বেগম খালেদা জিয়া
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৭ এএম
পরপারে চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি গত মঙ্গলবার ভোরে আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আমরা দোয়া করছি, বাংলাদেশের গণতন্ত্র উত্তরণের অগ্রযাত্রী এই মহীয়সী নারীকে আল্লাহ’তায়ালা কবুল করবেন এবং বেহেস্তের সর্বোচ্চ মাকাম দান করবেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার অবদান, তার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি শুরু থেকেই ছিল অস্থিরতা, সংঘাত ও ক্ষমতার
দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে, এক গৃহবধূ থেকে যিনি হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের
ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিন তিনবার নির্বাচিত গণতান্ত্রিক
নেতৃত্বের প্রতীক তিনি বেগম খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বের উত্থান, সংগ্রাম এবং আপসহীন
অবস্থান কেবল একটি রাজনৈতিক জীবনের কাহিনী নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের
ইতিহাস।
১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিপথগামী কতিপয় সেনাসদস্য কর্তৃক ‘ক্যু’-এর
মাধ্যমে শহীদ হলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে রাজনৈতিক শূন্যতায় পড়ে, তখন
বেগম খালেদা জিয়া দলের উদ্ধারকারক হিসেবে রাজনীতির অস্থির ময়দানে প্রবেশ করেন এবং দলের
নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেন। এক তরুণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ঝড়ো মাঠে তার পদার্পণ ছিল
তখন অনিবার্য, তবে অতি দ্রুততার সঙ্গেই তিনি নিজেকে রূপান্তরিত করেন এক দৃঢ়চেতা ও প্রজ্ঞাবান
নেত্রীতে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার নেতৃত্ব, গণ-আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে দৃঢ় অবস্থান
এবং পরবর্তীতে তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়া তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও
সাহসিকতার প্রতিফলন।
আপসহীন নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার
পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসেই যে সিদ্ধান্তটি
তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রদর্শনের পরিচয় দেয়, তা হলো রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা
বাতিল করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। ১৯৯১ সালের সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে
নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সংসদের কাছে ন্যস্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ও
সংসদকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু করা হয়, আর রাষ্ট্রপতিকে রাখা হয় সাংবিধানিক
ও আনুষ্ঠানিক সীমার মধ্যে। এটি নিছক একটি সাংবিধানিক সংশোধনী ছিল না; বরং এটি ছিল ক্ষমতার
বিকেন্দ্রীকরণ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে আস্থার সাহসী ঘোষণা।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যেখানে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা প্রবল, সেখানে একজন
নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নিজ ক্ষমতা সীমিত করে সংসদকে শক্তিশালী করেছেনÑ এটি বিরল ও
দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা। এই সময়কালে বহুদলীয় রাজনীতির পরিবেশ পুনরুদ্ধার হয়, সংবাদমাধ্যম
ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসার লাভ করে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া
হয়, শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে নেওয়া হয় বাস্তবমুখী উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক
অঙ্গনেও বাংলাদেশ আবার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এতে
বেগম জিয়ার প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও বাস্তববাদী নীতি তাকে এক ‘জনমুখী প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করে। ইতিহাসের নিরপেক্ষ বিচারেও ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে
বড় সাফল্য ছিল রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
এই অর্জন কোনো দলীয় কৃতিত্বের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক
ইতিহাসের এক মাইলফলক।
বেগম খালেদা জিয়ার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শাসনামলও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে
একাধিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। এটি ছিল একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা
রক্ষার একটি নজির, অন্যদিকে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, নিরাপত্তা সংকট ও বিতর্কের সময়কাল।
স্বাধীনতার-পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো কোনো নির্বাচিত সরকার পূর্ণ পাঁচ বছর মেয়াদে
ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পায়, যা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে
একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সময়কালে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়। রপ্তানি
ও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির
বিস্তার এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিকে একটি স্থির ভিত্তির
ওপর দাঁড় করাতে সহায়তা করে। বিশেষ করে, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ
ও নারীশিক্ষায় অগ্রগতির ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়।
তবে এই শাসনামল নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।
জঙ্গিবাদের উত্থান, সিরিজ বোমা হামলা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা রাষ্ট্রের জন্য গভীর উদ্বেগের
কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব সংকট মোকাবিলায় র্যাব গঠন এবং পরবর্তীতে জঙ্গিবিরোধী কঠোর অভিযান
সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই সময়টিতে রাজনৈতিক
অঙ্গনে ছিল তীব্র দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের
ঘাটতি, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে মতবিরোধ এবং বড় বড় সহিংস ঘটনার ফলে গণতান্ত্রিক চর্চা
বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ভারসাম্যপূর্ণ
কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্রিয়
অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এবং বৈদেশিক সম্পর্ক সুদৃঢ়
করতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের
প্রয়াস অব্যাহত থাকে। সব মিলিয়ে, ২০০১-২০০৬ সালের শাসনামল ছিল সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার
এক জটিল সংমিশ্রণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সাল ছিল এক গভীর সংকট ও অস্বাভাবিক পরিবর্তনের
বছর। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচন প্রশ্নে অচলাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক
বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ১১ জানুয়ারি ২০০৭ সালে আবির্ভূত হয় তথাকথিত ‘জরুরি অবস্থা’ ও
সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এটি ছিল সাংবিধানিক ধারার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা
পুনর্বিন্যাসের এক নাটকীয় অধ্যায়, যা গণতন্ত্রকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে দেয়।
এই সময়ের মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল ‘রাজনৈতিক সংস্কার’ ও ‘দুর্নীতিমুক্ত
রাজনীতি’। কিন্তু বাস্তবে এটি দ্রুত রূপ নেয় নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দমন, বিভাজন
ও নির্মূলের প্রচেষ্টায়। বিশেষভাবে টার্গেট করা হয় দুই প্রধান নেত্রীকে, যার মধ্যে
বেগম খালেদা জিয়ার ওপর নেমে আসে সবচেয়ে কঠোর ও দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়ন।
বহু মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, রাজনৈতিক কার্যক্রম
থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয় এবং দলীয় নেতৃত্বকে ভেঙে দেওয়ার সুপরিকল্পিত চেষ্টা
চালানো হয়। ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে রাজনীতি থেকে তাকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার
যে প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল সরাসরি জনগণের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক পছন্দের ওপর
আঘাত।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেও, দুর্ভাগ্যজনকভাবে
এই নিপীড়নের অবসান ঘটেনি; বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী রূপ লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক
আমলে শুরু হওয়া মামলাগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বেগম খালেদা জিয়াকে
একের পর এক মামলায় দণ্ডিত করা হয়, দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখা হয় এবং শেষ পর্যন্ত গুরুতর
অসুস্থ অবস্থাতেও তাকে ন্যূনতম মানবিক চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
এটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ওপর নিপীড়নের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের
ওপর ধারাবাহিক আঘাতের প্রতিচ্ছবি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে
বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে
দেয় এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
ইতিহাসের বিচারে আজ স্পষ্টÑ ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অস্বাভাবিক আবির্ভাব
ও ২০০৯ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা একসঙ্গে মিলেই বাংলাদেশকে একটি নির্বাচনহীন,
