ইফার প্রশাসনিক কেলেঙ্কারি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৭ পিএম
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ২১ ক্যাটাগরির ১৩০টি পদের বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘রাষ্ট্রের টাকায় অদৃশ্য রাজত্ব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব খাত থেকে এসব পদের বিপরীতে বেতন দেওয়া হলেও জনবল আনুষ্ঠানিকভাবে রাজস্ব কাঠামোয় স্থানান্তর হয়নি। তাই পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রকল্পভুক্ত কর্মরত ১৩০ জনের পদ বিস্তৃত উপপরিচালক থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত। প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ হওয়ার পরও তারা দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজস্ব খাতের অর্থে বেতন, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট এমনকি পদোন্নতির সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ তাদের চাকরির আইনি ভিত্তি আজও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। এই প্রশাসনিক জটিলতার সূচনা ২০০১-২০০৪ সময়কালে বাস্তবায়িত ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি (চতুর্থ পর্যায়)’ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। প্রকল্পটির কার্যকাল ছিল জুলাই ২০০১ থেকে জুন ২০০৪ পর্যন্ত। প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগের নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদ শেষে জনবলের চাকরি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। ২০০৪ সালে প্রকল্প শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট জনবল বহাল রয়েছে এবং ধীরে ধীরে তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়Ñ যা পরবর্তী ২১ বছরেও নিষ্পন্ন হয়নি। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিয়মিত রাজস্বভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর।
আমরা জানি, প্রকল্পে চাকরিরত কর্মচারী আইনে বলা হয়েছেÑ যেসব প্রকল্পের জনবল নিয়োগের আগে সরকার প্রচলিত নিয়োগবিধি, নিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, শুধু ওই প্রকল্পের জনবল রাজস্ব বাজেটের পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে। সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েই জনবল নিয়োগ করা হয়। অনেক সময় আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমেও নিয়োগ করা হয় প্রকল্পের জনবল। অধিকাংশ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদকাল পর্যন্ত নিয়োগকৃতদের চাকরির মেয়াদের বিষয়টি উল্লেখ থাকে। মেয়াদ শেষে প্রকল্পের জনবলের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের বিষয়টি সরকারের নীতিমালায় নেই। তারপরও গত ২১ বছর ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে যাচ্ছেন। আমরা মনে করি, এটি আইনের স্পষ্ট ব্যত্যয়। সরকারের নীতিমালার লঙ্ঘন এবং এটি কোনো সুখকর বার্তা নয়। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কোনো একক সিদ্ধান্ত বা স্পষ্ট নীতিগত অনুমোদন ছাড়াই দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরতে থাকা ফাইল, প্রশাসনিক ঢিলেঢালা ব্যাখ্যা এবং নথির ফাঁকফোকর ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে বেতন-ভাতা প্রাপ্তির এই সমান্তরাল কাঠামো। বাস্তবে এটি রাষ্ট্রের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা একধরনের ‘অদৃশ্য রাজত্ব’Ñ যেখানে প্রকল্প শেষ হলেও জনবল কর্মরতই আছে বেতন-ভাতা সমেত।’
আমরা জানি, প্রকল্পে কর্মরতদের রাজস্ব খাতে আনতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মচারীদের চাকরির মেয়াদ প্রকল্পে চাকরিরত কর্মচারী আইনে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক সরকারের আমলে এমন ‘নয়ছয়’-এর অভিযোগ কম নয়। তাই আমরা মনে করি সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি সব ধরনের সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানেরই স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ইফার ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির প্রকল্পটি নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে হেলাফেলার সুযোগ নেই। বরং এক্ষেত্রে অবেহলা, দায়িত্বহীনতা এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি। আমরা মনে করি, জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি বিধায়ই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার উৎসে নজর দিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিবিধানের আহ্বান জানাই। আমাদের সীমিত সম্পদের দেশে সবকিছুই খুব পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা মাথায় রেখে এ ধরনের উপসর্গ পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে সবার আগে দেশ ও জনগণের স্বার্থ।