শ্রদ্ধাঞ্জলি
আবু জুবায়ের
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২০ এএম
প্যারিসের সেইন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা যখন নশ্বর জীবনের সীমানা পেরিয়ে অবিনশ্বর চেতনার কথা বলতেন, তখন তারা ‘বিদায়’ শব্দটি উচ্চারণে কুণ্ঠিত হতেন। তারা বিশ্বাস করতেন, নশ্বর দেহের লয় অনিবার্য হলেও, ইতিহাসের গর্ভে যে চেতনার জন্ম হয়, তা শাশ্বত, তা মৃত্যুঞ্জয়ী। তাই প্রিয়জনের প্রস্থানে তারা অশ্রুসজল নেত্রে বলেন ‘ওরভোয়া’ (Au revoir); অর্থাৎ, ‘আবার দেখা হবে’। আজ বাংলার রাজনীতির আকাশে যখন দেদীপ্যমান নক্ষত্রের জাগতিক যবনিকা ঘটল, তখন ঢাকার গুলশানের ফিরোজা ভবন কিংবা এভারকেয়ার হাসপাতালের নিভৃত অলিন্দ থেকে এক দীর্ঘশ্বাস উঠে এলেও, আমরা শোকের আঁধার সরিয়ে বরং এক মহান জীবনের উদযাপন করতে চাই।
বেগম খালেদা জিয়া।
কোটি মানুষের হৃদয়ে ‘ম্যাডাম’ বা ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে পবিত্র বেদিতে আসীন, তার এই প্রস্থান
কোনো অন্তিম সমাপ্তি নয়। এ হলো এক মহাজাগতিক উত্তরণ। গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখি যেমন
ভস্ম থেকে নবজাগরণের গান গায়, খালেদা জিয়াও তেমনই বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় মৃত্যুঞ্জয়ী
সত্তা হিসেবে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। তার জীবন কোনো সাধারণ আখ্যান নয়; সাহস, দেশপ্রেম
এবং আত্মমর্যাদার এক অনন্য সিম্ফনি।
কালের অমোঘ নিয়তি
যখন কোনো সাধারণ মানুষকে ইতিহাসের মহানায়ক বা মহানায়িকায় রূপান্তরিত করে, তখন তার পেছনে
থাকে অনেক অলৌকিক কার্যকারণ। আশির দশকের প্রারম্ভে যিনি ছিলেন ক্যান্টনমেন্টের মইনুল
রোডের এক সুনিবিড় ছায়াবৃত গৃহকোণের অসূর্যম্পশ্যা; কী এক অবিশ্বাস্য জাদুমন্ত্রে হয়ে
উঠলেন গণতন্ত্রের রণাঙ্গনের তেজোদীপ্ত জোন অফ আর্ক! ১৯৮১ সালের ৩০ মের সেই বিষাদসিন্ধুতে
হারিয়েছিলেন তার জীবনসঙ্গী, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে।
কিন্তু সেই শোক তাকে পাথর করেনি, সেই শোকের দহন থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক অদম্য অগ্নিশিখা।
যখন রাজপথে নামলেন,
তখন হাতে ছিল না কোনো জাদুর কাঠি, ছিল কেবল জনগণের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা এবং নির্ভেজাল
দেশপ্রেম। ফরাসি বিপ্লবের সময় যেমন ‘লিবার্টি’ বা স্বাধীনতার মশাল হাতে নারীরা পথ দেখিয়েছিল,
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন তেমনই এক আলোকবর্তিকা।
তার কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হতো ‘ স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, মনে হতো এ
কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, নিপীড়িত মানবতার শাশ্বত আর্তনাদ ও জাগরণের মন্ত্র। আপসহীনতার
যে সংজ্ঞার্থ তৈরি করেছিলেন, তা সমসাময়িক বিশ্ব-রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
১৯৯১ সাল। বাংলাদেশের
সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায়। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
হিসেবে তিনি যখন শপথ নিলেন, তখন বিশ্ব দেখল এক নতুন বাংলাদেশ। তিনি কেবল একজন শাসক
নয় , তিনি ছিলেন ‘স্টেটসম্যান’ বা রাষ্ট্রনায়ক। তার শাসনামলে নারী শিক্ষার যে বৈপ্লবিক
প্রসার ঘটেছিল, তা ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে উন্নত
করতে হলে তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে অন্ধকারের জঠর থেকে আলোর পথে আনতে হবে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
মার্গারেট থ্যাচারকে যেমন ‘লৌহমানবী’ বলা হতো তার দৃঢ়তার জন্য, খালেদা জিয়ার মধ্যে
সেই ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার পাশাপাশি ছিল মাতৃসত্তা। তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবল প্রবক্তা,
বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তার সময়ে
নির্মিত অবকাঠামো, কৃষি ও শিল্পে উন্নয়ন সবকিছুই ছিল আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার
সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন নারী কেবল ঘরই সামলান না,
তিনি পরম মমতায় এবং কঠোর শাসনে একটি রাষ্ট্রকেও সঠিক দিশা দিতে পারেন।
রাজনীতিবিদ খালেদা
জিয়ার মতোই অনেক উঁচুতে স্থান পাবে ‘মা’ খালেদা জিয়ার আত্মত্যাগ। রোমান সম্রাট ও দার্শনিক
মার্কাস অরেলিয়াস তার ‘মেডিটেশনস’-এ যে স্টোয়িক (Stoic) বা নির্বিকার চিত্তের কথা বলেছিলেন,
খালেদা জিয়া তার জীবনে সেই দর্শনেরই মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত,
১/১১-এর বিপর্যয়, কিংবা প্রিয় পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর অকালপ্রয়াণ কোনোকিছুই তার মর্যাদাবোধকে
টলাতে পারেনি।
পুত্রশোকাতুরা
মা হয়েও তিনি যেভাবে নিজেকে সংবরণ করেছিলেন, তা ছিল মহাকাব্যিক ধৈর্য। তিনি জানতেন,
কেবল দুই সন্তানের জননী নন, তিনি এই বদ্বীপের কোটি কোটি মানুষের ‘মা’। তার চোখের জল
গোপনে মুছেছেন, জনসমক্ষে তিনি ছিলেন সব সময়ই অটুট হিমালয়। তার এই ত্যাগের মহিমা রাজনীতি
ছাপিয়ে মানবিক উচ্চতায় আসীন করেছে। তিনি শিখিয়েছেন, কীভাবে ঝড়ের রাতেও প্রদীপ হাতে
দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, কীভাবে সব হারিয়েও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তির মতো গাম্ভীর্য নিয়ে মাথা
উঁচু করে রাখতে হয়।
জীবনের শেষ অধ্যায়গুলোতে
বেছে নিয়েছিলেন মহামৌন অবস্থান। তিনি কথা বলতেন কম, কিন্তু ফিরোজা ভবনের চারদেয়ালে
তার উপস্থিতিই ছিল লক্ষকোটি নেতাকর্মীর জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা। ফরাসি দার্শনিক মিশেল
ফুকো কিংবা জাঁ-পল সার্ত্রে যেমন বলতেন অনুপস্থিতির মধ্যেও এক প্রবল উপস্থিতি
(Presence in absence) থাকে, খালেদা জিয়াও তেমনই রাজনীতির দৃশ্যপটে না থেকেও ছিলেন
সর্বব্যাপী।
তার অসুস্থতা,
তার সংগ্রাম, তার একাকিত্ব সবকিছুই গভীর শ্রদ্ধার আধার হয়ে উঠেছে। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা,
তার দূরদর্শিতা এবং দেশের প্রতি তার নিঃশর্ত ভালোবাসা আজকের প্রজন্মের কাছে এক পাঠ্যপুস্তকতুল্য।
আজ আমরা তাকে
‘ওরভোয়া’ বলছি, আমাদের হৃদয়ে কোনো হাহাকার নেই; আছে বুকভরা গর্ব। নক্ষত্রের কোনো মৃত্যু
নেই, নক্ষত্র কেবল স্থান পরিবর্তন করে। খালেদা জিয়া আজ পৃথিবীর ধুলোবালি ছেড়ে ইতিহাসের
এক সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হলেন, যেখানে কাল বা সময় তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
হে মহীয়সী,
আপনি পলিবিধৌত বদ্বীপে গণতন্ত্রের যে বীজ বপন করে গেলেন, তা একদিন মহীরুহে পরিণত হবে।
আপনার স্মৃতি, আপনার আদর্শ, আপনার সেই চশমার আড়ালের দৃঢ়দৃষ্টিÑ সবকিছুই আমাদের চেতনার
মণিকোঠায় অমলিন হয়ে থাকবে।
আমরা বিশ্বাস
করি, মৃত্যুর ওপারে যে অনন্ত জগৎ, সেখানে আপনি পুনরায় মিলিত হবেন আপনার প্রিয়তম জীবনসঙ্গী
এবং আদরের সন্তানের সঙ্গে। সেখানে কোনো রাজনীতি নেই, কোনো ষড়যন্ত্র নেই, আছে কেবল শান্তি
আর পরম প্রশান্তি।
এই গোধূলিলগ্নে
দাঁড়িয়ে, সমগ্র জাতি আপনাকে জানাচ্ছে এক রক্তিম স্যালুট। আপনার যাত্রা শুভ হোক। আপনি
ছিলেন, আপনি আছেন এবং আপনি থাকবেন বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি গণতন্ত্রকামী
মানুষের হৃদস্পন্দনে। ইতিহাসের পাতায়, স্মৃতির মিনার হয়ে আবার দেখা হবে, মাদাম।
ওরভোয়া! ওরভোয়া! মাদাম।
আবু জুবায়ের
কবি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক