ভেনেজুয়েলা
আজাদ-আল-আমিন
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২১ পিএম
ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও অন্ধকার ‘সন্ধিক্ষণে’ আমরা। ২০২৬ সাল শুরু হতেই সভ্যতার সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করতে হচ্ছে আমাদের। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে শনিবার তার নিজ ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ বাহিনী দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়; বরং এতে যে বয়ানটি প্রতিষ্ঠিত হলো, তা মূলত ‘জোর যার মুল্লুক তার’।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে ‘ওয়েস্টফালিয়ান’ সার্বভৌমত্বের ধারণা আমরা গত কয়েক শতাব্দী ধরে লালন করেছি, ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভোরে তা কেবল একটি কাগুজে কৌতুক হিসেবে প্রমাণিত হলো। ১৬৪৮ সালে ইউরোপে সম্পাদিত ‘পিস অফ ওয়েস্টফালিয়া’ নামক শান্তিচুক্তি থেকে উদ্ভূত রাষ্ট্রের মানচিত্র বা সীমানা অলঙ্ঘনীয় থাকার যে ধারণা, তা এখন ‘বৈশ্বিক সম্মতি’ উৎপাদনকারীদের কাছে বড়ই খাপছাড়া মনে হচ্ছে।
ওয়েস্টফালিয়ান মডেলে বলা হয়েছিল, ছোট-বড় নির্বিশেষে প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীন এবং তাদের সীমানা পবিত্র। কিন্তু এক রাষ্ট্র যখন অন্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে শিকল পরিয়ে তুলে নিয়ে যায়, তখন এই সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তিটিই ধসে পড়ে। ভেনেজুয়েলার এই ঘটনায় রাষ্ট্রের সীমানার পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে বলেই একে ‘লুণ্ঠনমূলক নৈরাজ্য’ বলা যায়। মূলত এই নাটকের অন্তরালে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ লুণ্ঠন ও নিয়ন্ত্রণের এক সুগভীর দর্শন।
সারা দুনিয়া আজ এক ভয়াবহ ‘পরিণতির’ দিকে হাঁটছে, যেখানে যুদ্ধ কেবল বৈধ নয়, বরং কাঙ্ক্ষিত; যেখানে আগ্রাসন কেবল নীতি নয়, বরং অধিকার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিকরা এতদিন ‘নৈরাজ্যবাদ’ বা ‘এনার্কি’ বলতে বিশ্ব সরকারহীন এক ব্যবস্থাকে বুঝতেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক চুক্তিতে চলত। কিন্তু বর্তমানে আমরা যে বাস্তবতায় উপনীত হয়েছি, তা গতানুগতিক নৈরাজ্যবাদকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটি এখন এক নগ্ন লুণ্ঠনমূলক নৈরাজ্যবাদ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ভীতিকর দিক হলো এর বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা উৎপাদন।
যুক্তরাষ্ট্রের একটির পর একটি রাষ্ট্রে আগ্রাসন, রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসন, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হামলা এবং চীনের তাইওয়ানে হামলার হুমকিকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তা যুদ্ধকে একটি ‘বৈধ’ এবং ‘অপরিহার্য’ সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যখন একটি অন্যায় দীর্ঘ সময় ধরে চর্চিত হয় এবং বিশ্ব সম্প্রদায় তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, তখন সেই অন্যায়ই নতুন ‘নর্ম’ বা প্রথায় পরিণত হয়। ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান গণহত্যা আর ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কেবল একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম, কোনো মানবিক বিপর্যয় নয়।
এডওয়ার্ড স্যামুয়েল হারম্যান ও নোয়াম চমস্কির ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ তত্ত্বের মতো করেই আজ আগ্রাসনের পক্ষে বৈশ্বিক সম্মতি উৎপাদন করা হচ্ছে। এই নিস্পৃহতা ও সম্মতিই আগামী দিনের আরও বড় ধ্বংসযজ্ঞের পথ প্রশস্ত করছে। এই যে আগ্রাসনের এক বিশ্বজনীন বৈধতা তৈরি হচ্ছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি তাইওয়ান প্রণালি থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত। চীনের তাইওয়ান আক্রমণের সম্ভাবনা এখন আর কেবল ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং অনেক মহলে এটি এখন একটি ‘যৌক্তিক সুযোগ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যখন পরাশক্তিগুলো দেখে যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা সম্ভব এবং বিশ্ববিবেক কেবল মৌনতার সংস্কৃতিতে মগ্ন থাকে, তখন সীমানা লঙ্ঘনের নৈতিক বাধাগুলো ভেঙে পড়ে। এটি আসলে একটি ‘ডমিনো ইমপ্যাক্ট’Ñযেখানে একটি আইন ভেঙে পড়লে সারিবদ্ধভাবে থাকা বাকি আইনগুলোও একের পর এক ধসে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার যে বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রগুলোর ওপর ছিল, তা আজ হরণ করা হয়েছে। আইনের শাসন যেখানে পেশিশক্তির কাছে মাথানত করে, সেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের চেয়ে ‘গায়ের জোরের আইন’ই বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
বর্তমান বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কলোনিয়াল বা ঔপনিবেশিক আমলের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। উপনিবেশবাদের যুগে শোষণের একটি ‘অনার কোড’ বা অন্তত একটি আইনি ছদ্মবেশ ছিল। সাম্রাজ্যবাদীরা যখন নতুন কোনো ভূখণ্ড দখল করত, তারা সেখানে একটি প্রশাসনিক কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার দোহাই দিত। কিন্তু বর্তমানের এই লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থায় কোনো দায়বদ্ধতা নেই, নেই কোনো নৈতিক শৃঙ্খলা। এটি কেবল ‘আঘাত করো এবং লুণ্ঠন করো’Ñ এমন এক আধিপত্যবাদী দর্শন। একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার বলে আজ আর কিছু অবশিষ্ট নেই, যদি না সেই রাষ্ট্র কোনো পরাশক্তির স্বার্থের সমান্তরালে চলে। এই ব্যবস্থাটি কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানে না; এটি স্রেফ ‘গায়ের জোরই আসল আইন’Ñ এই আদিম প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা যে সভ্যতাকে তথাকথিত ‘সভ্য’ বলে দাবি করি, সেই সভ্যতার কি আদতে কোনো ভবিষ্যৎ আছে? যে ব্যবস্থায় কোনো ‘অনার কোড’ বা মর্যাদাবোধের জায়গা নেই, সেখানে সভ্যতা তার প্রাণশক্তি হারায়। ‘অনার কোড’ হলো সেই অলিখিত নৈতিক লক্ষণরেখা, যা চরম সংঘাতের সময়েও মানুষকে পশুর চেয়ে আলাদা করে রাখে। যখন যুদ্ধের ঝুঁকিকে আমরা প্রগতি বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে জায়েজ করি, তখন আমরা আসলে নিজেদের তৈরি করা খাঁচায় নিজেরাই বন্দি হই। ডেলসি রদ্রিগেজকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ কিংবা নিকোলাস মাদুরোকে শিকল পরিয়ে নিয়ে যাওয়াÑ এগুলো কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তন নয়, এগুলো বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত নৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ।
এই দুনিয়ার চলতি তথাকথিত সভ্যতার কোনো ভবিষ্যৎ থাকতে পারে না, যদি এটি কেবল শিকারি আর শিকারের সমীকরণে আবর্তিত হয়। সারা দুনিয়ার জন্য এই ঘটনা এক বড় অশনিসংকেত। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, কোনো মানচিত্রই এখন আর অলঙ্ঘনীয় নয়, কোনো নেতাই নিরাপদ নন এবং কোনো সংবিধানই চূড়ান্ত রক্ষাকবচ নয়। আমরা এখন এমন এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল দর্শক, আর পেশিশক্তিই একমাত্র বিচারক। এই নৈতিকতাহীন দঙ্গলে সভ্যতার বাতিঘরগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে। দঙ্গল যখন শহরে ঢুকে পড়ে এবং শহরের শিক্ষিত মানুষেরা সেই দঙ্গলকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানায়, তখন বুঝতে হবে ধ্বংস আর বেশি দূরে নেই। আন্তর্জাতিক আইনের এই অপমৃত্যু এবং আগ্রাসনের এই বৈশ্বিক সম্মতি আমাদের এমন এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানুষের মর্যাদা হবে তুচ্ছ আর এই লুণ্ঠনমূলক নৈরাজ্যই হবে একমাত্র ধ্রুব সত্য।
আজাদ-আল-আমিন
সাংবাদিক