ইমেইল থেকে
রাসেল আহমদ
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩২ এএম
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও জলজ সম্পদের জন্য হাওর এক অনন্য ভূ-প্রকৃতি। কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা মূলত একটিমাত্র ফসল বোরো ধান-নির্ভর। হাওরাঞ্চলের প্রায় ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে প্রতিবছর প্রায় ৫.২৩ মিলিয়ন টন বোরো ধান উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে হাওরের বোরো ফসল শুধু স্থানীয় অর্থনীতির নয়, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তারও অন্যতম ভিত্তি।
হাওর অধ্যুষিত সাত জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাওর রয়েছে
সুনামগঞ্জ জেলায়। ভারতের সীমান্তবর্তী হওয়ায় মেঘালয়ের অতিবৃষ্টিপ্রবণ এলাকা
চেরাপুঞ্জি ও মৌসিরামের পাহাড়ি ঢলের পানি সবার আগে এই জেলার হাওরগুলোকে প্লাবিত
করে। প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল মাসে উজানে অতিবৃষ্টি হলেই অকাল বন্যা বা ফ্ল্যাশ
ফ্লাডের আশঙ্কা দেখা দেয়, যা বোরো ফসলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য সরকার প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা
ব্যয়ে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করে থাকে। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রকল্প
বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের অংশগ্রহণে এই কাজ বাস্তবায়নের
কথা। উদ্দেশ্য ছিল যে কৃষক নিজের জমি রক্ষার দায়িত্ব পাবে, সে কাজে কোনো আপস করবে
না। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই গণমুখী উদ্যোগটি রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে
সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ৯৫টি হাওরে ৬৬০টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার
বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৫১০টি প্রকল্প
অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ১০৩ কোটি টাকা। প্রকল্প সংখ্যা ও ব্যয়ের অঙ্ক
যত বড়, তত বেশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা
যাচ্ছে, পিআইসি গঠন, সার্ভে ও কাজ শুরুর ক্ষেত্রে চরম ধীরগতি।
চলতি মৌসুমেও সুনামগঞ্জসহ হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোতে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ
এলাকায় তা হয়নি। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে,
কোথাও কোথাও পিআইসি গঠন না করেই বাঁধের কাজ শুরু করা হয়েছে।
প্রতিবছরই দেখা যায়, নিয়মরক্ষার উদ্বোধনের পর দীর্ঘদিন অধিকাংশ বাঁধের কাজ শুরুই
হয় না। অথচ ফসল রক্ষা বাঁধের ক্ষেত্রে সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে
নির্ধারিত সময়সীমা মিস করলে পরবর্তী কোনো ডেডলাইনই আর ঠিক রাখা যায় না। দেরিতে কাজ
শুরু হলে বন্যার সময় বাঁধের মাটি নরম থাকে এবং পানির তোড়ে সহজেই ভেঙে যায়। ফলে
অকাল বন্যায় পুরো হাওরের ফসল এক রাতেই পানির নিচে চলে যেতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের নামে
সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরনো। রাজনৈতিক চাপ, উৎকোচ বাণিজ্য ও
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে পিআইসি ব্যবস্থা তার মূল উদ্দেশ্য হারাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিবছরই পিআইসি গঠনে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠে আসে।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনী ব্যস্ততায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পক্ষে
মাঠপর্যায়ের তদারকি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই বিকল্প নজরদারি ব্যবস্থা
গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি হাওরে সর্বদলীয় কমিটি, স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ
ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।
হাওরের বোরো ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। এই ফসল ঝুঁকিতে পড়লে তার
প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়বে। তাই ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে কোনো
ধরনের গাফিলতি, অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা যায় না। শেষকথা একটাই, হাওরের ফসল
রক্ষা বাঁধে দুর্নীতির লাগাম টানতেই হবে, নইলে এর মাশুল দিতে হবে সমগ্র দেশকে।