খালেদা জিয়া
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২১ এএম
উৎসর্গ মানে সব সময় হারানো নয়, বরঞ্চ বেছে নেওয়ার চেয়ে বেশি কিছু। এর অর্থ হলো বৃহত্তর অর্জনের জন্য ক্ষুদ্রতর বিসর্জন। মহৎ নেতৃত্ব বিরক্তি নয়, বরং স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারলে দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। যারা দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেন, তারা জীবিতদের মধ্যে জীবনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেন। পরিবার ও জাতির জন্য ত্যাগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যখন পরিবারের জন্য ত্যাগ করে তখন সে পরিবার লাভবান হয়। কোনো ব্যক্তি যখন জাতির জন্য কিছু করে তখন সে জাতি চিরতরে কিছু অর্জন করে, যদিও সে ব্যক্তির পরিবার চিরদিনের জন্য হারায়। আত্মস্বার্থ ও উৎসর্গের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হলে দ্বিতীয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইতিহাসের বিখ্যাত নেতারা ব্যক্তিগত কর্মসূচিকে জাতীয় কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে নিতেন। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সফলতার কোনো সহজ, নির্বিঘ্ন দ্রুত উপায় নেই।
দেশপ্রেম কি জাতীয়
গর্ব, না উগ্র স্বাদেশিকতা? অবশ্যই জাতীয় গর্ব। আমার দেশ তোমার দেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর
এমন অভিব্যক্তির মাধ্যমে মূলত দেশপ্রেম প্রকাশ করাটা জরুরি নয়। এটি অত্যন্ত সংকীর্ণ
ও বিকৃত অভিব্যক্তি। যে দেশপ্রেম অন্য জাতিকে হেয় করে তা উৎকট স্বাদেশিকতা এবং বিশৃঙ্খলার
সৃষ্টি করে। জাপানিদের উন্নয়নের একটি প্রধান কারণ হলো তাদের দেশপ্রেম জাতীয় অহংকারে
পরিণত হয়েছে। মানসম্মত পণ্য এবং দায়িত্বপূর্ণ আচরণ জাপানি দেশপ্রেমের নিদর্শন।
সেনাবাহিনীর মধ্যেও
তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তার মতো সৎ, নির্ভীক, দেশপ্রেমিক নেতা দেশের ইতিহাসে সৃষ্টি
হয়নি। ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর দেখা গেল, তার একখণ্ড জমিও নেই। ব্যাংকে কোনো টাকা
নেই। তার স্ত্রী, পুত্র ও পরিবারকে তিনি যেভাবে লালন করিয়েছেন, সে রকম উদাহরণ খোলাফায়ে
রাশেদিনের পর মুসলিম বিশ্বে আর দেখা যায়নি। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি (জিয়াউর রহমান)
ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নামে জাতিকে একটি রাজনৈতিক দর্শন
উপহার দিয়েছেন জিয়া। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছিলেন যার কাছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার
সাধারণ মানুষ যেতে পারত। যিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে আমার প্রশিক্ষক ছিলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে তিনি আমার
সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন আমার ব্রিগেড কমান্ডার স্বাধীনতার
ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন খাঁটি দেশপ্রেমিক।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি বাংলাদেশে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সর্বজনীন প্রাথমিক
শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তার সরকার অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে আসে,
যা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই সময়ের অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি
পায়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের টাইমস ম্যাগাজিনের কভার প্রতিবেদন তাকে ‘বাংলাদেশ ইমার্জিং
টাইগার’ শিরোনামে তুলে ধরে, যা ছিল দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের এক শক্তিশালী প্রমাণ।
কিন্তু এই সাফল্য
কিছু দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহলের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় সরকার-বিরোধী আন্দোলন,
যেখানে আওয়ামী লীগসহ কয়েটি দল রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। এমনকি ‘জনতার মঞ্চ’
নামে সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একাংশের উপস্থিতি এবং সংসদ থেকে বিরোধী দলের পদত্যাগ
দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সংকটের মুখে ফেলে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয়
মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তার আগে কেবল বেনজির ভুট্টোই মুসলিম কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী
হতে পেরেছিলেন। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি তিনবার গণতান্ত্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
নির্বাচিত হয়েছেন। এতেই বোঝা যায়, তার জনপ্রিয়তা। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার উল্লেখযোগ্য
কয়েকটি দিক হলোÑ নির্বাচনে কখনও পরাজিত না হওয়া নেতা। রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
রেকর্ড হলোÑ তিনি জীবনে কখনও কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত
পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনসহ) তিনি
মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিটি আসনেই বিজয়ী হন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে
ভিন্ন ভিন্ন এতগুলো আসন থেকে নির্বাচন করে শতভাগ সাফল্যের নজির আর কারও নেই। একসময়
দেশের নির্বাচনী আইনে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন।
সেই সুযোগে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন) ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি করে মোট
১৫টি আসনে দাঁড়িয়ে সবকটিতেই জয় পান। অর্থাৎ তিনি টানা তিন নির্বাচনে পাঁচ আসনে জয়ের
বিরল ‘হ্যাটট্রিক’ করেন। আইন পরিবর্তনের পর ২০০৮ সালে তিনি তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে
তিনটিতেই নির্বাচিত হন।
দেশের শীর্ষ রাজনীতিকরা
সাধারণত নিজ জেলা বা রাজধানীকেন্দ্রিক থাকলেও খালেদা জিয়া ব্যতিক্রম। তিনি বগুড়া, ফেনী,
ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও খুলনাসহ দেশের ছয়টি ভিন্ন জেলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত
হয়েছেন। দেশের নানা প্রান্তের মানুষের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার
রেকর্ডও তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নারী, যিনি
একই সঙ্গে ‘ফার্স্ট লেডি’ এবং পরে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি ছিলেন ফার্স্ট লেডি, আর পরবর্তীতে
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে হন দেশের সরকারপ্রধান। গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার
এই যাত্রা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
১৯৭৫ সালের পর দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু
ছিল। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে
আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বহাল রেখে ক্ষমতা কুক্ষিগত
করার সুযোগ থাকলেও তিনি সংসদকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে দেন, যা তার রাজনৈতিক
উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তার সরকারের সিদ্ধান্তগুলো
ছিল বৈপ্লবিক। দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে
দেশের নারীশিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসে। এই কর্মসূচি নারীদের কর্মজীবন ও সামাজিক অংশগ্রহণ
বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এটি একটি সফল ‘রোল মডেল’ হিসেবে
স্বীকৃতি পায়। ২০০১ সালে তার সরকারই প্রথমবারের মতো ‘মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’
গঠন করে। স্বাধীনতার তিন দশক পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার
মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়।
এটিও তার সরকারের
একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। পরিবেশ সুরক্ষায় ২০০২ সালে তার সরকার পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন
ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ এ সিদ্ধান্ত
নেয়, যা সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয় এবং পরিবেশ আন্দোলনে একটি দৃষ্টান্ত
স্থাপন করে। ১৯৯২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া সংস্থাটির
প্রথম নারী চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। দক্ষিণ এশিয়ার মতো রক্ষণশীল অঞ্চলে এটি ছিল নারী
নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত
স্বল্পস্থায়ী সংসদে তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করেন। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
সংবিধানের অংশ হয়। বিরোধী দলের দাবির প্রেক্ষিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করতে এমন
সাংবিধানিক পরিবর্তন রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্ণাঢ্য এই রাজনৈতিক
জীবন, নির্বাচনী সাফল্য ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের ইতিহাসে
এক স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
তার দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলেও, রেখে যাওয়া এই রেকর্ডগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পরে তিনি জনগণকে বাঁচাতে রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হন। অথচ রাজনীতির প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু দেশ তার কাছে ছিল পরিবারের চেয়েও বড় কিছু। তাই মানুষের ডাক তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। তিনি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দলের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত যতগুলো আসনে নির্বাচন করেছেন তার সব কয়টাতেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। পরাজয় তার ইতিহাসে নেই। দেশের জন্যে ত্যাগ কাকে বলে সেটা জানা যায় জীবনী থেকে। তার সময়ে যত রাস্তা, ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট তৈরি হয়েছে বাকি সরকারের সময় যোগ করেও এতগুলো তৈরি হয়নি। তিনি দেশের সবচেয়ে বড় সেতু যমুনা সেতু তৈরি করে উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি স্বামীর মতোই দক্ষভাবে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করেন। যার ফলে কোটি কোটি মানুষ আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরি করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এটা তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতার ফলেই সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং দার্শনিক বটে। তার সময়ে দ্রব্যমূল্য মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে রেখেছিলেন। তিলে তিলে কষ্ট করে তিনি দেশটাকে সন্ত্রাস, দূর্নীতি ও দারিদ্র্যমুক্ত করেছিলেন।
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন