রাজনীতি
ড. মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০২ পিএম
দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসন জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তারেক রহমানের রাজসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে তিনি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেন, মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করে অনুভব করেন গভীর স্নিগ্ধতা; শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে হেঁটে অনুভব করেন হৃদয়ের গভীর স্পন্দন। এই প্রত্যাবর্তন কেবল শেকড়ে ফিরে আসার যাত্রা নয়, এটি ইতিহাসের নতুন অভিযাত্রায় যুক্ত হওয়ার এক গভীর মানবিক ও রাজনৈতিক উপলক্ষ। দেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যে বিপুল জনস্রোতের আবেগঘন অভ্যর্থনা তিনি লাভ করেছেন, তা কেবল একজন নেতার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ নয়; বরং এটি জিয়া পরিবার এবং তাদের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি জনগণের গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধারই প্রতিফলন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে নগরীর
প্রধান সড়ক, অলি-গলি ও জনপথÑ সর্বত্র ছিল মানুষের ঢল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা,
নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নেচে-গেয়ে, বর্ণিল সাজে সজ্জিত
হয়ে প্রিয় নেতাকে একনজর দেখার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন।
অনেকেই ছোট শিশুদের সঙ্গে নিয়ে এক থেকে দুই দিন আগেই সভাস্থলের আশপাশে অবস্থান
নিয়েছিলেন। জনতার ভালোবাসার এই মহাস্রোতে ভেসে তারেক রহমান করমর্দন করেছেন,
অভিবাদন গ্রহণ করেছেন এবং জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। লক্ষণীয় যে,
বিমানবন্দর থেকে কুড়িল বিশ্বরোডের সভাস্থল পর্যন্ত মাত্র চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম
করতে সময় লেগেছে তিন ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট, যা মানুষের ভালোবাসা ও প্রত্যয়ের
গভীরতাকেই স্পষ্ট করে।
সভামঞ্চে উঠে তিনি দুই হাত উঁচু করে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি অভিবাদন জানান। ব্যক্তিগত আবেগকে সংযত রেখে তিনি উল্লেখ করেন, অসুস্থ মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই জনগণের ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতে তিনি জনতার মাঝেই উপস্থিত হয়েছেন। তার বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয় দায়িত্ববোধ ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বের বার্তা। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ঐতিহাসিক উক্তি ‘I have a dream’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি নিজের প্রত্যয়ের কথা উচ্চারণ করেন, ‘I have a plan for the people of Bangladesh.’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশবাসীর সামনে একটি আশাবাদী ভবিষ্যৎচিত্র তুলে ধরেন, যেখানে উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটবে।
তিনি ঐক্যের আহ্বান জানান এবং জনগণের সঙ্গে
স্বপ্ন ভাগ করে নেন। তারেক রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসকে একটি অবিচ্ছিন্ন ধারায় ধারণ
করে ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সব বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং
তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। তার ভাষণ ও দর্শনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সহিষ্ণু ও
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির অঙ্গীকার, যেখানে পাহাড় ও সমতল, নারী ও পুরুষ, তরুণ ও
প্রবীণÑ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়।
তিনি দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং দেশি ও বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য বিশেষভাবে তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানান এবং দুই হাত তুলে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য রহমত, বরকত ও কল্যাণ কামনা করেন। তার প্রায় ১৫-১৬ মিনিটের ভাষণ, নতুন দিনের রাজনীতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির কথা উচ্চারণ করেছেন এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এই বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও শহীদ ওসমান হাদির আদর্শ ও স্বপ্নের বাস্তবায়নের প্রতিচ্ছবি দেশের জনগণ স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা, ঐক্য, জনআকাঙ্ক্ষা ও জনগণের ক্ষমতায়নের এক শক্তিশালী প্রতীক। তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক যাত্রা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে এই প্রত্যাশাই আজ দেশের অসংখ্য মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ড. মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থ ও ব্যাংকিং বিভাগ (ইউএসটিসি), চট্টগ্রাম