বেগম খালেদা জিয়া
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৩ পিএম
২০২৫ সালটি এমন বেদনাবিধুর পরিবেশে সমাপ্ত হবে তা আমরা ভাবতে পারিনি। কেউ কল্পনা করতে পারেনি, বছরটি শেষ হবে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফনের মধ্য দিয়ে। ৩০ ডিসেম্বর সকালে যখন খবর এলো বাংলাদেশের গণমানুষের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই, সমগ্র বাংলাদেশ ঢেকে যায় শোকের কালো ছায়ায়। ওই দিনটি পার হলো মহীয়সী নেত্রীর দাফন প্রস্তুতিতে। ঘোষণা করা হলো, তার জানাজা ও দাফন হবে বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর বুধবার জোহর নামাজের পর।
দলের ক্ষুদ্র একজন মাঠকর্মী হিসেবে একসময় যার পেছনে মিছিলে হেঁটেছি, সবার সঙ্গে হাত উঁচিয়ে স্লোগান তুলেছি, সেই মাতৃতুল্য নেত্রীর জনসমুদ্রসম জানাজায় অংশ নিয়ে লাখ লাখ মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, একজন মানুষ কীভাবে এত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে পারেন! ভেতর থেকে উত্তর পেয়েছি, দেশপ্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তাকে পরিয়েছে মানুষের ভালোবাসার এ কিরীট। ঠিক যেমনটি পেয়েছিলেন তার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। একই স্থানে তার জানাজায়ও মানুষের ঢল নেমেছিল। কৃতজ্ঞ জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি সমাহিত হয়েছেন তার আজীবন লালিত স্বপ্ন গণতন্ত্রের সূতিকাগার জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন উদ্যানের সবুজ চত্বরে; যেটা আজ জিয়া উদ্যান। সেই একই স্থানে শায়িত হলেন বেগম খালেদা জিয়া।
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার বিবরণ এখানে উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারা স্বচক্ষে দেখেছেন। আর যারা যেতে পারেননি, তারা গণমাধ্যমের কল্যাণে তার সাক্ষী হয়েছেন। পরিচিত-অপরিচিত অনেকের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, কী অপরিসীম শ্রদ্ধা করেন তারা তিন বারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে! জানাজার আগে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যখন ম্যাডামের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করছিলেন, তখন গোটা এলাকাজুড়ে ছিল পিনপতন নিস্তব্ধতা। পড়তে পড়তে একপর্যায়ে নজরুল ভাইয়ের কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসছিল। আশপাশে চেয়ে দেখলাম সবাই চোখ মুছছে। মনে পড়ল কবির অমর বাণীÑ ‘যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,/ কেঁদেছিলে তুমি হেসেছিল সবে।/ এমন জীবন তুমি করিবে গঠন,/ মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’ কী অসাধারণ এক জীবন গঠন করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া! সাধারণ গৃহবধূ থেকে অতুলনীয় জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে তার ইহজীবনের সমাপ্তি।
শেরেবাংলা নগরের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, বেগম খালেদা জিয়াকে যদি আজীবন সংগ্রামী বলা হয়, তাহলে কি এতটুকু ভুল বলা হবে? বরং আমরা যদি তার জীবনকে পর্যালোচনা করি, তাহলে একজন সংগ্রামীর জীবনচিত্রই দেখতে পাই। গৃহবধূ থেকে দেশনেত্রী, সর্বাধিক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বব্যাপী সম্মাননীয় রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস। জন্মের পর রাজকন্যার মতো জীবন শুরু হলেও পরিণত বয়সের আগেই মুখোমুখি হন কঠিন জীবন-সংগ্রামের। স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসারজীবন কেবল গুছিয়ে নিতে শুরু করেছেন। হঠাৎ এক ঝড় এসে সব এলোমেলো করে দেয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ঘোষণা করেন দেশের স্বাধীনতা। স্ত্রী-সন্তানদের কী হবে তা নিয়ে এতটুকু না ভেবে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতাযুদ্ধে। সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী মেজর জিয়া তখন ইয়াহিয়া জান্তা সরকারের চরম শত্রু। দিন কাটাচ্ছেন পাহাড়ে-জঙ্গলে যুদ্ধ করে। অন্যদিকে দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে স্ত্রী খালেদা একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন এখানে-সেখানে। এভাবে ছুটে চলার একপর্যায়ে গ্রেপ্তার হন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। অবুঝ দুটি শিশুসন্তানসহ তাকে রাখা হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বন্দিশালায়। দীর্ঘ নয়টি মাস সেখানে দুর্বিষহ বন্দিজীবন কাটান তিনি। মুক্তি পান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। বীরের বেশে ফিরে আসেন স্বামী জিয়াউর রহমান। আবার শুরু হয় বাঙালি স্ত্রীদের মতো তার আটপৌরে সংসারজীবন। ভেবেছিলেন এভাবেই হয়তো স্বামী-সন্তানদের নিয়ে কেটে যাবে শান্তিময় জীবন। কিন্তু নিয়তি যার ললাটে লিখে রেখেছে নিরন্তর সংগ্রাম, তিনি কীভাবে নিশ্চিন্ত জীবন কাটাবেন?
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জিয়াউর রহমান নিযুক্ত হন সেনাবাহিনী প্রধান। কিন্তু ওই বছর ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক পাল্টা অভ্যুত্থানে গৃহবন্দি হন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের সে ঐতিহাসিক বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে অবরুদ্ধ থাকেন খালেদা জিয়াও। স্বামী-সন্তানদের জীবনশঙ্কায় উদ্বিগ্ন খালেদা জিয়া এক দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার করেছিলেন ওই তিনটি দিন। সে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তী সময়ে তিনি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্ণনা করেছেন। তারপর আবার উদিত হয় সূর্য, কেটে যায় মেঘ। একদিকে দেশ মুক্তি পায় সম্প্রসারণবাদী চক্রের করাল থাবা থেকে। অন্যদিকে খালেদা জিয়াও মুক্তি পান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার দুঃসহ দিনযাপন থেকে।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের একপর্যায়ে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষেক ঘটে জিয়াউর রহমানের। রাষ্ট্রাচার অনুসারে গৃহবধূ খালেদা জিয়া অধিষ্ঠিত হন দেশের ফার্স্টলেডির আসনে। কিন্তু তা সীমাবদ্ধ থাকে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রটোকল আর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে। স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দু-চারটি বিদেশ সফর আর বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের বাংলাদেশ সফরের ব্যাংকোয়েট ছাড়া বেগম জিয়াকে তেমন দেখা যেত না। সময় ভালোই কাটছিল।
কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো বিপর্যয় নেমে আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। ওইদিন ভোরে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে কতিপয় বিপথগামী সৈনিকের হাতে শাহাদতবরণ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্বামী হারিয়ে যেন অকূল পাথারে পড়েন তরুণী গৃহবধূ খালেদা জিয়া। শুরু হয় তার কঠিন সংগ্রামী জীবন। দুই শিশুসন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পাশাপাশি তাকে দায়িত্ব নিতে হয় স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে রক্ষার। কিছুদিনের মধ্যে আরেকটি গুরুদায়িত্ব কাঁধে চাপে তার। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিএনপি সরকারকে বন্দুকের মুখে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ। সে হৃত গণতন্ত্রকে উদ্ধারের জন্য দীর্ঘ নয় বছর রাজপথে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন বেগম খালেদা জিয়া। লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারের কবল থেকে এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে উদ্ধার। সে গণআন্দোলনের নিরাপস সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া অভিষিক্ত হন ‘আপসহীন নেত্রী’র অভিধায়।
এ দেশের মানুষ মাঝেমধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলেও সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক আসনে বসাতে ভুল করে না। তারা বেগম খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে তাকে যোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। কেননা, তারা দেখেছে, একই সময়ে অপর নেত্রী ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে গোপনে আন্দোলনের পিঠে ছোরা বসিয়ে পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অপরদিকে ‘স্বৈরশাসকের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়’Ñ এ প্রত্যয়ে বেগম জিয়া ছিলেন অবিচল। নয় বছরের প্রত্যয়দীপ্ত সংগ্রাম বেগম জিয়ার মাথায় পরিয়ে দেয় সাফল্যের মুকুট। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন হয় স্বৈরশাসকের। ফিরে আসে গণতন্ত্র। আর সে গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রথম নির্বাচনে এ দেশের মানুষ আস্থা স্থাপন করে খালেদা জিয়ার ওপর।
এখান থেকে শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের নবঅধ্যায়। সে এক নবতর সংগ্রামী জীবন। এই দেশ, এই দেশের আপামর জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের পথ অনুসন্ধানে দিবারাত্র পরিশ্রম করতে থাকেন তিনি। মোকাবিলা করতে হয় দেশি-বিদেশি নানাবিধ চক্রান্তের। সেসব ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের কাঁটা দু’পায়ে দলে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। তৃতীয় দফা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনের শেষদিকে তাকে পড়তে হয় চরম বিপাকে। তার সরকারকে বিপর্যস্ত করতে যে ষড়যন্ত্র চলছিল, তার ডালপালা ততদিনে বিস্তার লাভ করেছে চারদিকে। যার ফলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জারি হয় জরুরি অবস্থা। গণতন্ত্র হয় নির্বাসিত। একপর্যায়ে কারাবরণ করতে হয় খালেদা জিয়াকে। প্রায় দুই বছর কারান্তরীণ থাকেন তিনি। ওই সরকার তাকে দেশত্যাগের জন্য নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করলেও তিনি চাপের কাছে মাথা নত করেননি। তারপরের ঘটনা সবাই জানেন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান তিনি। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের অধিষ্ঠানের পরিপ্রেক্ষিতে বেগম জিয়াকে আবারও নামতে হয় নিরন্তর সংগ্রামে। এবারের সংগ্রামটি ছিল কঠিন। আধিপত্যবাদী শক্তির এদেশীয় ক্রীড়নকরা নীলনকশা এঁটেছিল রাজনীতি থেকে খালেদা জিয়াকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। মিথ্যা মামলা ও অনুগত আদালতের ফরমায়েশি রায়ে তাকে পোরা হয় কারাগারে। সেখানে বিনা চিকিৎসায় তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান। ততদিনে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিনের কারাভোগ ও সুচিকিৎসার অভাব তার মৃত্যুকে করে ত্বরান্বিত।
বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামের ইতিহাস এক-দুটি নিবন্ধে বর্ণনা অসম্ভব। তার পুরো জীবনটাই কেটেছে সংগ্রামের মধ্যে। আজীবন সংগ্রামী খালেদা জিয়া জীবনের শেষ চল্লিশটি দিন সংগ্রাম করেছেন মৃত্যুর সঙ্গে। জীবনে এই প্রথমবার তিনি পরাজিত হলেন। আর সে পরাজয় সৃষ্টিকর্তার অমোঘ বিধান মৃত্যুর কাছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে গেছেন, ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামমুখর জীবনে কবিগুরু এ পঙ্ক্তিমালা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। দেশ ও জাতির জন্য তিনি উৎসর্গ করেছেন তার জীবনকে, কৃতজ্ঞ জাতি তার প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করেছে শেষ বিদায়ে।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সাংবাদিক ও কলাম লেখক