× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ

কূটনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি

সাইফুল ইসলাম শান্ত

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৪ এএম

 কূটনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ নিজেকে একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়। গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো দেশের ভাবমূর্তি এখন আর শুধু প্রবৃদ্ধির হার বা অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় সেই দেশ কতটা স্থিতিশীল নীতি অনুসরণ করছে, বিনিয়োগকারীদের জন্য কতটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা দায়িত্বশীল ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতে পারছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই চ্যালেঞ্জ এখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

গত এক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যে অগ্রগতি করেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তৈরি পোশাক শিল্পে বৈশ্বিক অবস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের সম্প্রসারণ আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কিছুটা ধীরে হলেও বেশ অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বার্ষিক গড়ে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঘরে ঘোরাফেরা করেছে। যদিও এই অঙ্ক ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের তুলনায় অনেকটা কম, তবু এটি ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার পরিবেশ আছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার বা শ্রমের সস্তা দামের দিকে তাকান না। তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতির স্থিতিশীলতার ওপর। একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ মানে শুধু আজকের জন্য নয় এটি পাঁচ, দশ বা বিশ বছরের পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনায় যদি বারবার করনীতি বদলে যায়, আমদানি-রপ্তানি বিধি হঠাৎ সংশোধন হয় বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্পষ্টতা থাকে তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়ে যায়। বাংলাদেশে এই জায়গাটিই সবচেয়ে দুর্বল।

একই খাতে একাধিক সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নীতি ঘোষণা, হঠাৎ করে কর ছাড় প্রত্যাহার কিংবা শুল্ক কাঠামোর আকস্মিক পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তোলে। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রকাশ্যে না বললেও নীরবে বিকল্প গন্তব্য খুঁজে নেন। কারণ বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাজারে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। ভিয়েতনাম, ভারত, এমনকি আফ্রিকার কিছু দেশও বিনিয়োগ টানতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির নিশ্চয়তা দিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ যদি নীতিগত ধারাবাহিকতা দেখাতে না পারে, তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস, অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, কর অবকাশ, শতভাগ বিদেশি মালিকানার সুযোগ, মুনাফা প্রত্যাবাসনের স্বাধীনতা ইত্যাদি। নীতির কাগজে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবায়নের স্তরে গিয়ে অনেক সময় সেই আকর্ষণ ম্লান হয়ে যায়। একটি বিনিয়োগ প্রকল্প অনুমোদন পেতে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়, সিদ্ধান্তে সময় লাগে আর নিয়মের ব্যাখ্যায় দেখা যায় ভিন্নতা। এই ব্যবধানই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চোখে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে নীতি স্থিতিশীলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক থেকে বাংলাদেশ সরে গেলেও বাস্তবতা বদলায়নি। ব্যবসা শুরু করা, জমি রেজিস্ট্রেশন, বিদ্যুৎ সংযোগ বা চুক্তি বাস্তবায়ন এখনও সময়সাপেক্ষ। বিনিয়োগকারীরা যখন দেখেন একটি কাজ শেষ করতে মাসের পর মাস লেগে যাচ্ছে তখন তারা শুধু আর্থিক হিসাব নয়, মানসিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নেন। এই ঝুঁকি কমাতে না পারলে কোনো নীতিই যথেষ্ট কার্যকর হয় না।

বাংলাদেশ যদি সঠিক সংস্কারের পথে এগোয় তাহলে বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো মোটেও অসম্ভব নয়। এর জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নীতি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। কর, শুল্ক, বিনিয়োগ সুবিধা বা শিল্পনীতিতে পরিবর্তন আসতেই পারে কিন্তু তা হতে হবে পূর্বঘোষিত, ধাপে ধাপে এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে। হঠাৎ সিদ্ধান্ত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের সবচেয়ে বড় শত্রু।

দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে সত্যিকারের ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ করতে হবে। শুধু অনলাইনে ফরম পূরণ নয়, অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া এবং সেই সময়সীমা অতিক্রম করলে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বুঝবেন যে বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কাজ আটকে থাকে না। তৃতীয়ত, নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান কমাতে হবে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে ভালো নীতিও ব্যর্থ হয়। একটি বিনিয়োগ প্রকল্প যেন এক জানালা দিয়েই সব সেবা পায়Ñ এই ধারণাকে বাস্তব কাঠামোতে রূপ দিতে হবে। চতুর্থত, আইনি সংস্কার ও বাণিজ্যিক আদালতের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, আন্তর্জাতিক সালিশি রায়ের স্বীকৃতি এবং চুক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা বাড়বে। অনেক সময় একটি সফল মামলা নিষ্পত্তিই নতুন বিনিয়োগের দরজা খুলে দেয়।

সবশেষে, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তায় সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস, বাণিজ্য মিশন ও বিনিয়োগ প্রচার সংস্থাগুলোকে শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সংস্কারের অগ্রগতিও তুলে ধরতে হবে। বিশ্ব এখন তথ্যনির্ভর। অতিরঞ্জিত প্রচারণার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি বেশি কার্যকর।

দীর্ঘদিনের প্রবৃদ্ধি, কর্মক্ষম জনশক্তি ও কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলেছে, তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবচেয়ে প্রয়োজন নীতি স্থিতিশীলতা ও আস্থাভিত্তিক সংস্কার। বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজার নয়, খোঁজেন পূর্বানুমেয় নীতি, কার্যকর প্রশাসন এবং আইনের নির্ভরযোগ্য প্রয়োগ। বাংলাদেশ যদি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ কেবল বাড়বেই না, দেশটির বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতাও দৃঢ় হবে। এই বিশ্বাসযোগ্যতাই আগামী দিনে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হয়ে উঠবে।


সাইফুল ইসলাম শান্ত

কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা