অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্প
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৭ পিএম
একটি দেশের জন্য রাজধানী অনেক গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীতে কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বেশি পাওয়া যায়। এই কারণেই সবাই রাজধানীমুখী হতে চায়। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রাজধানী শহর ঢাকায় জনসংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে ঢাকায় বেড়ে চলেছে ভূমিকম্প ও অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি।
অন্য শহর থেকে নানা কারণে নাগরিকরা
ঢাকায় চলে আসে। তাই ঢাকাকে এখন বলা যায়, পৃথিবীর দ্বিতীয় জনবহুল শহর। এইসব মানুষের
আবাসন ব্যবস্থার জন্য প্রতিদিন ঢাকা শহর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তার পরিধি বাড়াচ্ছে। দ্রুত
নগরায়ণের জন্য ঢাকা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের এলাকায় নতুন
নতুন ভবন বানানো হচ্ছে, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এইসব আবাসনের অধিকাংশই ইমারত নির্মাণ
বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে না।
ঢাকায় এমন অনেক ভবন, এমন অনেক
বর্ধিত এলাকায় আবাসন প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মাটি এখনও খুব দুর্বল। এইসব
ক্ষেত্রে জলাভূমি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। এসব আবাসন প্রকল্পের সড়কগুলো
সাধারণত সংকীর্ণ হয়ে থাকে। ফলে ভবনের ভেতরের কাজে যত মনোযোগ দেওয়া হয় বাইরের কাজে অর্থাৎ
রাস্তাঘাটের নির্মাণ কাজ সেভাবে করা হচ্ছে না। সবকিছুই হচ্ছে অপরিকল্পিত। সে ক্ষেত্রে
মনেই রাখা হয় না প্রাকৃতিক দুর্যোগ নামক কোনো শব্দ পৃথিবীতে আছে।
ভবনগুলোর কোথাও নেই কোনো প্রকার
ভূমিকম্প প্রতিরোধের ব্যবস্থা। নেই অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থাও।
কোথাও কোথাও রাস্তাও থাকে না। আমরা জানি, প্রত্যেক দেশের উন্নয়ন শুরু হয় রাজধানীকে
কেন্দ্র করে। এখান থেকেই শুরু হয় কর্মসংস্থান প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক তৎপরতা, এমনকি দেশের
বিচার ও প্রশাসন কর্মকান্ডও। এই ধারাবাহিকতায় আমাদের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয়
সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে, ঢাকাগামী মানুষের বসবাসের জন্য হচ্ছে অপরিকল্পিত
নগরায়ণ, একই সঙ্গে রয়েছে ভূমির সঠিক ব্যবহারের অভাব এবং খোলা জায়গার স্বল্পতা। এসব
সীমাবদ্ধতার মধ্যে গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার সুযোগ যেমন কম
তেমনি সচেতনও হয়নি কেউ।
নগরায়ণের ফলে একটি শহরে সব সময়
যে উচ্চবিত্ত মানুষের ভিড় বাড়বে, তা কিন্তু নয়। বাড়ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের
সংখ্যা। গড়ে উঠছে নতুন নতুন বস্তি। কখনও রাজনৈতিক কারণে ও কখনও অর্থনৈতিক কারণেও ঢাকার
আশপাশে এমনকি ঢাকার মূল কেন্দ্রেও গড়ে উঠছে নতুন নতুন বস্তি। এইসব বস্তি শুধু বসবাসের
জন্যই গড়ে ওঠে। এটিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার বিষয়টি কেউ মনেও রাখে না। অনেক ক্ষেত্রে
এটিকে রীতিমতো অবহেলা করা হয়। কোনো কারণে এইসব বস্তিতে আগুন লাগলে উদ্ধার করার কোনো
সুযোগ থাকে না। মানুষের বের হয়ে আসার রাস্তা থাকে না, থাকে না মালামাল উদ্ধার করার
উপায়। রাস্তার অভাবে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িও প্রবেশ করতে পারে না।
একই ঘটনা ঘটে ঢাকার বিভিন্ন
এলাকায় গড়ে ওঠা রুফটপ রেস্টুরেন্টগুলোতে। আজকাল রাজধানীর বহুতল
ভবনগুলোর ছাদে বেশ কিছু রেস্তোরাঁও স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই অননুমোদিত।
এসব রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন উচ্চতাপে রান্না করা হয়। তাছাড়া সাজানোও হয় প্লাস্টিক
জাতীয় দাহ্য বস্তু, কাঁচ ও বাঁশ কাঠ ইত্যাদি দিয়ে। তাতে তীব্র বায়ুপ্রবাহ হলে
যেকোনো সময় নানা দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদি অগ্নিসংযোগ হয় তাহলে
অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও নেওয়ার উপায় নেই। ফায়ার ব্রিগেড সেখানে পৌঁছতে পারবে না।
আমাদের দেশে যেমন অধিকাংশ
