফলে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন কমে যায় এবং জেলেদের জীবিকায় প্রভাব পড়ে। কিছু জেলিফিশের বিষাক্ত শুঁয়া মানুষের ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। কিছু প্রজাতির বিষ প্রাণঘাতীও। এদের কারণে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ে। আর সাগরের দুই হাজার মিটার গভীরতায় প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়াও শঙ্কিত হওয়ার মতো। সংবাদটি পরিবেশ ও দেশের অর্থনীতি খাতের জন্য উদ্বেগজনক বইকি।
৭ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বঙ্গোপসাগরে মাছ কমে বেড়েছে
জেলিফিশ, প্লাস্টিক দূষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর
পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়। আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী এই জরিপে অংশ নেন। এদের
১৩ জন বাংলাদেশি। গবেষণায় ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় মাছ
ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ করছে। এর মধ্যে ৭০টির শব্দতরঙ্গ-নির্ভর
প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক মাছ ধরায় যুক্ত। এটি অত্যন্ত আগ্রাসী
একটি পদ্ধতি। এতে কিছু জেলে লাভবান হলেও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরেনÑ এমন জেলেরা
ক্ষতির মুখে পড়ছেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেছেন, এভাবে লক্ষ্যভিত্তিক মাছ
ধরা চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষণায় দুটো
সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে, একটি গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের আধিক্য এবং একই সঙ্গে
সুন্দরবনের নিচে একটি মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের সন্ধান। আমরা এগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের
জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এ কথা সত্য, বঙ্গোপসাগর
শুধু বাংলাদেশই নয়, সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের জন্য
এক অপরিহার্য সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর চেহারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
একদিকে মাছের প্রজাতি ও পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, অন্যদিকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে
জেলিফিশের আধিপত্য। একই সঙ্গে সাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। এই তিনটি
প্রবণতা একসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের ভবিষ্যৎকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এর
জন্য দায়ী মূলত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড। জেলেদের ভাষ্য, আগে যেখানে জাল ফেললেই ইলিশ,
রূপচাঁদা, টুনা বা লইট্টা মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে জালভর্তি জেলিফিশ ওঠে।
জেলিফিশ অর্থনৈতিকভাবে মূল্যহীন। এটি জাল নষ্ট করে এবং মাছ ধরার কার্যক্রম ব্যাহত
করে। ফলে জেলেদের আয় কমছে, তাদের জীবন-জীবিকা পড়ছে চরম অনিশ্চয়তায়।
এটা স্পষ্ট, সাগরে মাছ কমে যাওয়ার পেছনে
অতিরিক্ত ও অবৈধ মাছ ধরা, প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা না মানা, শিল্পবর্জ্য ও
রাসায়নিক দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধিÑ সবকিছু মিলেই
স্বাভাবিক আবাস ধ্বংস হওয়া। মাছ কমে গেলে খাদ্যশৃঙ্খলে ভারসাম্য নষ্ট হয়, আর সেই
সুযোগে দ্রুত বংশবিস্তার করে জেলিফিশ। জেলিফিশ বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো
প্লাস্টিক দূষণ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য নদীপথে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে
জমা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিক ভাঙতে ভাঙতে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়,
যা মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে তাদের মৃত্যু ঘটায়। কিন্তু
জেলিফিশ তুলনামূলকভাবে দূষিত পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে
সাগরের দখল ধীরে ধীরে তাদের হাতেই চলে যাচ্ছে।
আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু
পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকও। মৎস্য খাত বাংলাদেশের জিডিপি ও রপ্তানিতে
গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। মাছ কমে গেলে প্রোটিনের জোগান সংকুচিত হবে, বাড়বে
খাদ্যঘাটতি। উপকূলীয় এলাকার লাখো জেলে পরিবার আরও দরিদ্র হয়ে পড়বে। তাই এখনই
কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বঙ্গোপসাগর একসময় ‘মৃত সাগরে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে
দেওয়া যায় না। এই ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন
বাধ্যতামূলক করা, নদী ও সাগরে বর্জ্য ফেলায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই
সঙ্গে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক গবেষণা বৃদ্ধি এবং জেলেদের সচেতনতা
বাড়াতে হবে।
মনে রাখতে হবে, বঙ্গোপসাগর আমাদের সম্পদ,
আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই বঙ্গোপসাগরকে বাঁচাতে এবং দূষণ রোধ করতে প্লাস্টিক বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য
নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন
অপরিহার্য। মাছের বদলে
যদি সাগরে শুধু জেলিফিশ আর প্লাস্টিক ভাসে, তবে তার দায় সরকারের এড়ানোর সুযোগ নেই।
এখনই সময় সতর্ক হওয়ার, নইলে ক্ষতির দায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই বহন করতে হবে। সংকট
নিরসনে সচেতনতা বৃদ্ধি ও
কার্যকর নীতি গ্রহণ করা জরুরি।