প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনীতির পথে ঠেলে দেয়। সেই পথচলার সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়ান বেগম
খালেদা জিয়া, যিনি দীর্ঘ নিপীড়নের মধ্যেও আপসহীন থেকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে
অনড় থেকেছেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে শুরু করে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত
প্রায় ১৭ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও মানবিক
অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি দেশে অবস্থান করছেনÑ বিদেশে
না গিয়ে, জনগণের পাশে থেকেছেন। এই অবস্থানই তাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তার
এই দৃঢ় অবস্থান শুধু রাজনৈতিক প্রতিরোধ নয়, বরং নৈতিক শক্তির প্রকাশ। অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে
আপস করেছেন, কিন্তু খালেদা জিয়া কখনও নত হননি। তার এই নীরব কিন্তু অবিচল সংগ্রাম তরুণ
প্রজন্মের কাছে এক অনন্য শিক্ষা।
রাজনীতি মানে শুধুমাত্র ক্ষমতার খেলা নয়, এটি আদর্শ ও ত্যাগের বিষয়। তার জীবনের
এই অধ্যায় প্রমাণ করেÑ একজন সত্যিকারের নেতার শক্তি বন্দুক বা ক্ষমতায় নয়, বরং আদর্শে,
ন্যায়বোধে ও জনগণের আস্থায় নিহিত। তিনি প্রমাণ করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধও
একদিন ইতিহাসের ভাষা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ রাজনীতির নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে।
যেখানে ন্যায়, নীতি ও সাহস অনুপস্থিত, সেখানে খালেদা জিয়ার এই আপসহীনতা নতুন রাজনৈতিক
দর্শনের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনীতি মানে আপস নয়Ñ এটি নীতিতে অবিচল
থাকার সাহস। যে তরুণ প্রজন্ম একসময় রাজনীতি থেকে বিমুখ ছিল, তারা আজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের
প্রত্যয়ে সচেতন হয়ে উঠছে। এই চেতনার পেছনে বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ ও অবিচলতার প্রভাব
গভীরভাবে কাজ করছে। আজকের বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন দলীয় নেত্রী ননÑ তিনি
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক, দেশের একজন সত্যিকারের অভিভাবক। ইতিহাস একদিন নিশ্চয়ই
বিচার করবেÑ গণতন্ত্রের রক্তাক্ত পথের সেই যাত্রী হিসেবে, যিনি নিপীড়নেও নত হননি; যিনি
নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি এখনও নীতি ও ত্যাগের শিল্প হতে পারে। রাজনীতি
কখনও নিখুঁত হয় না, কিন্তু কিছু মানুষ রাজনীতিকে ইতিহাসে উত্তীর্ণ করে তোলেন। বেগম
খালেদা জিয়া এমনই একজনÑ যিনি গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন, শাসক থেকে নিপীড়িত হয়েছেন,
তবু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আত্মার প্রতীক হিসেবে।
২০০৭ সালের পর থেকে তার ওপর যে ধারাবাহিক রাজনৈতিক নিপীড়ন নেমে আসে, তা আধুনিক
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরল। মিথ্যা ও বিতর্কিত মামলায় কারাবন্দি, দলীয় কার্যক্রম থেকে
বিচ্ছিন্নকরণ, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখাÑ সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি সচেতন রাজনৈতিক নির্মূলের
প্রচেষ্টা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি কখনও প্রতিহিংসার
ভাষায় কথা বলেননি, সহিংসতার পথে দলকে ঠেলে দেননি। এখানেই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক
ত্যাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি স্পষ্ট হয়। তিনি বারবার বলেছেনÑ সংঘাত নয়, সমাধান;
প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার; ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তার রাজনীতির মূল কথা। ব্যক্তিগত
কষ্ট ও অবমাননার জবাব তিনি দিয়েছেন নীরব সহনশীলতা ও সাংবিধানিক সংগ্রামের মাধ্যমে।
এই অবস্থান একটি গভীর রাজনৈতিক পরিণতির পরিচায়ক, যা শান্তির দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
নয়, বরং সম্পূরক।
আজকের বিভক্ত ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায়, তার জীবনের এই অধ্যায় আমাদের শেখায়Ñ শান্তি কখনও দুর্বলতার নাম নয়; বরং তা অসীম আত্মসংযম ও দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ। সেই মানদণ্ডে তিনিই আমাদের নোবেল লরিয়েট। বেগম জিয়া শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নেইÑ এটা সত্য, তবে আদর্শ ও প্রেরণা আমাদের মাঝে চিরজাগ্রত থাকবে। আমরা মনে করি, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে, বাংলাদেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে বেগম জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তার জীবন ও কর্ম থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। কারণ তিনি বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা। তিনি আমাদের পথের দিশারি।
মো. ইলিয়াস হোসেন
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং কলাম লেখক