স্বাগত ২০২৬
মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:১০ পিএম
ইংরেজি নববর্ষ বা ‘নিউ ইয়ার্স ডে’ হলো গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন। ২০২৬ সালের প্রথম দিনটি বিশ্বজুড়ে নব উদ্দীপনা এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে।এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন নয়, বরং ব্যক্তিগত ও বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণের একটি মাহেন্দ্রক্ষণ। বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা কাটিয়ে ২০২৬ সালকে মানবতা ও প্রযুক্তির এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাস প্রায় ৪,০০০ বছরের পুরনো। প্রাচীন মেসোপটেমীয়
(ব্যাবিলন) সভ্যতায় প্রথম নববর্ষ পালন শুরু হয়। পরবর্তীতে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার
খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ প্রবর্তন করেন এবং ১ জানুয়ারিকে বছরের
প্রথম দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। রোমানদের দেবতা ‘জানুস’ (যার দুটি মুখÑ একটি পেছনের দিকে
বা অতীতে, অন্যটি সামনের দিকে বা ভবিষ্যতে)-এর নামানুসারে জানুয়ারি মাসের নামকরণ করা
হয়। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি অষ্টম গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের মাধ্যমে
একে বর্তমান রূপ দান করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজস্ব সংস্কৃতিতে নববর্ষ পালিত হয়। নিউইয়র্কের
‘টাইমস স্কয়ারে’ বিশাল বল ড্রপ করা হয়, সিডনির হারবার ব্রিজে চলে দৃষ্টিনন্দন আতশবাজি।
জাপানের মানুষ মন্দিরে গিয়ে ১০৮ বার ঘণ্টা বাজিয়ে অশুভ শক্তি দূর করে। স্পেনে নববর্ষের
মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ১২টি আঙুর খাওয়ার প্রথা রয়েছে। অন্যদিকে স্কটল্যান্ডে
‘হগমানে’ উৎসবে আগুনের খেলা এবং প্রথম অতিথি আসার (ফার্স্টফুটিং) রীতি প্রচলিত।
২০২৬ সালের নববর্ষ বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম উৎকর্ষ এবং
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সংকল্প নিয়ে পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে এ বছর নববর্ষের আমেজ কিছুটা ভিন্ন, কারণ এখানে জাতীয় সংসদ
নির্বাচন স্পর্শ করার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশে এবার
নববর্ষ পালনে নিরাপত্তার পাশাপাশি সচেতনতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
টিএসসি, রমনা ও হাতিরঝিলে তরুণদের জমায়েত থাকলেও আশা করা যাচ্ছে, এবার তা থাকছে সুশৃঙ্খল।
এবার বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতি শোকার্ত। দেশে তিন দিনের শোক দিবস চলছে।
তার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ এবার আতশবাজি বা সাংস্কৃতিক কোনো উৎস থাকছে না।
প্রতিবছর ১ জানুয়ারি সকালে আমরা সবাই যেন একেকজন সাধু বনে যাই! ডায়েরি
খুলে লিখিÑ ‘কাল থেকে ভোরে উঠব’, ‘ফাস্টফুড ছাড়ব’ আর ‘ফেসবুক কম চালাব’। কিন্তু ঘড়িতে
সকাল ১০টা বাজতেই ডায়েরিটা বালিশের নিচে চলে যায়, আর পিৎজা অর্ডারের নোটিফিকেশন বেজে
ওঠে। আমাদের ব্যায়াম করার সিদ্ধান্তগুলো তো জিম মালিকদের পকেট ভরার জন্যই নেওয়া হয়,
কারণ ৭ দিনের বেশি আমাদের আর সেখানে দেখা যায় না। অনেকে আবার শপথ নেন ‘এ বছর কারও গিবত
করব না’, অথচ বন্ধুদের দেখলে প্রথম বাক্যটিই হয়Ñ ‘শুনছিস, ও কি করেছে?’ আসলে আমাদের
নববর্ষের রেজোলিউশনগুলো অনেকটা ডায়েট চার্টের মতো, যা শুধু পড়ার জন্যই বানানো হয়, মানার
জন্য নয়। তবুও আমরা প্রতিবছর নতুন করে স্বপ্ন দেখি, কারণ স্বপ্ন দেখতে তো আর টাকা লাগে
না!
নববর্ষে আমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে কামনা করি যে, ২০২৬ সাল আসুক
বারুদ আর কামানের গর্জন ছাপিয়ে শান্তির সাদা পায়রা হয়ে। পৃথিবীর বুক থেকে যুদ্ধের কালোছায়া
মুছে গিয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ঘুচে যাক। একটি শিশুও যেন খাবারের অভাবে না কাঁদে।
কোনো সীমান্ত যেন মানুষের মধ্যে দেওয়াল না তোলে। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আমরা
গড়ে তুলব এক বৈষম্যহীন নতুন বিশ্ব। ২০২৬ হোক ভ্রাতৃত্বের বছর, যেখানে ভালোবাসাই হবে
মানুষের একমাত্র পরিচয়। এই আমাদের প্রত্যাশা, এই আমাদের আগামীর প্রার্থনা।
আমরা আশাবাদী হতে চাই, ২০২৬ সালে আমরা এমন এক বাংলাদেশ পাব যেখানে
রাজনীতির নামে কোনো হানাহানি থাকবে না। ধনী ও গরিবের মধ্যকার আকাশচুম্বী ব্যবধান কমে
আসবে, অন্ন মিলবে প্রতিটি সাধারণ মানুষের ঘরে। প্রতিটি নাগরিকের কণ্ঠস্বর হবে মর্যাদাপূর্ণ
এবং বিচারব্যবস্থা হবে মানবিক ও ন্যায়ের প্রতীক। অনৈক্য দূর হয়ে জাতীয় স্বার্থে সবাই
হবে একতাবদ্ধ, গড়ে উঠবে দুর্ভেদ্য ভ্রাতৃত্ব। আধুনিক প্রযুক্তি আর দেশপ্রেমের সমন্বয়ে
বাংলাদেশ হবে বিশ্বের রোল মডেল। ২০২৬ হোক আমাদের পুনর্জাগরণের বছর, যেখানে মানুষ মানুষের
জন্য নিবেদিত হবে। এই স্বপ্নের লাল-সবুজ পতাকা উড়বে সুউচ্চ গৌরবে।
২০২৬ সাল আমাদের সামনে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, এটি একটি বিশাল ক্যানভাস যেখানে আমরা আমাদের স্বপ্নের রঙ দিয়ে নতুন পৃথিবী আঁকব। মাদক, ইভ টিজিং, যৌতুক, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন মুক্ত বাংলাদেশ, শান্তিময় ফিলিস্তিন, নিরাপদ শৈশব এবং বৈষম্যহীন সমাজÑ এগুলো কেবল কল্পনা নয়, বরং আমাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবে রূপান্তর করতে হবে। আসুন, অতীতের গ্লানি মুছে ফেলে, একে অপরের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিয়ে এক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হই। ২০২৬ সাল হোক মানুষের জয়গান গাওয়ার বছর, ২০২৬ সাল হোক চিরস্থায়ী শান্তির সোপান। স্মৃতির পাতায় ২০২৫ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে টিকে থাকতে হয়, আর আগামীর স্বপ্নে ২০২৬ আমাদের শেখাবে কীভাবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে হয়।
মো. আনোয়ার হোসেন
শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক