বেগম খালেদা জিয়া
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৫২ এএম
গণতন্ত্রের আপসহীন সৈনিক মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অযুত কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন অনন্তের পথে। তার প্রয়াণ শুধু একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয় বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি বলে আমি মনে করি। যেখানে রচিত হয়েছে সংগ্রাম, ত্যাগ, নেতৃত্ব ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দৃঢ়তার এক অনন্য ইতিহাস। তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার।
বেগম খালেদা জিয়া
ছিলেন গণতন্ত্রের এক সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের আশ্রয় আর জাতীয়
রাজনীতিতে ঐক্যের প্রতীক। ব্যক্তিগত জীবনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন
এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে, যার প্রভাব চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের
রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার
রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি ছিলেন একজন গৃহবধূÑ
রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি ও
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপি পড়ে যায় নেতৃত্ব সংকটে।
সেই সংকটময় সময়ে, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বিএনপিতে
যোগ দেন। অল্পসময়ের মধ্যেই তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
এবং শেষে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনীতিতে আসার
দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
মুসলিমপ্রধান, পুরুষশাসিত সমাজে একজন গৃহবধূর এভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছা ছিল
যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসেই এটি একটি বিরলতম ঘটনা।
সত্যিকার অর্থে তিনি এমন একসময়ে স্বকীয় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন, যখন পুরুষশাসিত
সমাজের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।
খালেদা জিয়ার
রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল তার আপসহীনতা। ১৯৮৩ সালে তিনি স্বৈরশাসক
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। তার নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭-দলীয় ঐক্যজোট,
যা পরবর্তীকালে ’৯০-এর গণ-আন্দোলনের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে
তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’Ñ যে পরিচয় আজও তার নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
রাজনৈতিক গবেষকদের
মতে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়।
রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার, হুমকিÑ সবকিছুর মধ্যেও তিনি ছিলেন অটল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের
পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি অভাবনীয় জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। বেগম খালেদা
জিয়া হন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ সরকারের
অধীনে নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যা তার রাজনৈতিক জীবনের এক অনন্য কৃতিত্ব।
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক
ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অপরাজেয় নেত্রী। গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিটি নির্বাচনী
লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যে কটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সরাসরি অংশ
নিয়েছেন, প্রতিবারই তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি কখনও পরাজয় বরণ করেননি।
আপসহীন আন্দোলনের
নেত্রী হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় খালেদা জিয়া ছিলেন বাস্তববাদী ও পরিস্থিতিবোদ্ধা।
তিনি সংলাপ ও সমঝোতার রাজনীতিকে কখনও পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। নির্বাচনকালীন নির্দলীয়
ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার অবস্থান
তারই প্রমাণ। শুরুতে বিএনপি একমত না হলেও জনদাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি সেই ব্যবস্থাকে
সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক
জীবনে তিনি ৭-দলীয়, ৪-দলীয় এবং পরবর্তীকালে ২০-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন। রাজনৈতিক
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে জোটভিত্তিক রাজনীতির সফল প্রয়োগে খালেদা জিয়ার ভূমিকা
ছিল কেন্দ্রীয়। ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা তাকে একটি বৃহত্তর
জাতীয় নেত্রীতে পরিণত করেছিল।
২০০৭ সালের এক-এগারোর
পর খালেদা জিয়া ও তার পরিবারে নেমে আসে চরম সংকট। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
সময় তিনি ও তার দুই পুত্র গ্রেপ্তার হন। দল ভাঙার চেষ্টা, তাকে বিদেশে পাঠানোর ষড়যন্ত্রÑ
সবকিছু সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তার সেই উচ্চারণÑ ‘এই দেশ, এই দেশের
মাটি-মানুষই আমার সবকিছু’Ñ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃঢ়তার উদাহরণ হয়ে
আছে।
পরবর্তী সময়ে
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৪১ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ,
অবরুদ্ধ জীবন, কারাবাস, সন্তান হারানোর বেদনাÑ সব মিলিয়ে তার জীবন ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডির
গল্প। তবু তিনি কখনও ভেঙে পড়েননি। বরং বারবার বলেছিলেন, দেশবাসীই তার প্রকৃত স্বজন।
দীর্ঘ আন্দোলন,
ক্ষমতা, নিপীড়ন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া শেষ জীবনে এসে দলমতনির্বিশেষে সকলের
শ্রদ্ধায় সিক্ত হন এবং জাতীয় নেত্রীতে পরিণত হন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের
পর মুক্তি পেয়ে তিনি তরুণদের উদ্দেশে যে বার্তা দেনÑ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা
নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি’Ñ তা তাকে নতুনভাবে ‘ঐক্যের প্রতীক’
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রকৃতপক্ষে বেগম
খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, দীর্ঘ সময়ের নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে
পরিণত করেছেন।
আজ বেগম খালেদা জিয়া দৈহিকভাবে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী হিসেবে। গণতন্ত্র, আপসহীনতা, ত্যাগ ও নেতৃত্বের যে মানদণ্ড তিনি স্থাপন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক অনিবার্য পাঠ হয়ে থাকবে। তার জীবন প্রমাণ করে ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ ও দৃঢ়তা অমর-অক্ষয়। বস্তুতপক্ষে একজন খালেদা জিয়ার কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অনন্য আদর্শের প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কোটি মানুষের হৃদয়জুড়ে।
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক