খালেদা জিয়া
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২৯ এএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নেতা-নেত্রী কেবল ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন না, তারা সময়কে প্রভাবিত করেন, আন্দোলনকে দিশা দেন এবং ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেন। বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার মতো ক্যারিশম্যাটিক, দৃঢ়চেতা এবং সংগ্রামী নেত্রী আর দেখা যায়নি এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব-রাজনীতিতে নেতৃত্বের সাফল্যের জন্য যে গুণাবলি প্রয়োজন দৃঢ়তা, ধৈর্য, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আপসহীনতা ও গণসংযোগ, তার প্রায় সবই খালেদা জিয়ার মধ্যে সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিল।
আমার সঙ্গে খালেদা
জিয়ার প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে, ঢাকার ধানমন্ডিতে বিএনপির কেন্দ্রীয়
কার্যালয়ে। সে সময় বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। রাষ্ট্রপতি এরশাদের স্বৈরশাসনের
বিরুদ্ধে উত্তাল গণ-আন্দোলন, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে কেয়ারটেকার সরকার
গঠনের প্রক্রিয়া, রাজপথে ছাত্র-জনতার অবিরাম লড়াই সব মিলিয়ে দেশ যেন নতুন ভোরের অপেক্ষায়।
ঘটনাক্রমে আমি তখন বাংলাদেশে অবস্থান করছিলাম। বিএনপি যুবদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক
গয়েশ্বর রায়ের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে এক সন্ধ্যায় অফিসে যাই। সেদিনই প্রথমবারের
মতো কাছ থেকে দেখি বেগম খালেদা জিয়াকে।
তার কথাবার্তা,
ব্যক্তিত্ব, সংযত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। মনে হয়েছিল, এই নারী
কেবল একজন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নন, তিনি নিজেই একদিন রাষ্ট্রের নেতৃত্বে পৌঁছবেন।
সময়ই পরে সেই বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করেছে।
আমি জার্মানিতে
থাকলেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি ধাপ গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। ইউরোপের
রাজনৈতিক পরিসর থেকে বাংলাদেশের আন্দোলন দেখার একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। সে
সময় তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আখতারুজ্জামানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি দেশের
ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাকে অবিরাম অবহিত রাখতেন। তার বিশ্লেষণে একটি বিষয় বরাবরই
স্পষ্ট ছিল ছাত্র আন্দোলনকারীদের কাছে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল আপসহীন ও নির্ভরযোগ্য।
তিনি শেখ হাসিনার তুলনায় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্দোলনমুখী ভূমিকাকে অধিক
গুরুত্ব দিতেন। কারণ, মাঠের কর্মী ও ছাত্রসমাজ খালেদা জিয়াকে দেখত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে
দৃঢ় প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে।
এরশাদ শাসনামলে
খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল এক কথায় অনন্য। তার রাজনীতিতে প্রবেশ কোনো পরিকল্পিত ক্ষমতালোভী
যাত্রা ছিল না; বরং এটি ছিল এক প্রতিকূল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দায়িত্ব গ্রহণের
ইতিহাস। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি ছিল নেতৃত্বশূন্য, বিভক্ত ও দিশাহীন।
সেই সংকটময় সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকেও খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। ধীরে ধীরে তিনি
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে
খালেদা জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে তার
উপস্থিতি, নির্দেশনা ও দৃঢ় অবস্থান আন্দোলনকারীদের সাহস জুগিয়েছে। রাজপথে ছাত্র-জনতার
আত্মত্যাগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে সমন্বয় প্রয়োজন, তা তিনি দক্ষতার সঙ্গে রক্ষা
করেছিলেন। ফলে এরশাদ সরকারের পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
স্বৈরাচার পতনের
পর গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা
জিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সামনে ছিল ধ্বংসপ্রায় প্রশাসন,
ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বিভক্ত সমাজ। এসব সীমাবদ্ধতার
মধ্যেও তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের
স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়গুলোতে
রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামেও খালেদা জিয়া ছিলেন অবিচল। কখনও বিরোধী দলে, কখনও ক্ষমতায় তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন একটি দায়িত্ব হিসেবে, সুবিধা হিসেবে নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা,
কারাবরণ ও নানা বাধা সত্ত্বেও তিনি কখনও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।
আজকের বাংলাদেশে
দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে স্পষ্ট হয় খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী নন, তিনি একটি
রাজনৈতিক যুগের প্রতিনিধি। তার নেতৃত্বে বিএনপি যেমন সংগঠিত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের
রাজনীতিতে বিরোধী শক্তির ধারণাটিও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী
দল যে কতটা জরুরি, তার বাস্তব উদাহরণ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রবাস থেকে পর্যবেক্ষণ এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগÑ সব মিলিয়ে আমার কাছে খালেদা জিয়া মানে আপসহীন নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নেত্রী বিরল, যিনি সংকটে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন এবং ক্ষমতায় থেকেও আপসহীন অবস্থান বজায় রেখেছেন। খালেদা জিয়া সেই বিরল ব্যতিক্রম, যার নাম উচ্চারণ করলেই একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক অধ্যায়ের কথা মনে পড়ে।
হাবিব বাবুল
জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক