ইমেইল থেকে
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৪ পিএম
বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর কাছে পহেলা জানুয়ারি মানেই ‘বই উৎসব’। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ অনেকটা বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা মাটি ছুঁলে যে সোঁদা গন্ধ- তার মতোই। শৈশব মানেই নতুন ক্লাসে ওঠার গর্ব। সেই গর্বের মুকুটে রঙিন পালক যোগ করে ঝকঝকে সাদা পাতার নতুন বইগুলো। যখন কোনো শিক্ষার্থী তার হাতে প্রথমবার বইগুলো স্পর্শ করে, তার আঙুলের ডগায় যে শিহরন খেলে যায়, তা কোনো শব্দে প্রকাশ করা অসম্ভব। বইয়ের পাতার সেই ‘কসকসে’ শব্দ যেন এক জাদুকরি সুর, যা পড়ার টেবিলে ফেরার ডাক দেয়।
বাল্যকালে নতুন বই পাওয়া মানে এক নতুন জগতের চাবিকাঠি হাতে পাওয়া। বইয়ের সেই ‘কসকসে’ পাতার ঘ্রাণ শিশুদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও উদ্দীপনা জাগায়। নতুন বইয়ের মলাট লাগানো, তাতে নিজের নাম লেখা এবং রঙিন ছবিগুলো উল্টে দেখা প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে পরম সুখের। এই বইগুলো কেবল পড়াশোনার উপকরণ নয়, বরং আগামীর স্বপ্নের একেকটি রঙিন দলিল।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের কাছে
নতুন বই একটি মানসিক অর্জন। এটি নতুন ক্লাসে ওঠার স্বীকৃতি। বড়দের কাছে এটি সাধারণ
কাগজ-কালি হলেও শিশুদের কাছে এটি আগামীর বন্ধু। নতুন বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নতুন
ক্লাসে, নতুন বেঞ্চে বসা, নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় এবং সুন্দর ভবিষ্যতের
প্রত্যাশা।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনামূল্যে কোমলমতি
ছাত্রছাত্রীদের মাঝে এ-প্রত্যাশিত পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়। সুইডেন, নরওয়ে,
ফিনল্যান্ড এবং কিউবার মতো দেশগুলোতে কয়েক দশক ধরে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেওয়া
হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। ভারতেও
সর্বশিক্ষা অভিযানের আওতায় প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হয়। তবে
বাংলাদেশের মতো এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে বছরের প্রথম দিন বই পৌঁছে দেওয়ার
নজির বিশ্বে বিরল।
বাংলাদেশের বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ
কর্মসূচিটি পুরো বিশ্বে নজর কেড়েছে। আমাদের দেশে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য
আংশিক বিনামূল্যে বই প্রদান শুরু হয়েছিল আশির দশকে। তবে ২০১০ সাল থেকে বর্তমান
ধারাবাহিকতায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত দেশের সকল ছাত্রছাত্রীর হাতে
‘বই উৎসব’-এর মাধ্যমে নতুন বই তুলে দেওয়া শুরু হয়। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত
প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে। গত ১৫ বছরে মোট বিতরণ করা
বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৫২০ কোটির ওপরে।
বাংলাদেশে বিনামূল্যে বই বিতরণ একটি
মহাবিপ্লব। ২০১০ সাল থেকে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, অর্থাভাবে যেন কোনো শিশুর পড়াশোনা
বন্ধ না হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বিপুলসংখ্যক বই বিনামূল্যে বিতরণের নজির নেই।
বাংলাদেশের এই সাফল্য বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। এটি কেবল একটি সরকারি প্রকল্প
নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাক-প্রাথমিক হতে নবম শ্রেণির
ছাত্রছাত্রীদের জন্য ২০২৫ সালের শুরুটা অন্যান্য বছরের মতো আনন্দময় হয়নি। কিছু
সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো বই পৌঁছেনি। ২০২৫ সালের এই সংকট
থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিবছর জানুয়ারির ১ তারিখ বই উৎসব করতে হলে, আমার
দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ সরকারের নিম্নলিখিত করণীয় রয়েছে : মুদ্রণ প্রক্রিয়া অন্তত
৬ মাস আগে শুরু করা। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বইয়ের গুদামগুলোর আধুনিকায়ন
প্রয়োজন, যাতে সঠিক সময়ে বই পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়। এনসিটিবির কার্যক্রমকে
বিকেন্দ্রীকরণ করা। ডিজিটাল ভার্সন বা ই-বুক আগেভাগেই সহজলভ্য করা। কাগজের সংকট
মোকাবিলায় বাফার স্টক তৈরি রাখা। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও শিক্ষা খাতকে এর ঊর্ধ্বে
রাখা।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত,
বই পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বিতরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখা। বই পৌঁছতে দেরি হলে
শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে সাহস দেওয়া এবং পুরনো বইয়ের সংগ্রহ থেকে সাময়িকভাবে
পাঠদান চালিয়ে যাওয়া উচিত।
বছরের প্রথম দিনে বাংলাদেশের
শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়,
বরং এটি কোটি শিশুর রঙিন স্বপ্নের বাস্তবায়ন। যখন একজন শিক্ষার্থী নতুন বইয়ের
ঘ্রাণ নেয়, তখন তার চোখের উজ্জ্বলতায় আগামীর এক আলোকিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে
ওঠে। তবে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো
সব বই পৌঁছতে না পারা একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে নতুন
বই পাওয়ার অনাবিল আনন্দ, আর অন্যদিকে শূন্য হাতে ঘরে ফেরার নিভৃত দীর্ঘশ্বাসÑ এই
দুইয়ের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এক মিশ্র অনুভূতি। গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের
সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা যখন বইয়ের অভাবে সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় থাকে,
তখন তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে নিয়ে আসে।
প্রতিটি শিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে শতভাগ বই বিতরণ কেবল একটি লক্ষ্য নয়, বরং
এটি রাষ্ট্রের একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা।
বই না পাওয়া শিশুদের হতাশা কাটিয়ে দ্রুত
নতুন বই পৌঁছে দেওয়াই হোক নতুন বছরের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। এক হাতে নতুন বই আর অন্য
হাতে আগামীর স্বপ্নÑ এভাবেই গড়ে উঠুক আমাদের আগামীর মেধা ও মনন। এই প্রাপ্তি ও
অপ্রাপ্তির ব্যবধান ঘুচিয়ে শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের নতুন বছরের
মূল লক্ষ্য। নতুন বই যেন কেবল জানুয়ারির প্রত্যাশা না হয়, বরং তা যেন প্রতিটি
শিশুর অধিকার হয়ে ওঠে।
আসলে নতুন বই মানেই নতুন
স্বপ্ন, শিক্ষার্থীদের
হাতে নতুন বই, শিক্ষকদের সামনে নতুন পরিকল্পনা আর অভিভাবকদের মনে নতুন প্রত্যাশা।
কিন্তু এবার মাধ্যমিক স্তরে সেই চিত্র ব্যাহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে জানতে পেড়েছি।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও এবার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সব নতুন বই পাচ্ছে
না। গত কয়েক
বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের
পাঠ্যবই নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। পাঠ্যবই ছাপাতে দেরি হওয়ায়
প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের ভুগতে হচ্ছে, তাদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই
যেকোনো মূল্যেই এই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অবিলম্বে বই ছাপা ও বিতরণ
কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ তদারকি সেল গঠন করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ
রক্ষায় এখনই কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা বলতে চাই, আমাদের শিশুদের এই স্বপ্নের
ওপর যেন কোনো সংকটের কালো ছায়া না পড়ে। বাল্যকালের সেই পহেলা জানুয়ারির উন্মাদনা
প্রতিটি শিশুর জীবনে ফিরে আসুক চিরকাল। কারণ একটি নতুন বই মানে একটি আলোকিত আগামীর
শুরু। শিক্ষার এই আলো যেন কোনো অজুহাতেই ম্লান না হয়, সেটাই আমাদের সমষ্টিক
প্রত্যাশা।
ড. মো. আনোয়ার
হোসেন
কলাম লেখক ও কথাসাহিত্যিক