স্বাগত ২০২৬ সাল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩৭ পিএম
আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪২ পিএম
কালের নিয়মে আরও একটি নতুন বছরের পা রেখেছি আমরা। বিদায় ২০২৫ সাল। স্বাগত ২০২৬ ইংরেজি নববর্ষ। বাস্তবতার নিরিখে এ কথা বলা বাহুল্য হবে না যে, ২০২৬ সাল কেবল ক্যালেন্ডারের আরেকটি বছর নয় এটি জাতির জন্য একটি নতুন স্বপ্নযাত্রা স্বার্থক করে তোলার বছরও। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বিভাজন ও গণতান্ত্রিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাওয়া একটি জাতির সামনে এই নতুন বছর নিয়ে এসেছে নতুন প্রত্যাশা। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০২৬ সাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
গত
কয়েক বছরে দেশের মানুষ দেখেছে একদিকে উন্নয়নের শ্লথগতি, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি;
কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার অবক্ষয়। এসব বাস্তবতা মানুষের
মনে হতাশা জমিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, বাঙালি জাতি সংকটের মধ্যেই নতুন পথ খুঁজে নিতে
জানে। সেই পথের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য
নির্বাচন।
জাতীয়
নির্বাচন কোনো একক দলের উৎসব নয়Ñ এটি পুরো জাতির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ও প্রতিষ্ঠার
সর্বোচ্চ মাধ্যম। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের
গণতান্ত্রিক ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ। জনগণ চায় এমন একটি নির্বাচন, যেখানে ভোট
দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত হবে। ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থাকবে না এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে
প্রতিযোগিতা হবে নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে।
দেশ
ও জাতির নতুন স্বপ্নযাত্রা সফল করে তোলার কাজে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব সরকারের। নির্বাচন
কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা বজায় রাখা এবং
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রযন্ত্র
যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে নির্বাচনের ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হবে, আর সেই আস্থাহীনতা
বছরজুড়ে অস্থিরতা ডেকে আনবে।
একই
সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধীÑ সব দলের উচিত সংঘাতের
পথ পরিহার করে নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া। আন্দোলন ও পাল্টা আন্দোলনের রাজনীতি
দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। জনগণ এখন আর অচলাবস্থা
চায় না, তারা চায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে ভোটই হবে শেষ কথা।
২০২৬
সালের স্বপ্ন শুধু নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বছরে হতে পারে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের
সূচনা। স্থবির বিনিয়োগ, সংকুচিত কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে
হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন সেই স্থিতিশীলতার
ভিত্তি তৈরি করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে, উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আসবে, কর্মসংস্থানের
সুযোগ বাড়বেÑ এই আশাই মানুষ করছে।
তরুণ
সমাজের জন্যও ২০২৬ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রজন্ম চাকরি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে সমান
সুযোগ চায়। তারা রাজনীতিতে সহিংসতা নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দেখতে চায়। জাতীয় নির্বাচন
যদি তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে আরও প্রাণবন্ত
ও উদ্ভাবনী। কারণ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্যও ছিল তাই। ভুলে গেলে
চলবে না, এই ছাত্র-জনতা যে স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল, তা শুধু একটি সময়ের প্রতিবাদ
নয়— ছিল ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও
মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি। তারা চেয়েছিল নিরাপদ ভবিষ্যৎ, ভোটের অধিকার, কর্মসংস্থানের
সুযোগ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। সেই কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হলে জাতি পথ হারাবে। ২০২৬ সালে
জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সেই দাবি পূরণের সুযোগ এসেছে। ছাত্র-জনতার চাওয়া বাস্তবে
রূপ নিলে রাষ্ট্র ফিরে পাবে আস্থা, আর তরুণ প্রজন্ম দেখবে তাদের স্বপ্ন বৃথা যায়নি।
তবে
২০২৬ সালের নতুন স্বপ্নযাত্রা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত আচরণ
ও সিদ্ধান্তের ওপর। সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষÑ সবার দায়িত্ব আছে
এই যাত্রাকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার। বিভাজনের রাজনীতি নয়, ঐক্যের চেতনা; অবিশ্বাস নয়,
আস্থা; অস্থিরতা নয়, স্থিতিশীলতাই হতে হবে আমাদের অঙ্গীকার। ২০২৬ সাল হোক গণতন্ত্রের
পুনর্জাগরণের বছর, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার বছর এবং একটি
আশাবাদী, আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের নতুন সূচনা। কাঙ্খিত স্বপ্নযাত্রা সফল হোকÑ এই প্রত্যাশাই
আজ আমাদের সবার।