বেগম খালেদা জিয়া
ফজলে মিনহাজ
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৪ এএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যারা কেবল ক্ষমতার রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নন, তারা সময়কে অতিক্রম করে একটি জাতির স্মৃতি ও চেতনায় স্থায়ী হয়ে ওঠেন। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন রাষ্ট্রনায়ক। গৃহবধূ থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্তরণ, এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আপসহীন নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশÑ এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস।
স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই রাজনীতির কঠিন ময়দানে অবতীর্ণ হন বেগম জিয়া। অভিজ্ঞতা
কিংবা রাজনৈতিক ব্যাকরণে তখন তিনি নবীন। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে, নেতৃত্বের শূন্যতায়
এবং গণতন্ত্রের সংকটে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক দৃঢ়চেতা নেত্রী হিসেবে।
সামরিক শাসন ও পরবর্তী ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট, অনড় ও আপসহীন।
দীর্ঘ গণতান্ত্রিক
আন্দোলন, বারবার কারাবরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং ব্যক্তিগত ত্যাগÑ সব মিলিয়ে তিনি সাধারণ
মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন মজলুম দেশনেত্রী হিসেবে। রাষ্ট্রশক্তির দমন-পীড়নের
মুখেও তিনি কখনও নতি স্বীকার করেননি। ক্ষমতার সঙ্গে আপস নয়, বরং জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের
প্রশ্নে আপসহীনতাই ছিল তার রাজনীতির মূল দর্শন।
২০২৪-এর ৫ আগস্টের
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বেগম জিয়ার ভূমিকা তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। সে সময় তিনি
কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না; তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের
ঊর্ধ্বে উঠে সব পক্ষের কাছে তিনি ছিলেন সংকটকালে নির্ভরতার নাম। এই জায়গাটি খুব কম
রাজনীতিকই অর্জন করতে পেরেছেন।
বেগম জিয়া বারবার
বলেছেন, তার কোনো ব্যক্তিগত বাড়ি নেইÑ এই দেশই তার বাড়ি। তিনি এ দেশের মাটি ও মানুষ
ছেড়ে কোথাও যাবেন না। বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, কোনো শক্তিই তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন
করতে পারেনি। একমাত্র মৃত্যুই তাকে শারীরিকভাবে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়েছে। কিন্তু
জনমানসে, আবেগে ও ইতিহাসে তিনি রয়ে গেছেন অম্লান।
রাজনৈতিক আদর্শের
প্রশ্নে বেগম জিয়া ছিলেন জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন নেতা।
তিনি কখনও ইসলাম, আলেম-ওলামা কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করেননি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক
বিরোধীদের প্রতিও তিনি শিষ্টাচার বজায় রেখেছেন। কটূক্তি, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য
তার রাজনীতির ভাষা ছিল না। শুদ্ধতা ও শালীনতার রাজনীতি তার একটি বড় পরিচয়।
দেশপ্রেম ছিল
তার রাজনীতির প্রাণশক্তি। আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ছিল ধারাবাহিক
ও নিরলস। ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা ক্ষমতার লোভে তিনি কখনও নিজেকে বিকিয়ে দেননিÑ এটাই
তার রাজনৈতিক চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। তার মৃত্যুতে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়,
গোটা জাতির রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শূন্যতা। কারণ তিনি ছিলেন একজন অভিভাবকতুল্য
নেতৃত্ব। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তার বিকল্প তিনি নিজেইÑ এই সত্য আজ আরও প্রকটভাবে
উপলব্ধি হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, আদর্শ ও সংগ্রাম নিয়ে গবেষণা করবে, থিসিস লিখবে, ইতিহাসের
পাঠে তাকে বিশ্লেষণ করবে। তিনি কেবল সমসাময়িক রাজনীতির অংশ নন; তিনি হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের
অনিবার্য অধ্যায়। তার জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেÑ জনগণের
ভালোবাসা কখনও মিথ্যা হয় না। প্রায় ২৫ লাখ মানুষের গণজমায়েত ছিল তার প্রতি মানুষের
গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।
মহাকালের এক অধ্যায়ের সমাপ্তিতে বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল। একজন নাগরিক হিসেবে, এই প্রজন্মের অংশ হতে পারা নিঃসন্দেহে গর্বের। বেগম খালেদা জিয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বেঁচে থাকবেনÑ জনগণের স্মৃতিতে, সংগ্রামে ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে।
ফজলে মিনহাজ
রাজনীতি পর্যবেক্ষক