কাজী লতিফুর রেজা
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:৪৪ এএম
আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শুধু এক রাজনীতিবিদকে নয়, হারানো হয়েছে দেশের নারী নেতৃত্বের এক অদম্য প্রতীক। রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেও তার জীবন ও কর্ম স্মরণীয়। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার যাত্রা ছিল চ্যালেঞ্জিং, অনুপ্রেরণামূলক এবং প্রভাবশালী।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কখনও সহজ ছিল না। ওয়ান-ইলেভেনের
সময় তাকে দেশ ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হলেও তিনি অনড় ছিলেন। ফ্যাসিবাদী সরকারের ক্রান্তিকালে
কারাবন্দি জীবন থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দেশের মানুষের পাশে ছিলেন। সেই দৃঢ়তার
জন্যই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।
তবে খালেদা জিয়ার পরিচয় কেবল রাজনীতির সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়।
একজন মা, একজন নেতা এবং বিশেষত নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে তার অবদান অমোচনীয়।
১৯৮১ সালের মে মাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর
রহমান নিহত হলে খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। রাজনীতির সঙ্গে তার পরিচয়
সীমিত, দলীয় কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল কম। বিএনপি তখন বিপর্যস্ত, দিশাহারা এবং
ছত্রভঙ্গ। সেই সময় সিনিয়র নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন, সেই থেকেই খালেদা জিয়া বিএনপির অবিচ্ছেদ্য অংশ
হয়ে ওঠেন। মি. আহমদ বলেন, ‘সেভাবে এটি রাজনৈতিক দল ছিল না, যেভাবে দল গড়ে ওঠে। বিএনপির
রাজনৈতিক শক্তি মূলত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত
হয়। আজকের বিএনপিকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্রেডিট খালেদা জিয়ার।’
খালেদা জিয়ার শাসনকাল, ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬, দুইভাগে বিশ্লেষিত
হয়। আমেরিকার পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের শিক্ষক ড. সাঈদ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘প্রথম
শাসনকালে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেনি এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের রক্ষণশীল প্রেক্ষাপটে নারীর ক্ষমতায়নের পথে তিনি নতুন
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’
খালেদা জিয়ার অগ্রগামী নীতি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
সম্প্রতি তারেক রহমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা একটি গল্পে জানা যায়,
লন্ডনে চিকিৎসাধীন তার নাইজেরিয়ান নার্স জানিয়েছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আপনার কাজ
জানি। আপনার দেশের অবৈতনিক নারী শিক্ষার নীতি আমাদের দেশের জন্য অনুপ্রেরণা হয়েছে।’
এ ঘটনায় দেখা যায়, খালেদা জিয়ার কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শিক্ষার প্রসার এবং নারীর
ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে খালেদা জিয়া
মেয়েদের শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন। তার শাসনকালে বাংলাদেশে নারীশিক্ষার উন্নয়ন দৃশ্যমান
ও অব্যাহত ছিল। এটি কেবল শিক্ষার প্রসার নয়, সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীকও বটে। মহাদেশীয়
সংবাদমাধ্যম ‘টাইম ম্যাগাজিন’ তখনই উল্লেখ করেছিল, অবহেলিত ও উপেক্ষিত নারীদের জন্য
বেনজীর ভুট্টো বা ইন্দিরা গান্ধীর মতো কাজ করা হলেও স্থানীয় স্তরে খালেদা জিয়ার অবদান
আরও বেশি প্রভাব ফেলেছে।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল অবিচল
দৃষ্টিভঙ্গি। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার ক্যারিশমা, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা এবং দেশের
প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে স্বতন্ত্র করেছে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, সেই সময়েও তার সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় দৃঢ়তা ও নীতি স্পষ্টভাবে
ধরা পড়েছিল।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে শুধু পদ বা ক্ষমতার দিক দিয়ে
দেখা যায় না। তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে
যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তার নীতি ও উদ্যোগ, বিশেষ করে নারীশিক্ষায়, দীর্ঘমেয়াদে
বাংলাদেশের সমাজচিত্রকে পাল্টে দিয়েছে। আজকের বাংলাদেশি নারীর অগ্রযাত্রার পথেই তার
অনুপ্রেরণার ছাপ স্পষ্ট।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর
নেতৃত্ব কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব বিস্তার করতে
পারে। একজন গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম
নারী প্রধানমন্ত্রীÑ এই যাত্রাই তার সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণার নিদর্শন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ইতিহাসে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার নীতি, দৃঢ়তা এবং সাহসিকতা আগামী প্রজন্মের জন্যও
প্রেরণা হয়ে থাকবে।
আজ শোকার্ত হৃদয়ে- শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং মানবিক গুণ, নারী উন্নয়নের প্রতি অবদান এবং দেশের প্রতি তার অটল দায়বদ্ধতাকেই স্মরণ করা উচিত। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শেখায়Ñ সৎ নেতৃত্ব, দৃঢ় বিশ্বাস এবং নারীর ক্ষমতায়ন সমাজে পিছিয়ে থাকে না।
কাজী লতিফুর রেজা
কলাম লেখক ও আইনজীবী