মারুফ কামাল খান
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:০৯ এএম
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:০৯ এএম
মারুফ কামাল খান
বাংলাদেশের নেতৃত্বে, এদেশের রাজনীতিতে এবং জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে জেনারেশন চেঞ্জ বা প্রজন্ম পরিবর্তনের পালা শুরু হয়েছে বলে আমার ধারণা।
আমার মনে আছে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর তারেক রহমান বিভাগীয় সন্মিলনের আয়োজন করেছিলেন। সব বিভাগের নেতাকর্মীরা ঢাকা এসে সেই সমাবেশে যোগ দেন। তখনকার ‘গণভবন’ চত্বরে বিশাল শামিয়ানা খাটিয়ে ধারাবাহিকভাবে সেই সন্মিলন হয়েছিল। খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও ছিল। সব মিলিয়ে সে এক এলাহি কারবার। সারা দেশে সাড়া পড়ে গিয়েছিল।
কয়েক দিনব্যাপী ওই অনুষ্ঠানমালায় প্রতিটি মুহূর্ত সশরীরে উপস্থিত থেকে আমাকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছিল তারেক রহমানের ইচ্ছায়। শেষে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম ‘তিন প্রজন্মের বিএনপি’ শিরোনামে। অনেকগুলো জাতীয় দৈনিকে লেখাটি একযোগে প্রকাশিত হয়েছিল। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার পর ওই অনুষ্ঠানমালার সফল আয়োজনের মধ্য দিয়ে দলের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে তারেক রহমানের অভিষেক হয়েছিল। তিনি নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছিলেন বিএনপির ‘লিডার ইন ওয়েটিং’ বা অপেক্ষমাণ বা পরবর্তী শীর্ষ নেতা হিসেবে। রাজতান্ত্রিক যুগে যেমন করে ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজের অভিষেক হতো। এই থিমটিই আমি তুলে ধরেছিলাম আমার লেখাটিতে। লিখেছিলাম জাতীয়তাবাদীরা চায় তিনি দলের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হবেন জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শের ও রক্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে।
তারেক রহমান এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বন্দি অবস্থায় নির্যাতিত হওয়ার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনেই তাকে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। বিলেতে থাকতেই দল তাকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে। বেগম জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর থেকে তিনি দলের অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পরিবর্তিত অনুকূল পরিস্থিতিতে নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরে বিপুল উচ্ছ্বসিত গণঅভ্যর্থনা পেয়ে ইতিহাস গড়েছেন। এরপর তিন দিনের অনিবার্য আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শেষে গতকাল রবিবার প্রথমবারের মতো গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিসে বসে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। এ ঘটনায় আমি কিছুটা আলোড়িত এবং গৌরব বোধ করছি। আবার কিছুটা স্মৃতিকাতরতাও অনুভব করছি। এই অফিসের সঙ্গে আমার অনেক অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখানে খরচ করেছি জীবনের অনেক মূল্যবান সময়। এখানেই টানা তিন মাস ম্যাডাম জিয়া ও আরও অনেকের সঙ্গে গৃহবন্দি অবস্থায় থেকে আমি ফ্যাসিবাদী রেজিমের অসংখ্য মিথ্যা মামলার আসামি হই। ওই অবস্থাতেই আমি সুস্থতা-স্বাভাবিকতা হারিয়ে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হই এবং আমার ফেরারি জীবনপর্ব শুরু হয়। তারপর বাঁচার তাগিদে চিকিৎসার জন্য পালিয়ে দেশান্তরী হতে হয় আমাকে।
আমি রাজনীতিবিদ নই। জীবিকা অর্জনের জন্য লেখালেখি ও সাংবাদিকতা ছাড়া আর তেমন কোনো কৃৎকৌশল আমার জানা নেই। জীবনের একটা সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তৃতা-বিবৃতির মুসাবিদা ও মিডিয়া কাভারেজ দেখভাল করার দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হয়েছে। সীমিত সাধ্য ও যোগ্যতায় এই কাজটুকু করে আমি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে দেশ-জাতির প্রতি কর্তব্য পালন করেছি বলেই বিশ্বাস করি। আমার সেই দায়িত্ব পালন পর্ব সমাপ্ত হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী শাসক মহলের অপতৎপরতায় ম্যাডাম জিয়া তার বন্দিত্বকালে যে গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হয়েছেন তা এখন তাকে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে দিয়েছে। হাসপাতালে চলমান চিকিৎসায় আল্লাহ্র অপার অনুগ্রহে যদি তার প্রাণ রক্ষাও পায় তবুও দল-রাজনীতির নেতৃত্ব দেওয়া ও রাষ্ট্রপরিচালনার সামর্থ্য যে তিনি আর ফিরে পাবেন না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। হয়তো অতি প্রয়োজনে ক্রান্তিকালে বা সংকটে তারেক রহমান তার অভিজ্ঞ মায়ের কাছ থেকে বড়জোর কিছু পরামর্শ, উপদেশ ও নির্দেশনা পেতে পারেন। এর বেশি কিছু নয়। অতএব তারেক রহমানই এখন জাতীয়তাবাদী দলের শীর্ষ নেতা এবং গতকাল চেয়ারপারসনের অফিসে তার দায়িত্ব পালন শুরুর মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বের জেনারেশন চেঞ্জ বা প্রজন্মান্তর ঘটে গেছে। কেবল বিএনপিতে নয়, সার্বিক রাজনীতিতে এবং জাতি ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে এক মস্ত শূন্যতা। জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ প্রবলভাবে এই মর্মে আশাবাদী যে, সেই সব শূন্যতা তারেক রহমানের পক্ষেই সম্ভব পূরণ করা। আগামী সাধারণ নির্বাচনে জনগণের রায় বা সম্মতি পেলে তারেক রহমানকে ক্রান্তিকালের রাষ্ট্রনেতার দায়িত্বও পালন করতে হবে। আমি মনে করি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন শুরুর প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতায় গতকাল উদয়াচল থেকে সে যাত্রার সূচনা করেছেন তারেক রহমান। দেশ-জাতির কল্যাণে তার সার্বিক সাফল্য কামনা করে অস্তাচল থেকে রইল আমার অফুরন্ত শুভাশিস।
এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমার ব্যক্তিগত গৌরববোধের অন্যতম কারণ, বিএনপি চেয়ারপারসনের এই কার্যালয়টি শুরু হয়েছিল আমার মতন একজন সামান্য মানুষের হাত ধরেই। তথাকথিত এক-এগারো জমানায় কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর ম্যাডাম জিয়া বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় বা অফিসের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তখনও সময় খুব একটা অনুকূল নয়। দলের দায়িত্বশীল নেতারা বললেন, এখন একটা অফিস জোগাড় করা কঠিন হবে। পল্টনে দলের সদর দপ্তরে ম্যাডামের জন্য আলাদা কক্ষ আছে। তিনি তো সেখানেই বসতে পারেন।
ম্যাডাম খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ভিড়ভাট্টার মধ্যে উঠে তার নির্ধারিত কক্ষে নিয়মিত বসে কাজ করার মতন উপযুক্ত পরিবেশ আছে বলে মনে করতেন না। তিনি রোজ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে বসার প্রস্তাবে বিরক্ত বোধ করতেন। এ পরিস্থিতিতে আমি শফিক রেহমানের শরণাপন্ন হলাম। ইস্কাটন গার্ডেনে তার বাড়ির সামনের অংশটা একটা পৃথক বাড়ির মতো। সেটা খালি ছিল। আমি সাময়িকভাবে সেখানে ম্যাডামের অফিস করার কথা বললাম শফিক ভাইকে। তিনি তার স্ত্রী তালেয়া আপার সঙ্গে কথা বলতে বললেন। বললেন, ‘তালেয়া রাজি থাকলে আমার আপত্তি নেই।’ তালেয়া আপা রাজি হলেন। ম্যাডাম অস্থায়ীভাবে সেখানে অফিস শুরু করলেন। আমি একটু সময় পেলাম এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ারপারসনের অফিস খুঁজতে লেগে গেলাম।
ময়মনসিংহের শামসুদ্দিন সাহেব এমপি ছিলেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জিতে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। গুলশানে তার বাড়ি একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির কাছে ভাড়া ছিল। তারা নিজস্ব ক্যাম্পাসে চলে যাওয়ায় বাড়িটি খালি ছিল। শামসুদ্দিন সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি জানালেন যে, আমার কথায় হবে না। ম্যাডাম নিজে চাইলে দিতে পারেন। ম্যাডামকে অনুরোধ করলাম তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে। তিনি বাড়িটির অবস্থান ও বিবরণ জানতে চাইলেন। আমি সব বলার পর ম্যাডাম বললেন, এত বড় বাড়ি আমরা ম্যানেজ করতে পারব না। ওটা বাদ দিন।
জাকারিয়া তাহের সুমনও এমপি ছিলেন বিএনপির। তার এক বন্ধু শরিফ শাহ্ কামাল তাজও বিএনপির লোক ছিলেন। আমাদের ঘনিষ্ঠ মোস্তাকুর রহমান ও তাজ আমাকে জানালেন, গুলশানে সুমনদের একটা বাসার ভাড়াটে ইরানি রাষ্ট্রদূত চলে গেছেন। সেটা খালি আছে। সুমনের বাবা তাহের সাহেবও বিএনপির এমপি ছিলেন। সুমনের সঙ্গে কথা বললাম। তার কাছে জানলাম পৈত্রিক বাসাটি ভাগে পড়েছে তার ছোট ভাইয়ের। সুমন তার সঙ্গে কথা বলে সম্মতি জানাল। ম্যাডামের সম্মতি নিয়ে বাড়িটি আমি বুঝে নিলাম। কারা সেখানে কোন দায়িত্ব পালন করবেন আলোচনা করে সেটাও ঠিক করলেন ম্যাডাম। রিয়াজ রহমান, মাহমুদুর রহমান, শফিক রেহমান, সাবিহউদ্দিন, সাবেক আইজিপি কাইউম সাহেব, জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর এবং আমাকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিলেন ম্যাডাম। ঠিক হলো ম্যাডামের বিশেষ সহকারী হিসেবে শিমুল বিশ্বাস ও ডিউও বসবেন। নিরাপত্তার জন্য একটা টিম ঠিক করা হলো। পরে শমসের মবিন চৌধুরী এসে তিনিও কাজ করতে চান বলে ম্যাডামকে রাজি করালেন। তবে আমরা চাইলেও ফরহাদ মজহার এ টিমে কাজ করতে রাজি হলেন না। বললেন, তিনি বাইরে থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে পরামর্শ দেবেন। আরও পরে পররাষ্ট্র ও আইটি সংক্রান্ত দুটি টিম গঠন করা হয়।
প্রথমে অফিসের খরচ এককভাবে মাহমুদুর রহমান বহন করতেন। তিনি জেলে যাওয়ার পর কয়েকজন বিত্তশালী নেতা ব্যয়ভার ভাগাভাগি করে নেন। বাড়িটির মালিক একেবারে তরুণ বয়সেই কিছুদিন আগে মারা গেছেন। তার জন্য বিপুল বেদনা অনুভব করি আমি। ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেক রকম চাপ তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে বাড়িটি ম্যাডাম জিয়াকে দেওয়ার জন্য।
এই অফিস ঘিরে আছে আরও অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি। আজ আর তা না বলি। আমি আগের প্রজন্মের নেতৃত্বের জন্য যে অফিসটি সাজিয়েছিলাম সেটারও প্রজন্মান্তর ঘটেছে গতকাল। কোনো কিছু এবং কেউই কোথাও চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সাথে সব এগিয়ে যায়। রাজনীতি ও নেতৃত্বও তা থেকে আলাদা কিছু নয়। তারেক রহমান কঠিন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ মানুষ। তিনি সময় ও কঠিন বাস্তবতা থেকে শিখেছেন অনেক কিছু। জহুরির মতো মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা খুঁজে গ্যালাক্সি অব স্টার রচনা করা শহীদ পিতার সন্তান তিনি। তাই তিনিও উপযুক্তদের বেছে নিয়েই তার টিম গড়েছেন। আমার আন্তরিক প্রত্যাশাÑ বাংলাদেশকে মধ্যপন্থায় স্থাপনের মাধ্যমে মর্যাদাবান, শক্তিশালী, নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, ঐক্যবদ্ধ, সমৃদ্ধ, সুখী ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়তে টিম তারেক সফল হবে। এই লক্ষ্যে রাজনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন তারেক রহমানই আনতে পারবেনÑ এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।