বহুতল ভবন নির্মাণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৩ পিএম
নগরায়ণের চাপে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে যেভাবে দ্রুতগতিতে উঁচু ভবন গড়ে উঠছে, তার বড় একটি অংশই যথাযথ ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা ও পাইল লোড টেস্ট ছাড়া নির্মিত হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে রাজউক নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকা শহরের অবস্থা খুবই ভয়াবহ, যা ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ পাইল পুরো কাঠামোকে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় ফেলতে পারে। বলা বাহুল্য, ভূমিকম্প ঝুঁকির বাংলাদেশে নিয়ম উপেক্ষা করে বহুতল ভবন নির্মাণ কার্যত ভয়াবহ অবহেলার নাম। এটি গুরুতর অপরাধের পর্যায়েও পড়ে। নগরবাসীর অভিযোগ, অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এ বিষয়ে কার্যত নিষ্ক্রিয়।
ভবন নির্মাণে কংক্রিট-পাইল
টেস্টের গুরুত্ব অপরিসীম। মাটির ধারণক্ষমতা কতটুকু, ভূমিকম্পের সময় মাটির তরলীকরণ হবে
কি না, ভবনের ওজন পাইল কতটা বহন করতে পারবেÑ এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় পরীক্ষার
মাধ্যমে। পরীক্ষা ছাড়া নির্মিত ভবন কার্যত মৃত্যুফাঁদ। ভূমিকম্পের সামান্য কম্পনেও
এ ধরনের ভবন ধসে যেতে পারে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে রাজউক বা সংশ্লিষ্ট
কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রকৃত পরীক্ষা আদৌ হয়েছে কি না, তা যাচাই করা
হয় না। কিছু অসাধু ডেভেলপার ও প্রকৌশলী ভুয়া রিপোর্ট দেখিয়ে দায় সেরে ফেলেন। আবার ভবন
মালিকরাও খরচ কমানোর আশায় এসব অনিয়মে সম্মতি দেন। যার ফল ভোগ করতে হয় নিরীহ বাসিন্দা
ও পথচারীদের।
৬
জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘কংক্রিট-পাইল পরীক্ষা ছাড়াই নির্মাণ হচ্ছে বহুতল ভবন’
শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকাশিত ২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত
নির্মাণ বিধিমালায় ভবনের একাধিক নকশা প্রণয়ন ও অনুমোদনের কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ
রয়েছে। জানা গেছে, ২০২০ সালে প্রণীত জাতীয় বিল্ডিং কোডে শুধু আর্কিটেকচারাল বা
স্থাপত্য নকশা নয়, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সার্ভিস ড্রইং
(বিদ্যুৎ, পানিপথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভেন্টিলেশন), নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মানÑ
সবকিছুর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই সার্ভিস ড্রইংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি সেবা কীভাবে
ভবনে প্রবাহিত হবে তা নির্ধারিত হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজউক এসব সার্ভিস ড্রইং যাচাই
বা পরীক্ষার জন্য মাঠে আসে না। ২০২৩ সালে ওই কোডের প্রতিফলন ঘটাতে ইমারত বিধিমালা
সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনও সেই সংশোধন গেজেটভুক্ত হয়নি। ফলে আইন থাকলেও
বাস্তবে এর কার্যকারিতা দেখা যায় না।
অথচ
আইন বলছে, বহুতল ভবন নির্মাণের আগে মালিককে একজন স্থপতি ও একজন প্রকৌশলী নিয়োগ
দিতে হয়। এরপর ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হয় রাজউকে। তাতে লেখা
থাকে, নিযুক্ত পেশাজীবীরা বাংলাদেশের জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নির্মাণকাজ তদারকি
করবেন। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটালে রাজউক মাঠে গিয়ে রড, কংক্রিট বা অন্যান্য সামগ্রী
পরীক্ষা করতে পারে না। ল্যাব টেস্ট বা নিয়মিত ইন্সপেকশন করা হয় না। ফলে বহুতল
ভবনগুলো প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল বেসরকারি প্রকৌশলীদের ওপর। এই সুযোগে ভূমিকম্পের
ঝুঁকিপূর্ণ এই শহরে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই ছাড়াই প্রতিদিন আকাশছোঁয়া দালান গড়ে উঠছে।
উল্লেখ
করা প্রয়োজন, নির্মাণাধীন ভবনের কোয়ালিটি ও গুণগত মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রাজউকের
অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংবলিত একটি আধুনিক ল্যাব রয়েছে। কিন্তু এখনও তা
ব্যবহারযোগ্য করা যায়নি। এই ল্যাবে ভবনের রড পরীক্ষা করার ১০টি স্ক্যানারের মধ্যে
৯টি এখনও খোলা হয়নি। মাটির গুণাগুণ যাচাইয়ের সিপিটি টেস্টার, কংক্রিট পরীক্ষার
ক্যাপাটেস্ট, পাইল মান নির্ণায়ক পাইল ইনটিগ্রিটি টেস্টার এবং আলট্রা পালস ভেলোসিটি
মেশিনÑ সবই তালাবদ্ধ। এসব সচল করার সম্ভাবনাও দৃশ্যমান নয়।
আমরা জানি, বাংলাদেশ
ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে একাধিক
সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি যেকোনো সময়
বাস্তবে রূপ নিতে পারে। আর ভূমিকম্প কোনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। তাই প্রতিরোধই
একমাত্র নিরাপত্তা। জাপান বা চিলির মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলো কঠোর বিল্ডিং কোড ও
পরীক্ষানির্ভর নির্মাণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণহানি কমিয়ে এনেছে। বাংলাদেশেও জাতীয়
বিল্ডিং কোড রয়েছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। আমরা রাজউককে সক্ষমতা অর্জনসহ
দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ করছি।
আমরা মনে করি, সরকারসহ
সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব হলো কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। পাইল টেস্ট ও সয়েল টেস্ট ছাড়া
কোনো বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়া যাবে নাÑ এই নীতিতে আপসহীন হওয়া। একই সঙ্গে অনিয়মে
জড়িত প্রকৌশলী, ডেভেলপার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত
করতে হবে। পাশাপাশি ভবন মালিকদেরও সচেতন হতে হবেÑ নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত
করতে হবে। এখনই প্রয়োজন দায়িত্বশীল নির্মাণ, পরীক্ষানির্ভর পরিকল্পনা এবং আইনের
কঠোর প্রয়োগ। নচেৎ কংক্রিটের অরণ্যে বসবাসকারী এই শহর একদিন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে
পড়বে, যার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও থাকবে না। তাই ভূমিকম্পসহ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনায়
রেখে ভবন নির্মাণে মানসম্মত নকশা, সঠিক পাইল পরীক্ষা ও আরও কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।
আমরা চাই, ভবন নির্মাণের মূল লক্ষ্য হোক মানুষের জীবন সুরক্ষা।