খালেদা জিয়ার চিরবিদায়
ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৮ পিএম
আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩১ পিএম
সকল আশা-আকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক
ব্যক্তিত্ব তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন। জাতি তার মৃত্যুশোকে
কাতর হয়ে পড়েছে। দলমতনির্বিশেষে সবাই বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা
করছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এক
দিনের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নামাজে জানাজা
অনুষ্ঠানের পর সংসদ ভবনের উত্তর পাশে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর
রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে জনপ্রিয়
ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশ একজন সত্যিকার জাতীয়তাবাদী নেতাকে হারাল,
যার অন্তরজুড়ে ছিল শুধু দেশ আর দেশের মানুষের মঙ্গল চিন্তা। 
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার একবার বলেছিলেন, সেই প্রকৃত
রাষ্ট্রনায়ক যিনি জনগণের দাবির নিকট নতি স্বীকার না করে নিজের ব্যক্তিত্ব এবং সততা
দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারেন। তিনি এ কথা বলেছিলেন ব্রিটেনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির
প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমে এলে। টনি ব্লেয়ার আন্দোলনকারীদের নিকট নতি স্বীকার না
করে আন্দোলনকারীদের বোঝাতে সক্ষম হন কেন সেই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করাটাই
জরুরি ছিল। টনি ব্লেয়ারের বক্তব্যের সূত্র ধরে বলা যায়, তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রশাসক
যিনি নিজ ব্যক্তিত্ব গুণে সাধারণ মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিতে পারেন। বেগম খালেদা
জিয়া তার বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং অনমনীয় মনোবলের কারণে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরদিন
জাগরূক হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া
ছিলেন তেমনটি একজন নেত্রী, যার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। বেগম খালেদা জিয়া পাঁচবার
২৩টি আসন থেকে নির্বাচন করেছেন এবং প্রতিবারই জয়লাভ করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনের
ইতিহাসে এ ধরনের অর্জন বিরল। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল
পাহাড়ের মতো দৃঢ়। তিনি আপসহীন নেত্রী ছিলেন কিন্তু একগুঁয়ে বা জেদি ছিলেন না। দেশের
জনগণের প্রয়োজনে তিনি যেকোনো ছাড় দিতেও কার্পণ্য করতেন না। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন,
আমরা বেশ ক’জন প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান পেয়েছি কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক
পেয়েছি খুবই কম। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন পরিপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক, যিনি তার সততা
এবং ব্যক্তিত্ব গুণে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছেন।
বাংলাদেশের মানুষের অতি আপনজন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন রোগভোগের
পর গত ৩০ ডিসেম্বর ভোররাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি
হয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসার পর রোগমুক্তি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে
পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। তাই বেগম
খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। তার এই মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য, গণতন্ত্রের
জন্য এক বিরাট ক্ষতি। তিনি এমন একসময় মৃত্যুবরণ করলেন যখন দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম
করছে। ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট প্রিয় মাতৃভূমি যখন গণতন্ত্রের পথে
উত্তরণের পর্যায়ে রয়েছে ঠিক তখনই বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কথায় বলে,
জন্ম অনিশ্চিত হলেও মৃত্যু অনিবার্য বাস্তবতা। প্রতিটি জীবাত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ
করতেই হবে। কিন্তু তারপরও কোনো কোনো মৃত্যু আছে, যা মেনে নেওয়া কষ্টকর, মেনে নেওয়া
যায় না। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে
নেওয়ার মতো নয়। তার এই মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতির সৃষ্টি করেছে। মৃত্যুকালে
বেগম খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ-ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার
(বর্তমানে দিনাজপুর) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ইস্কান্দার
মজুমদার এবং মায়ের নাম তৈয়বা হক। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকনাম পুতুল। পারিবারিক সম্মতিতে
১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে
আবদ্ধ হন। বেগম খালেদা জিয়া একান্তই গৃহকর্মে নিয়োজিত ছিলেন। তার স্বামী সেনা কর্মকর্তা
জিয়াউর রহমানও ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত তেমন একটা পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু একটি ঘোষণা
জিয়াউর রহমানকে রাতারাতি দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি
সেনাবাহিনী নিরীহ বাংলাদেশিদের ওপর আক্রমণ শুরু করলে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা,
পাকিস্তান পার্লামেন্টে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি
বর্বর সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার বরণ করলে সমগ্র জাতি দিগভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সেই দুঃসহ
সময়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা
ঘোষণা করেন। মেজর জিয়ার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা আশাহত জাতিকে আশার আলো দেখায়। আমি নিজেও
মেজর জিয়ার সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা শ্রবণ করি। আমি যারপরনাই উদ্বুদ্ধ হই। সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করি, স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানের জন্য। এক পর্যায়ে আমি ভারতে চলে যাই এবং মুক্তিযুদ্ধের
পক্ষে কাজ করতে থাকি।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। সেই সময় আওয়ামী
লীগের দুঃশাসনে দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। চারদিকে শুধু লুটপাট আর লুটপাট। মানুষের
মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। কথা বলার অধিকার, এমনকি রাজনীতি করার অধিকারও কেড়ে নেওয়া
হয়। আজীবন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকার মানসে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠন
করা হয়। এই অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। আওয়ামী লীগের একটি
গ্রুপ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। পরবর্তীতে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জিয়াউর
রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক এবং একজন
সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সাধারণ মানুষের নিকট তার ব্যাপক সমর্থন ছিল। জিয়াউর রহমান
সামারিক ছাউনি থেকে ক্ষমতায় এলেও তিনি বাকশাল-ব্যবস্থা বাতিল করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির বিরল, যেখানে একজন সামরিক কর্মকর্তা দেশে গণতন্ত্র
প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তে একজন বিপথগামী সেনাসদস্যের
হাতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিহত হলে রাজনৈতিক দল
হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। দলের ভেতরে নানা ধরনের গ্রুপিং হতে থাকে। সরকারি
রোষানলে পতিত হয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পতিত হয়। সেই অবস্থায় দলের
শুভাকাঙ্ক্ষীরা বেগম খালেদা জিয়াকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে রাজনীতিতে আসার জন্য আমন্ত্রণ
জানান।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ লাভ করেন।
১৯৮৩ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে বেগম
খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ৪১
বছরেরও বেশি সময় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন সময় আন্দোলন-সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন
করেছেন। বিশেষ করে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ পতনের আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া যে দূরদর্শিতা
এবং বলিষ্ঠতার পরিচয় দেন তা ছিল নজিরবিহীন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক জোট,
বিএনপির নেতৃত্বে আর একটি জোট এবং জামায়াতে ইসলামী পৃথকভাবে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে।
সেই সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। আওয়ামী লীগ
নেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের এক জনসভায় ঘোষণা করেন, ‘যারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে
অংশ নেবে তারা জাতীয় বেইমান।’ বিএনপি এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ব্যাপারে
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকলেও রহস্যজনক কারণে আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ
করে। সেই সময় বিএনপি এবং বিশেষ করে এর নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে একা
হয়ে পড়েন। অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগ সেই সময় চেয়েছিল বিএনপিকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে
বিদায় করে দিতে। কিন্তু কিছুদিন পরই আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ
করে আন্দোলনের মাঠে চলে আসেন। এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা যে একটি মারাত্মক
রাজনৈতিক ভুল ছিল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী বহু মূল্য দিয়ে তা অনুধাবন করতে পারে।
একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে এই ঘটনায়। এরশাদবিরোধী
দুর্বার গণ-আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন
নেত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়। রাজনীতির মাঠে বেগম খালেদা জিয়ার গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্তই
ছিল সঠিক।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন স্বচ্ছ ও সৎ রাজনীতিবিদ। বিগত স্বৈরাচারী
সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো গ্রহণযোগ্য অভিযোগ
সরকার দাঁড় করাতে পারেনি। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আজ্ঞাবহ বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে বেগম
জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। মামলা যে মিথ্যে তা জানা সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া আদালতের
বিরুদ্ধে কোনো কটূক্তি করেননি। বিগত সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও বেগম খালেদা জিয়ার
বিরুদ্ধে দুর্নীতির গ্রহণযোগ্য কোনো অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেনি। বেগম খালেদা জিয়া
তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করে কোর্ট থেকে খালাস
পেয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়া একজন পরিশীলিত এবং স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ। তিনি কখনোই
প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কটু বা অশ্লীল বাক্য বর্ষণ করেননি। কীভাবে প্রতিপক্ষের ব্যাপারে
কথা বলতে হয়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে
যেসব অশ্লীল বাক্য বর্ষণ করতেন এবং আজেবাজে কথা বলতেন তা শুনলে গাত্রজ্বালা করে। একবার
আদালত থেকে শেখ হাসিনাকে ‘রঙ হেডেড’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা যেভাবে খালেদা
জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলেছেন তা নজিরবিহীন। বেগম খালেদা
জিয়া ও তার পরিবার যেভাবে প্রতিপক্ষের হাতে নিগৃহীত হয়েছে তার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে
বিরল। স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে বেগম খালেদা জিয়া
ও তার পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের
বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। মিথ্যা মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে দিনের পর দিন
কারাবন্দি করে রাখা হয়। সেখানে তার সুচিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি বেগম খালেদা
জিয়াকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি।
শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও দেশের মানুষকে ছেড়ে
বিদেশে যাননি। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। আমার কোনো সম্পত্তি
নেই। কাজেই আমি দেশেই থাকব।’ বেগম খালেদা জিয়াকে একাধিকবার দেশের বাইরে নির্বাসন দেওয়ার
চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সেই ফাঁদে পা দেননি। ১/১১ সময় বেগম খালেদা জিয়াকে এবং
শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে তাদের রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা বিদেশে চলে গেলেও খালেদা জিয়াকে কোনোভাবেই বিদেশে নির্বাসন দেওয়া সম্ভব
হয়নি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বিদেশে নির্বাসনের বিরোধিতা করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া দেশকে
ভালবাসতেন। দেশের মানুষও তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতেন। তিনি সব সময় জাতীয় ঐক্যের কথা
বলতেন। একটি ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আমি প্রতিশোধ নিতে আসিনি। এই দেশ এবং
দেশের মানুষই আমার সব। মাটি ও মানুষের কল্যাণ সাধনই আমার লক্ষ্য। শহীদ প্রেসিডেন্ট
জিয়াউর রহমান এবং তার পরিবার যেভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিলেন চাইলে বেগম
খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তার চরম প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথে
যাননি। বরং সব সময় চেষ্টা করেছেন কীভাবে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা যায়। শেখ হাসিনা একবার
লন্ডনে বিশিষ্ট সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি দেশে
যাচ্ছি রাজনীতি করার জন্য নয়। আমার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে। শেখ হাসিনা তার এই
কথাটি রেখেছিলেন, যদিও অন্য কোনো অঙ্গীকার তিনি পূরণ করতে পারেননি। তার একমাত্র কাজ
ছিল জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণ।
আশির দশকের শেষের দিকে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমি
তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনাকালে
তার ব্যক্তিত্বে আমি মুগ্ধ হই। তিনি কথা বলতেন খুবই কম। কিন্তু অন্যদের কথা শুনতেন
অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে। কোনো কোনো সময় আমি বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত
প্রকাশ করেছি। এতে তিনি মোটেও ক্ষুব্ধ বা মনঃক্ষুণ্ন হতেন না। আমার প্রস্তাব যৌক্তিক
হলে তা গ্রহণ করতেন। আর গ্রহণযোগ্য মনে না হলে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান
করতেন।
বেগম খালেদা জিয়া এদেশের মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেছেন। জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই স্বল্প পরিসরে তার অবদানের কথা তুলে ধরা সম্ভব নয়। শুধু বলব, তিনি বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার মৃত্যুতে জাতি হারাল এক দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ককে। আর আমি হারালাম আমার পরম শুভাকাঙ্ক্ষীকে। তার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন। তিনি বেঁচে থাকবেন কোটি কোটি মানুষের অন্তরে-হৃদয়ে অনন্তকাল ধরে।
ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত