তারেক জিয়া
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৯ পিএম
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫, স্বদেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের একমাত্র কান্ডারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, তরুণ প্রজন্মের আইকন তারেক রহমান। যিনি গত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন পার করে স্বদেশে ফিরেছেন। এমন একটা সময়ে তিনি দেশে ফিরছেন, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি এক গভীর সংকটে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, দলীয় কাঠামো ও সামাজিক আস্থার-শেকড় পর্যন্ত যে সংকট ছড়িয়ে পড়েছে- তা কেবল ক্ষমতার পালাবদলে শেষ হবে না। বিগত সময়ে যে মূল্যবোধের অবক্ষয়, রাজনীতির নৈতিকতার পতন হয়েছে, খুঁজতে হবে তা থেকে উত্তরণের পথও।
রাজনীতি এখন আর
আদর্শের নয়, এটি হয়ে উঠেছে স্বার্থ, প্রভাব আর টিকে থাকার লড়াইয়ের আরেক নাম। অথচ রাজনীতি
হওয়ার কথা ছিল সেবা, ন্যায় আর প্রজ্ঞার মাধ্যমে সমাজ বদলের এক সৎ প্রয়াস। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, দুর্নীতি, মতপ্রকাশের
সংকোচন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ
করে তরুণ প্রজন্ম আজ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এই
প্রেক্ষাপটে শুদ্ধ,
আদর্শভিত্তিক ও গণমুখী রাজনীতির পুনর্জাগরণ এখন সময়ের
সবচেয়ে বড় দাবি। বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। কিন্তু
এই তরুণ সমাজের বড় অংশ রাজনীতিকে দেখছে অনিশ্চয়তা, অনৈতিকতা ও
সুযোগসন্ধানী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র হিসেবে। শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণরা রাজনীতিতে
যুক্ত হতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এই বাস্তবতায়
প্রশ্ন জাগে, কোথায় হারিয়ে গেল রাজনীতির মানবিক উদ্দেশ্য? আর কীভাবে ফিরে পাওয়া যাবে
সেই শুদ্ধ রাজনীতি, যার ভিত্তি হবে নৈতিকতা, জ্ঞান ও জনগণের কল্যাণ? বস্তুত বাংলাদেশের
আজকের রাজনীতি কেবল ক্ষমতার অর্থনীতি দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশের বিদ্যমান দলগুলোর
মতাদর্শ আজ পরিণত হয়েছে স্লোগানে, আর দলের কর্মীরা পরিণত হয়েছেন অনুসারীতে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে
আদর্শ, সততা ও জনস্বার্থই হবে মূল চালিকাশক্তি। একদলীয় মানসিকতা, দল নির্ভর
প্রশাসন ও বিরোধী দল দমনের সংস্কৃতি রাজনীতিকে প্রতিযোগিতার জায়গা থেকে ঠেলে দিয়েছে
সংঘাতের দিকে। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভয়ের রাজনীতি এবং নাগরিক আস্থার ক্ষেত্রে ব্যাপক
পতন হয়েছে। আর রাজনীতি যেখানে আস্থা হারায়, সেখানে গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রাণবন্তভাবে
নয় বরং কেবল কাঠামোগতভাবে। এমন পরিস্থিতিতে ভোট হয়, কিন্তু নির্বাচনের বিশ্বাস থাকে
না; দল থাকে, কিন্তু নীতি থাকে না। এই অবস্থাকেই বলা হয় অপরাজনীতি। তবে এই অপরাজনীতি থেকে মুক্তি
পেতে হলে আমাদের ফিরতে হবে শুদ্ধ রাজনৈতিক দর্শনের কাছে; যেখানে রাজনীতি হবে নৈতিকতা,
জ্ঞান ও সেবার মেলবন্ধন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলায় একমাত্র আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করতে পারেন কেবল একজন, তিনি তারেক রহমান।
যিনি ইতোমধ্যে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়তাবাদী আইকন হিসেবে
নিজেকে আবির্ভূত করেছেন।
তিনি গত ১৭ বছর প্রবাস জীবনে থেকেও দেশের বিভিন্ন সমস্যা
এবং ধ্বংসপ্রায় গণতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় রেখে দেশ
গঠনে যে ৩১ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছেন, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চয়ই নতুন
বাংলাদেশ গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। তবে এই ৩১ দফা বাস্থবায়নের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশ
কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হল দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় নয়, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরেও
সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দলীয়
নেতৃত্বে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা, দলের আর্থিক স্বচ্ছতা আনয়ন করা এবং সিদ্ধান্ত
গ্রহণে নিচের স্তরের অর্থাৎ তৃণমূল কর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অতীব জরুরি। রাজনীতি
যদি ভেতর থেকে শুদ্ধ না হয়, বাইরে তার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা জন্মায় না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক জিয়া যদি দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক
সংস্কৃতি আরও জোরদার করেন,
তবে তা জাতীয় পর্যায়ের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করবে।
এ ছাড়া রাজনীতিকে
জ্ঞানভিত্তিক করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক শিক্ষা, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে
নীতিনির্ধারণে বাস্তব জ্ঞান আনতে হবে। আজ যে রাজনীতি চলছে, সেখানে চিন্তা-চেতনার জায়গা
কম, বরং স্লোগানের জায়গা অনেক বেশি। চিন্তাহীন রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ভালো কিছু দিতে
পারে না, বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। শুদ্ধ রাজনীতির প্রথম শর্ত হলো
নৈতিকতা ও আদর্শের চর্চা। দলীয় রাজনীতিতে আদর্শগত স্পষ্টতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ক্ষমতার জন্য রাজনীতি নয়,
বরং জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাই যে রাজনীতির
মূল উদ্দেশ্যÑ এই বার্তা দলীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিতে হবে। বিএনপির
অঙ্গসংগঠনগুলোতে তরুণদের সম্পৃক্ততা থাকলেও নেতৃত্বে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ এখনও
সীমিত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্রদল, যুবদলসহ
বিভিন্ন সংগঠনে যোগ্য,
শিক্ষিত ও ক্লিন ইমেজধারী তরুণদের সামনে আনা শুদ্ধ রাজনীতির
জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বয়স বা ব্যক্তিগত
আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে নেতৃত্বের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান
এবং অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন ও প্রতিহিংসার
বৃত্তে আবদ্ধ। বাংলাদেশের
বর্তমান রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হলো সহনশীলতার অভাব। ভিন্নমত মানেই বিরোধী আর বিরোধী
মানেই শত্রুÑ এই মনোভাব সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অপরদিকে গঠনমূলক
রাজনীতি মানে হলো বিতর্কের মাধ্যমে সমাধান, যা সংঘাতের মাধ্যমে কখনোই অর্জন করা সম্ভব
নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই মুহূর্তে প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি,
যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে থাকবে একনিষ্ঠ ঐক্য। সংসদকে
হতে হবে জাতীয় সংলাপের ক্ষেত্র, রাজনৈতিক সংঘাতের যুদ্ধক্ষেত্র নয়। গণতন্ত্র তখনই টিকে
থাকবে, যখন বিরোধিতা হবে নীতির ভিন্নতায়, আর ঐক্য হবে দেশ ও জনগণের কল্যাণে। রাজনীতির
লক্ষ্য হতে হবে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি, কেবল ক্ষমতা দখল নয়, সেবা ও
দায়িত্বই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল চেতনা। তারেক রহমান দীর্ঘদিন
ধরে নিজেকে একটি আধুনিক,
সংস্কারপন্থী ও ভবিষ্যৎমুখী রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে তুলে
ধরার চেষ্টা করে আসছেন।
দলের ভেতরে ও বাইরে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে
মূলত গণতন্ত্র,
ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে তার বক্তব্যের
কারণে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক জিয়া যদি প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান, মত-ভিন্নতার
প্রতি সহনশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা জোরালোভাবে তুলে ধরেন, তবে
তা শুদ্ধ রাজনীতির পথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর। সামাজিক মাধ্যম, ডিজিটাল
প্লাটফর্ম ও অনলাইন আলোচনার মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন এখন সময়ের
দাবি। জনগণের প্রত্যাশা, তারেক জিয়া ডিজিটাল রাজনীতিকে আরও সংগঠিত ও
দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করে তরুণদের নীতিনির্ধারণে যুক্ত করবেন, পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, তথ্যপ্রযুক্তি
ও উদ্যোক্তা উন্নয়নÑ এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে আনবেন, যা সার্বিক
অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে সহায়ক হবে। শুদ্ধ রাজনীতির পুনর্জাগরণ শুধু একটি
রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য হতে পারে না; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। এই
বাস্তবতায় তারেক জিয়ার সামনে সুযোগ রয়েছে তরুণ প্রজন্মের আস্থা ও প্রত্যাশার
প্রতিফলন ঘটানোর। আদর্শ,
নৈতিকতা, গণতন্ত্র ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সমন্বয়ে
তিনি যদি কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন, তবে শুদ্ধ রাজনীতির পথে
বাংলাদেশ নতুন করে এগিয়ে যেতে পারবেÑ এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
রাজনীতিতে ‘দুর্নীতি’ শুদ্ধ রাজনীতির সবচেয়ে বড় অন্তরায়। বিশ্লেষকরা
ধারণা করেছিলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
সংস্কার কার্যক্রমের ফলে দেশের দুর্নীতি অনেকাংশই কমে যাবে, কিন্তু বাস্তবে তার
প্রতিফলন সাধারণ জনগণ দেখতে পায়নি। এই প্রেক্ষাপটে তারেক জিয়ার করণীয় হিসেবে
বিশ্লেষকরা জোর দিচ্ছেন, দলীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
বাস্তবায়নের ওপর। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যেন অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে, সে বিষয়ে
কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা তরুণদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে। এতে
সার্বিকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ব্যাপক হারে কমে যাবে বলে অনেকে মনে করেন।
আজ বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন প্রভাতের অপেক্ষায়। সেই প্রভাত আসবে তখনই, যখন আমরা রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনব সত্য, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার পথেÑ যেখানে দল নয়, দেশই হবে সর্বোচ্চ আদর্শ। আর এই আদর্শকে ধারণ করে দীপ্ত পায়ে এগিয়ে যাবেন ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার কারিগর তারেক রহমান। আসুন, আমরাও সেই মন্ত্রে উজ্জীবিত হই, একসঙ্গে চলি, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ি।
মো. ইলিয়াস হোসেন
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং কলাম লেখক