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে নির্মিত হয় না। তার ওপর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার
মতো ছাদ রেস্তোরাঁ, এ যেন ‘একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর’। এসব ছাদ রেস্তোরাঁ পরিচালনা করা হয় সম্পূর্ণ
অনিরাপদভাবে। ফলে এগুলো ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অথচ নানা কারণে প্রতিটি
ভবনের ছাদ উন্মুক্ত রাখা উচিত। ঢাকার বহুতল ভবনের উন্মুক্ত ছাদে আপদকালীন সময়ে
মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। প্রয়োজনে ছাদে হেলিকপ্টার নামিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষকে
উদ্ধার করা যায়। এর পরে আসে ভূমিকম্প নিরাপত্তাহীনতার কথা।
আমরা জানি, পৃথিবীর
ভূত্বক বড় বড় খণ্ড বা টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এই প্লেটগুলো এলে অপরের সঙ্গে
ধাক্কা খেলে বা সরে গেলে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, যা একসময় শিলাস্তরে ফাটল তৈরি করে
এবং শক্তি নির্গত করে। ফলে ভূমিকম্প হয়। তা ছাড়া মানব সৃষ্ট সমস্যা অপরিকল্পিত
নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলন করা হয়। ফলে
শহরের নিচে শূন্যস্থান তৈরি হয়। ভূগর্ভস্থ শূন্যস্থানই অনেক সময় ভূমিকম্পের কারণ
হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য সবার আগে দরকার পরিকল্পিত নগরায়ণ।
এজন্য শুরুতে পরিকল্পিত
নগর গড়ে তোলার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। একটি ভবন থেকে আরেকটি ভবনের সঠিক দূরত্ব
রাখতে হবে। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হবে সঠিক বৈদ্যুতিক সংযোগ।
গ্যাসের সংযোগ বা গ্যাস সিলিন্ডার হতে হবে মানসম্মত। আবাসিক এলাকার আশপাশে
কোনোপ্রকার ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গুদামজাত করা যাবে না। আবাসিক এলাকা কিংবা এর
আশপাশে কোনো কলকারখানা রাখা যাবে না। প্রতিটি এলাকায় এবং পরিকল্পনায় বিভিন্ন
নাগরিক সুবিধা যেমন খেলার মাঠ, জলাধার ও সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
অগ্নিকাণ্ড থেকে নিরাপদ
থাকার জন্য প্রতিটি আবাসিক ভবনে পর্যাপ্ত সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক সামগ্রী রাখতে হবে।
শুধু সংরক্ষণ করলেই হবে না, এর সহজ ব্যবহার পদ্ধতি সবাইকেই জানতে হবে।
প্রতিটি বিদ্যালয়ের সঙ্গে
মাঠ থাকতে হবে। ভবনে থাকতে হবে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনা। শিক্ষার্থীদের অগ্নিনির্বাপণ
প্রশিক্ষণ দিতে এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের পদ্ধতিও
শেখাতে হবে।
সময় এসেছে সচেতন হওয়ার।
মুক্ত হতে হবে অনিয়ন্ত্রিত বসতি ও দুর্বল নগর পরিকল্পনা থেকে। অনুসরণ করতে হবে ভবন
নির্মাণ নকশা, প্রকৌশল, নির্মাণের মান ও আইন প্রয়োগ ব্যবস্থাপনা। ভবন নির্মাণ কোড
মানা না হলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভূগর্স্থ পানি ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য
ও নিরাপদ করতে হবে।
প্রত্যেক মানুষকে
অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্প বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার। সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও জনগণকে
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও দুর্যোগ-পরবর্তী
ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
শুধু বাসভবন নয়,
প্রতিটি শিল্পকারখানা, সরকারি ও বেসরকারি ভবনে আইন ও বিধি অনুযায়ী অগ্নি
প্রতিরোধব্যবস্থা ও ভূমিকম্প প্রতিরোধ ও পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন
করতে হবে। আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে সকল ভবনে অটো ফায়ার এলার্মের ব্যবস্থা থাকা
জরুরি, তাতে সবাই সচেতন হতে পারবে। ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে নির্গমন পথ প্রদর্শক
চিহ্ন থাকতে হবে, যেন তা অন্ধকারেও দেখা যায়। পাশাপাশি দরকার নাগরিক কাঠামো
পুনর্বিন্যাস ও নাগরিক সচেতনতা। তবেই আমরা অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পজনিত দুঃখজনক
অবস্থা থেকে মুক্ত থেকে সুস্থ পরিবেশে শ্বাস গ্রহণ করতে পারব, জাতি হবে সুখী, সফল
ও সমৃদ্ধ।
শেলী সেনগুপ্তা
কলাম লেখক