মাধ্যমিকের পাঠ্যবই
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২৫ পিএম
নতুন শিক্ষাবর্ষ মানেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই, শিক্ষকদের সামনে নতুন পরিকল্পনা আর অভিভাবকদের মনে নতুন প্রত্যাশা। কিন্তু এবার মাধ্যমিক স্তরে সেই চিত্র হোঁচট খেল। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা এবার সব নতুন বই পাচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাত্র তিন দিন। ১ জানুয়ারি দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার কথা।
বছরের শুরুতে
সকল পাঠ্যবই না পাওয়ার বিষয়টি দেশের শিক্ষা খাতে সংকট বৈকি। বিশেষত মাধ্যমিক স্তরে।
বারবারই কারণ হিসেবে বলা হয়, দরপত্র প্রক্রিয়া ও মুদ্রণে দেরি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
এবং মুদ্রণ-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে সময়মতো বই ছাপা ও বিতরণ করা যায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। এতে শিক্ষার স্বাভাবিক
গতি ব্যাহত হচ্ছে। জানা গেছে, এখনও পাঠ্যপুস্তকের ২৫ শতাংশের মতো ছাপা বাকি। হাতে থাকা এই
সীমিত সময়ে এত বিপুলসংখ্যক বই ছাপা, বাঁধাই, কাটিং করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো
অসম্ভব।
২৭ ডিসেম্বর
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ বই পাচ্ছে না’ শীর্ষক
প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ বা ছাপা ও বিতরণের
দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির তথ্যমতে, মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীই নতুন
বই পাবে। তবে সব বিষয়ের বই পাবে না। অথচ সরকারের রূপরেখা অনুসারে ৩০ নভেম্বরের
মধ্যে এসব বই ছাপা শেষ করে তা দেশের সব জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসে পৌঁছানোর
পরিকল্পনা ছিল। এবার এক দফা টেন্ডার বাতিলসহ নানা জটিলতায় গত বছরের মতো এবারও
ভেস্তে গেছে পরিকল্পনা, যার মাশুল গুনতে হবে শিক্ষার্থীদের। গত বছরের মতো এবারও
শতভাগ নতুন বই ছাড়াই শুরু হচ্ছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা
কার্যক্রম।
এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন শিক্ষকরা। তাদের সামনে
একদিকে প্রশাসনিক নির্দেশনা, অন্যদিকে পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ
ও সহায়ক উপকরণ ছাড়া নতুন পদ্ধতিতে পাঠদান করতে বলা মানে শিক্ষকদের ওপর অযৌক্তিক
চাপ সৃষ্টি করা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতায়। শিক্ষার্থীদের
দিক থেকেও বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। মাধ্যমিক স্তর তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক
বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পাঠ্যবইয়ের অস্পষ্টতা ও পাঠ্যসূচির অনিশ্চয়তা
শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও আগ্রহহীনতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের
বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল বিকল্প বা সহায়ক নোটের সুযোগ সীমিত। ফলে বৈষম্য আরও বাড়ার
আশঙ্কা রয়েছে।
উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। তারা জানতে চান পরীক্ষা কীভাবে
হবে, সিলেবাস কতটা পরিবর্তিত, ফলাফল মূল্যায়নের মানদণ্ডই বা কী? এসব প্রশ্নের
স্পষ্ট জবাব না থাকায় শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হচ্ছে। কারণ বই ছাড়া
পাঠদান, অস্পষ্ট নির্দেশনা আর অনিশ্চিত মূল্যায়ন সব মিলিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমকে
ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিশৃঙ্খলার দিকে। শিক্ষা নিয়ে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা কোনোভাবেই
গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন নিয়ে এই গাফিলতি ক্ষমার অযোগ্য এবং
এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতেই হবে।
বলা বাহুল্য, বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে
পাঠ্যবই তুলে দেওয়াটা যে সরকার ও এনসিটিবির দায়িত্ব। এটা এখন স্পষ্ট যে, সেই
বোঝাপড়ায় ঘাটতি থাকায় বারবার একই সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা মনে করি, মাধ্যমিক স্তরে
নতুন পাঠ্যবই সরবরাহ করতে না পারা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি স্পষ্টতই দায়িত্বহীনতা ও
সুনির্দিষ্ট অবহেলার ফল। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা ক্যালেন্ডার নির্ধারিত থাকলেও বই
প্রস্তুত ও বিতরণে ব্যর্থতা প্রমাণ করেÑ পরিকল্পনা ছিল কাগজে-কলমে, বাস্তবে নয়।
শিক্ষাবর্ষ শুরুর তারিখ জানা সত্ত্বেও সময়মতো বই ছাপা ও পৌঁছানোর ব্যবস্থা না করা
প্রশাসনিক অদক্ষতার সরাসরি স্বীকৃতি। বলতে দ্বিধা নেই, চলতি শিক্ষাবর্ষেও প্রাথমিক
ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছাতে প্রায় তিন মাস দেরি হয়েছিল।
এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের এই সংবাদটি সত্যি
দুঃখজনক।
নতুন শিক্ষাবর্ষ মানে নতুন আশার শুরু। কিন্তু সেই
আশার ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তবে শিক্ষা এগোয় না, হোঁচট খায়। তাই শিক্ষার্থীদের
হাতে দ্রুত পাঠ্যবই তুলে দিতে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। সংকট নিরসনে সরকার ও
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জোরালো অঙ্গীকার প্রয়োজন। মাধ্যমিকের বই ছাপানো নিয়ে যে
সংকট তৈরি হয়েছে, এনসিটিবিকে দ্রুত তা নিরসন করতে হবে। শুধু কার্যাদেশ দিয়ে বসে
থাকলেই চলবে না, সময়মতো বইগুলো ছাপা হচ্ছে কি না, নিয়মিত তদারকি করতে হবে। যেহেতু
পাঠ্যবই ছাপাতে দেরি হওয়ায় প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের ভুগতে হচ্ছে, তাদের শিক্ষাজীবন
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই যেকোনো মূল্যেই এই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
অবিলম্বে বই ছাপা ও বিতরণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ তদারকি সেল গঠন করে
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।