নিকোলাস মাদুরো
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৯ এএম
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, অভিযোগ ও পদক্ষেপ আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অধ্যায়। এটি কেবল দুইটি রাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক বিরোধ নয়, বরং এখানে জড়িয়ে আছে সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, বিচারিক এখতিয়ার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে বহু পুরনো প্রশ্ন। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র যে ভাষায় ও যে কাঠামোর মধ্যে বিচার করতে চায়, তা বিশ্ব-রাজনীতিতে নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই তা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করে।
নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে, ভেনেজুয়েলার জনপ্রিয় কিন্তু বিতর্কিত নেতা হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর। শাভেজের বলিভারিয়ান বিপ্লব ভেনেজুয়েলাকে একটি স্পষ্ট মার্কিন-বিরোধী রাজনৈতিক পথে নিয়ে গিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় তেলসম্পদের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক নীতি এবং লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব মোকাবিলার কৌশল ছিল এই রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি। মাদুরো নিজেকে এই ধারার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে তার শাসনামলেই ভেনেজুয়েলা ইতিহাসের অন্যতম গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে নিমজ্জিত হয়।
এই সংকটের দায় কার তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তীব্র মতভেদ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা মাদুরো সরকারের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে মাদুরো সরকার ও তাদের সমর্থকরা দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাধা এবং রাজনৈতিক চাপই মূলত ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও তথাকথিত ‘নার্কো-টেররিজম’-এর অভিযোগ আনে। মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, মাদুরো ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা কলম্বিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, এই কর্মকাণ্ড সরাসরি তাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অভিযোগের গুরুত্ব সত্ত্বেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়Ñ এই অভিযোগগুলো কতটুকু প্রমাণিত এবং কোন আদালতের এখতিয়ার এই ধরনের বিচার করার আছে?
আন্তর্জাতিক আইনের একটি মূলনীতি হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। এর অর্থ, প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীন এবং অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত। এই নীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তি বা ইমিউনিটি। ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধান সাধারণত অন্য দেশের জাতীয় আদালতে বিচার থেকে সুরক্ষা পান, যতক্ষণ না তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা জাতিসংঘ স্বীকৃত কোনো ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হন। নিকোলাস মাদুরোর ক্ষেত্রে এখনও এমন কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্র যে যুক্তি দেয় তা হলো, যদি কোনো অপরাধ তাদের ভূখণ্ডে প্রভাব ফেলে বা তাদের নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তারা সীমান্তের বাইরেও বিচারিক এখতিয়ার দাবি করতে পারে। এই ধারণা আন্তর্জাতিক আইনে পুরোপুরি অস্বীকৃত নয়, কিন্তু এটি অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ, যদি প্রতিটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজেদের আইনকে বৈশ্বিকভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করে, তাহলে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে। এই আশঙ্কাই বহু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করে।
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতÑ এমন অভিযোগও কম নয়। সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার পরিবর্তন চায় এবং সেই লক্ষ্যেই আইনি অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি, অভিযোগ থাকা আর অপরাধ প্রমাণ হওয়া এক বিষয় নয়। মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ এনেছে, তা এখনও কোনো আন্তর্জাতিক বা নিরপেক্ষ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং তাকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী বলা আইনগতভাবে সঠিক নয়। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, তার শাসনামলে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো বিশ্ব-রাজনীতিতে একটি শক্ত বার্তা দেয়Ñ তারা নিজেদের আইন ও নিরাপত্তাকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। কিন্তু এই বার্তার আরেকটি দিকও আছে। এটি অনেক রাষ্ট্রের কাছে শক্তির প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক আইনের নির্বাচনী প্রয়োগ হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান একদিকে যেমন সমর্থন পায়, অন্যদিকে তীব্র সমালোচনারও মুখে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে এই বিতর্ক আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়Ñ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি তা শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল? ভেনেজুয়েলা ইস্যু দেখায়, আন্তর্জাতিক আইন অনেক সময় নৈতিক আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতার দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। মাদুরো একজন বিতর্কিত ও সমালোচিত নেতাÑ এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে বিচার করার অধিকার কার, কোন আইনে এবং কোন আদালতেÑ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।
আমি মনে করি, মাদুরো ইস্যু কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগের গল্প নয়; এটি আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় শক্তি, আইন ও নৈতিকতার টানাপড়েনের প্রতিচ্ছবি। এই টানাপড়েনের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা যেমন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনও বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে থাকবে।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম