× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুঁজিবাজার

ডিএসইর নতুন প্রধান নির্বাহীর সামনে চ্যালেঞ্জ

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৮ এএম

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:২২ পিএম

ডিএসইর নতুন প্রধান নির্বাহীর সামনে চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘদিন স্থবির অবস্থায় থাকার পর দেশের পুঁজিবাজারে আলোচনা করার মতো একটা সংবাদ এসেছে। সম্প্রতি দেশের প্রধান সেকেন্ডারি মার্কেট, ডিএসই (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) প্রধান নির্বাহী পদে নুজহাত আনোয়ারকে নিয়োগ দিয়েছে। ডিএসইর এবারের প্রধান নির্বাহীর নিয়োগ দুটো কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, ডিএসইর ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একজন মহিলা প্রধান নির্বাহী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে, বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থায় দায়িত্ব পালন করা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারের এই কঠিন সময়ে এরকম একজন উপযুক্ত ব্যক্তির নিয়োগ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ তো বটেই, দেশের পুঁজিবাজারের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

অনেকেই ভাবতে পারেন যে, সামান্য একজন প্রধান নির্বাহীর নিয়োগে এমন কি হতে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এরকমটা ভাবা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে যে মাত্রার করপোরেট সংস্কৃতির প্রচলন, সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রধান নির্বাহীর নিয়োগকে বিনিয়োগকারী এবং বিশ্লেষকরা যারপরনাই গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে থাকে। একজন প্রধান নির্বাহীর কারণে একটি কোম্পানির শেয়ারমূল্যের ওঠানামা করে। এই কারণে প্রধান নির্বাহী পরিবর্তনের সংবাদকে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন প্রধান নির্বাহীর কারণে একটি ভালো প্রতিষ্ঠান যেমন খারাপ হয়ে যেতে পারে, তেমনি একটি ডুবন্ত প্রতিষ্ঠান জেগেও উঠতে পারে। আমাদের দেশে প্রধান নির্বাহীকে এখনও সেই মাত্রার গুরুত্ব দিয়ে দেখার সংস্কৃতি শুরু হয়নি। তবে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজার যে অবস্থায় আছে, সেখানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নুজহাত চৌধুরীর নিয়োগ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

নুজহাত চৌধুরী ফাইন্যান্স থেকে গ্রাজুয়েশন করে বিশ্বের নামকরা দুটো বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আইএফসিতে (ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন) দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। কর্মজীবনের বড় একটা সময় ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট, মূলধন ব্যবস্থাপনা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং পোর্টফলিও ব্যবস্থাপনার কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে আধুনিক পুঁজিবাজার সম্পর্কে তার পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে, যা দেশের পুঁজিবাজারকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দীর্ঘদিন দেশের পুঁজিবাজার বেহাল অবস্থায় থাকায় নুজহাত চৌধুরীর সামনে আছে পাহারসম চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নতুন প্রধান নির্বাহীর জন্য সময়টা মোটেই সহায়ক নয়। সম্পূর্ণ প্রতিকূল একটা অবস্থার মধ্যে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বিগত বেশ কিছুদিন যাবৎ পুঁজিবাজারের প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি, উভয় মার্কেটে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। পুঁজিবাজার মন্দা থাকতেই পারে। কিন্তু মন্দা থাকার চেয়েও বেশি খারাপ অবস্থা হচ্ছে স্থবির হয়ে থাকা। আমাদের দেশে পুঁজিবাজার মূলত স্থবির হয়ে পড়ে আছে। পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্যই এমন যে এখানে কখনও চাঙ্গাভাব বিরাজ করবে, আবার কখনও মন্দা অবস্থা থাকবে। এক কথায় পুঁজিবাজার হচ্ছেÑ এমন একটি স্থান, যেখানে ষাঁড় এবং ভল্লুক (বুল অ্যান্ড বিয়ার) উভয়ই অবস্থান করে। পুঁজিবাজারে ষাঁড় এবং ভল্লুকের অবস্থান জেনেই বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করতে আসে। কিন্তু তারা এটি কখনও বিবেচনায় নেয় না যে এখানে দীর্ঘসময় স্থবির অবস্থা বিরাজ করবে। আমাদের দেশের পুঁজিবাজার মূলত স্থবির হয়ে আছে দীর্ঘসময় ধরে।

পুঁজিবাজারে মন্দা অবস্থা বিরাজ করা আর স্থবির হয়ে থাকার মধ্যে পার্থক্য আছে। পুঁজিবাজারে যখন অধিকাংশ শেয়ারের ক্রমাগত দরপতন ঘটে এবং শেয়ার মূল্যসূচক হ্রাস পেতে থাকে, তখন বলা যায়, পুঁজিবাজারে মন্দা অবস্থা চলছে। অধিকাংশ শেয়ারের দরপতন ঘটলেও শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ যে সব সময় কমে তেমন নয়। বরং শেয়ারেরে দাম কমলেও শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ বাড়তেও পারে এবং অতীতে এরকম অনেক হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, শেয়ারবাজারে মন্দা অবস্থা বিরাজ করলেও বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। তারা বাজারেই থাকে এবং অবস্থা বুঝে তাদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের কৌশল নির্ধারণ করে। অবশ্য কিছু দুর্বলচিত্তের বিনিয়োগকারী থাকে, যারা আতঙ্কিত হয়ে তড়িঘড়ি শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যায়। আবার বাজার ভালোর দিকে মোড় নিতেই, সেসব বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে ফিরেও আসে।

পুঁজিবাজার স্থবির হয়ে থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে শুধু যে শেয়ারের দরপতন এবং শেয়ার মূল্যসূচক হ্রাস পায় তেমন নয়, সেই সঙ্গে শেয়ার লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হ্রাস পায়। শেয়ার লেনদেনে কোনোরকম গতি থাকে না। বিনিয়োগকারীরা দিশাহারা অবস্থায় পড়ে যায়। অনেক খুচরা বিনিয়োগকারী তো বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও কিছুটা গুটিয়ে রাখেন।

পুঁজিবাজারে বিরাজমান স্থবির অবস্থা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাদের কার্যকর ভূমিকা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই পারে স্থবির পুঁজিবাজারকে কার্যকর করে তুলতে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে বিএসইসি পুঁজিবাজারকে কার্যকর এবং বিনিয়োগবান্ধব রাখতে সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে বলে মনে হয় না। অবস্থা দেখে মনে হয় যে, পুঁজিবাজারের চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাÑ বিএসইসি বেশি ঝিমিয়ে পড়েছে। অথচ এ কথা অনস্বীকার্য যে পুঁজিবাজারে বিএসইসি যত বেশি তাদের দৃঢ় অবস্থান দৃশ্যমান করতে পারবে, তত দ্রুত পুঁজিবাজারের স্থবিরতা কাটতে থাকবে। তবে এই দৃশ্যমান অবস্থানের অর্থ এই নয় যে তাদের দেখে বিনিয়োগকারী ভীতসন্ত্রস্ত হবে। মূলত তাদের দৃশ্যমান কৌশল এমন হবে যেখানে দুষ্ট বিনিয়োগকারী বা বাজার কারসাজির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের জন্য বিএসইসি হবে এক আতঙ্ক এবং ভালো বিনিয়োগকারীর জন্য হবে সবচেয়ে বেশি আস্থার জায়গা।

সারা বিশ্বে, এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশের শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের ধরন, বিনিয়োগ মাধ্যম, সবকিছুতেই এসেছে অনেক পরিবর্তন এবং আধুনিকতা। অথচ আমাদের দেশেরর শেয়ারবাজার সেই সেকেলে ধরনের ব্যক্তি উদ্যোগে স্টক ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ সেভাবে সৃষ্টি হয়নি। সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট আমাদের দেশে এখনও এক অচেনা বিনিয়োগ প্রডাক্ট। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ব্যবস্থা একেবারেই নেই। প্রবাসী মিউচুয়াল ফান্ড গঠন করে প্রবাসীদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেই। কার্যকর বন্ড মার্কেট চালু করে কম ঝুঁকির, মধ্যম ঝুঁকির এবং অধিক ঝুঁকির বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। সর্বোপরি আমরা দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে ধরতে পারিনি যে শেয়ারবাজার মোটেই রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জায়গা নয়, বরং এটি ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের একটি বিকল্প ব্যবস্থা, যেখান থেকে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের ওপর উপার্জনের চেয়ে কিছু কম উপার্জন হবে কিন্তু ভবিষ্যতে ভালো উপার্জনের একটা সুযোগ থাকবে।

দেশে স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের স্বার্থে বিএসইসি এই কাজগুলো করতে সক্ষম হয়নি। বিএসইসির যে কাঠামো সেখানে কমিশন নিয়োগ হয় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। পক্ষান্তরে কমিশনের কর্মকর্তারা সেখানে স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাদের পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা অনেক বেশি। তারা একদিকে যেমন কমিশনকে সহযোগিতা করে সঠিকভাবে পুঁজিবাজার বিষয়ে নীতি প্রণয়নে, অন্যদিকে তেমনি সেই নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে কমিশনের কর্মকর্তারই। ফলে পুঁজিবাজার উন্নয়নে বিএসইসির কমিশন এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া থাকতে হয় এবং আছেও। কিন্তু মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় ঘটে এবং তখনই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের শেয়ারবাজার, দেশের পুঁজিবাজার এখন যে অবস্থায় আছে সেখান থেকে এর উন্নতি ঘটাতে হলে বিএসইসির নিরন্ত্রণ করার প্রয়োজন আছে। কমিশন এবং কর্মকর্তা একযোগে কমিটমেন্ট নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারলেই পুঁজিবাজারের স্থবিরতা কাটতে পারে।

এরকম আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থার সঞ্চার করে তাদেরকে পুঁজিবাজারে ফিরিয়ে আনা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব চ্যালেঞ্জের অধিকাংশই বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।

এখানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহীর করণীয় খুবই সীমিত। কিন্তু বিষয়গুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ করে একটি পলিসি পেপার তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজগুলো সম্পন্ন করার ভূমিকা নিতে হবে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহীর। এই ধরনের ভূমিকাই আধুনিক প্রধান নির্বাহীর অন্যতম দায়িত্ব। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নতুন প্রধান নির্বাহী যদি তার অভিজ্ঞতার আলোকে এই ভূমিকাটি রাখতে পারেন, তাহলে দেশের মৃতপ্রায় পুঁজিবাজার নিশ্চয়ই ঘুরে দাঁড়াবে। আমরাও সেই প্রত্যাশায় থাকলাম।


নিরঞ্জন রায়

সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা