× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

নিরাপত্তা ও মিডিয়ার ভূমিকা

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:১৮ পিএম

নিরাপত্তা ও মিডিয়ার ভূমিকা

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে তারেক রহমানের নিরাপত্তার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে। ১৭ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়Ñ এটি আবেগ, প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার এক অভূতপূর্ব সম্মেলন। এমন প্রেক্ষাপটে যে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে তা হলোÑ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা, দায়িত্ববোধ এবং গণমাধ্যমের পেশাদারত্বের প্রশ্ন।

বাস্তবতা হলোÑ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই তারেক রহমান যে দেশে ফিরতে পারেননি এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই বাস্তবতা অতিক্রম করেই তার প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পর যে দৃশ্যমান বাস্তবতা সামনে এসেছে এটা খুবই উদ্বেগজনক। 

জাতীয় ও জনগুরুত্ব সম্পন্ন কর্মসূচির বাইরে তার ব্যক্তিগত কর্মসূচিতে মানুষের ভিড়, অনিয়ন্ত্রিত উৎসাহ, অতিরিক্ত মিডিয়া কভারেজ নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সাধারণত জনসমাগম যত বাড়ে, ঝুঁকির ক্ষেত্র তত প্রসারিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে নেতাকর্মীর অবয়বে তারেক রহমানের ক্ষতিসাধনের চেষ্টার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার নজিরগুলো আমাদের সতর্ক করে দেয় যে ‘বন্ধু বেশধারী’ শত্রুই অধিকতর ভয়ংকর।

১২ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে ‘মাহেন্দ্রক্ষণ’ তা নস্যাৎ করতে দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের তৎপরতা দৃশ্যমান। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের নিরাপত্তা প্রশ্নটি কেবল দলীয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। সুতরাং তারেক রহমান যেকোনোভাবে আক্রান্ত হওয়া মানে বড় ধরনের জাতীয় সংকটের সূত্রপাত। এর ফলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বহু গুণে বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই উদ্বেগের পটভূমিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে সাভারের পথে একাধিকবার তারেক রহমানের গাড়ি আটকে যাওয়ার ঘটনা তার নিরাপত্তা শিথিলতার ইঙ্গিত দেয়। একজন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে যে মানের প্রোটোকল প্রয়োজন, বর্তমান ব্যবস্থায় তার যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। এ কারণেই তারেক রহমানের নিরাপত্তায় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী বা এসএসএফ নিয়োগ দেওয়া সরকারের কর্তব্য।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষ করে রয়টার্স, বিবিসি ও আলজাজিরার মতো শীর্ষ সংবাদ সংস্থা ইতোমধ্যে তারেক রহমানকে আগামীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চিত্রিত করেছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বাস্তবতায় তার নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এ কথাও সত্য যে, নিরাপত্তা কেবল বাহিনী বা প্রোটোকলের বিষয় নয়। এটি সার্বিক আচরণ, শৃঙ্খলা ও সচেতনতার সমষ্টিগত বিষয়। দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানববর্ম তৈরি করে নিরাপত্তা দেওয়ার আবেগী চেষ্টার চেয়ে দূরত্ব বজায় রাখা, নির্ধারিত প্রোটোকল মানা এবং নির্দেশনা অনুসরণ করাই হবে প্রিয় নেতার প্রতি যথার্থ সম্মান। 

তারেক রহমান ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সাধারণ ও সহজভাবে চলাফেরায় অভ্যস্ত হলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে গণমাধ্যমের আগ্রহ স্বাভাবিক। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ৩০ কোটিরও বেশি কনটেন্ট ভিউ হয়েছে, যা তারেক রহমানের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও তুমুল জনপ্রিয়তারই প্রতিফলন। তবে এজন্য আগ্রহ আর অতিরঞ্জনের সীমারেখা অতিক্রম করা পেশাদারত্বের পরিপন্থী। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছাড়া তার ব্যক্তিগত কর্মসূচি যেভাবে টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে, তা একদিকে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে অন্যদিকে তার রাজনৈতিক ইমেজের জন্যও নেতিবাচক হতে পারে। কারণ গণমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক কভারেজের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আছে। একটি সুপারহিট গান যেমন অতিরিক্ত বাজালে শ্রোতার কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। তেমনি সীমা ছাড়ানো প্রচার জনমনে ক্লান্তি তৈরি করে। ‘বেশি ভালো ভালো নয়’ এই প্রবাদটি মিডিয়া কভারেজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পেশাদার সাংবাদিকতা মানে তথ্যের প্রয়োজনীয়তা, প্রাসঙ্গিকতা ও জনস্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা। তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উপস্থিতি, যাতায়াত বা পারিবারিক মুহূর্তগুলোর সংবাদমূল্য সীমিত। সুতরাং এগুলো দলীয় মিডিয়া সেল থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানোই হবে যথাযথ।

এখানে আরও একটি বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি যে, যেসব মিডিয়া আজ তারেক রহমানকে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করছে তাদের অনেকেই অতীতে জিয়া পরিবার ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ ও অপপ্রচারে যুক্ত ছিল। এই ইতিহাস ভুলে যাওয়া রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে নীতিগত, পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিক। ব্যক্তিনির্ভর আবেগে ভর করা নয়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এসবের জাতীয় ও ঐতিহাসিক মূল্য আছে। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ের কর্মসূচি নিয়ে অতিরিক্ত লাইভ, রিয়েল-টাইম আপডেট বা লোকেশনভিত্তিক কভারেজ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলেন, তথ্যের অতিপ্রাচুর্যই ঝুঁকির জানালা খুলে দেয়। তাই টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়াকে আত্মসংযমী হতে হবে। শুধু বাণিজ্যিক চিন্তা না করে দর্শক-শ্রোতার কাছে নিজ প্রতিষ্ঠান ও পেশার মান রক্ষা করাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তারেক রহমান ও বিএনপি কার্যত শত্রুঘেরা। কারণ পতিত স্বৈরাচারের দোসর ও তাদের মদদপুষ্ট দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতা দৃশ্যমান। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের উস্কানি কিংবা ভক্ত-অনুরাগীর ছদ্মবেশে নাশকতার বহু উদাহরণ আছে বিশ্ব রাজনীতিতে। এ সবকিছু মাথায় রেখেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজাতে হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যে জুলাই যোদ্ধা হাদির হত্যাকাণ্ড আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বর্তমান সময়টা কতখানি ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।

অতএব যেকোনো বিপদ এড়িয়ে চলার একমাত্র উপায় নিরাপত্তার সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে এসএসএফসহ সর্বোচ্চ মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিএনপিকেও দলীয় শৃঙ্খলা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। গণমাধ্যমকে পেশাদারত্ব বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর সমর্থকদের আবেগকে শৃঙ্খলায় রূপ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে উত্তরণের পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তারেক রহমানের নিরাপত্তা মানে ব্যক্তির নিরাপত্তা নয়। বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে রাষ্ট্র, দল ও মিডিয়ার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা এখন সময়ের দাবি। 



আহসান হাবিব বরুন

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা