শীতের তীব্রতা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৫৩ এএম
তীব্র শীতে কাঁপছে দেশ। বিশেষত দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। আরও কমে যাওয়ার আভাসও আছে। ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় সেখানকার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। এতে শিশু-বৃদ্ধ এবং নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। তাদের জীবনযাত্রা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও মৌলভীবাজার ছাড়া দেশের প্রতিটি জেলায় রাতের তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। এতে বাড়ছে শীতের প্রকোপ।
২৫ ডিসেম্বর দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল
রাজশাহীতে ১০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে দুর্ভোগে পড়েছেন রাজশাহী
ও আশপাশের মানুষ। হিমালয়কন্যা খ্যাত উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও,
কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটে ঘন কুয়াশা আর হিমেল বাতাসে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে জনজীবন।
এতে চরম বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষগুলো। এদিকে বগুড়ায় শীত ও ঘন কুয়াশায় ফসলের
ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতপ্রবাহ ও ঘন
কুয়াশা নগরবাসীর জীবনযাত্রায় স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। বরিশালেও শীত হঠাৎ জেঁকে বসছে।
দিনের বেশিরভাগ সময়ই দেখা মিলছে না সূর্যের। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী
কয়েক দিন সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা কমবে এবং ঠান্ডার অনুভূতি বাড়বে।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে পৌষ ও মাঘ শীতকাল হলেও
মূলত কার্তিকের শেষ দিক থেকেই শীত শুরু হয়, থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু
বাস্তবতা হচ্ছে, এ দেশে এখন আর ষড়ঋতুর কার্যকারিতা নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে
শীত, গরম ও বর্ষাÑ এ তিন ঋতুরই প্রাবল্য। প্রচণ্ড গরম, অতিমাত্রায় শীত কখনও
অতিবৃষ্টির প্রভাব। এ কথা সত্য, বাংলাদেশে শীত মানেই কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর
নিম্ন তাপমাত্রার মৌসুম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতের চরিত্র বদলেছে। কখনও
স্বল্পস্থায়ী অথচ তীব্র, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী ও অসহনীয় ঠান্ডাÑ এই
অস্বাভাবিকতা শুধু মানুষের কষ্টই বাড়াচ্ছে না, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও
গভীর প্রভাব ফেলছে। পরিবেশবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের শীতের তীব্রতা এক নীরব
সতর্কবার্তা।
এক্ষেত্রে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা সামগ্রিকভাবে
বাড়লেও আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা বেড়েছে। এর ফলেই শীতকালে হঠাৎ তাপমাত্রা দ্রুত নেমে
যাচ্ছে। উত্তরের হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহ আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী
হয়ে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। এই অস্বাভাবিক ঠান্ডা প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যকে
বিঘ্নিত করছে।
শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে জীববৈচিত্র্যের
ওপর। পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং কীটপতঙ্গের জীবনচক্র শীতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অতিরিক্ত ঠান্ডায় অনেক কীটপতঙ্গ মারা যায়, যা একদিকে ফসলের ক্ষতিকর পোকা কমালেও অন্যদিকে
খাদ্যশৃঙ্খলে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে। পাখিদের খাদ্য সংকট বাড়ে, অনেক পরিযায়ী পাখির
আগমন ও প্রস্থান সময়ে পরিবর্তন দেখা যায়। জলাশয়ে মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, ফলে প্রাকৃতিক
জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ভিদ জগৎও শীতের তীব্রতার শিকার। অতিরিক্ত কুয়াশা ও
নিম্ন তাপমাত্রায় আলোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। শীতকালীন ফসল যেমনÑ বোরো ধান,
সবজি ও আলু উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুধু তাই নয়, শীতকালে সর্দি-কাশি, ফ্লু,
নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, ব্রঙ্কাইটিস, ডায়রিয়া, ও চর্মরোগের মতো রোগবালাইয়ের প্রকোপ
বাড়ে। দীর্ঘস্থায়ী ঠান্ডা ও কুয়াশায় কৃষি ইকোসিস্টেমকে দুর্বল করে তোলে।
এতে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষ করে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য শীতকাল
বড় কষ্টের। শীতকাল এলেই দরিদ্র অসহায় মানুষ শীতে জবুথবু হয়ে যায়। শীত তাদের জন্য নিয়ে
আসে এক ভয়াবহ দুর্ভোগ। তাদের প্রয়োজনীয় শীতের কাপড় না থাকায় প্রচণ্ড রকমের কষ্ট করতে
হয়। এই কনকনে শীতে ফুটপাত, রেলস্টেশন ও বস্তিতে বসবাস করা মানুষের দুর্ভোগ চরমে ওঠে।
কষ্টের শেষ থাকে না পথশিশুদেরও। শীতে মৃত্যুর ঘটনাও বিরল নয়। আমাদের সবার উচিত সুবিধাবঞ্চিত
মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া। সরকারের পাশাপাশি
আমরা সবাই এগিয়ে এলে শীতার্তরা উপকৃত হবে।
শীতের তীব্রতা মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি প্রাকৃতিক
পরিবেশেও চাপ সৃষ্টি করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য শীত মানেই বাড়তি জ্বালানি ব্যবহার,
কাঠ ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বন উজাড়ের প্রবণতা। এতে বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল
সংকুচিত হয়, যা ইকোলজির জন্য মারাত্মক হুমকি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ
বা কম্বল বিতরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব নীতি। জলবায়ু পরিবর্তন
মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, বন সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ, জলাশয় রক্ষা এবং টেকসই
কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ইকোলজিক্যাল গবেষণা বাড়িয়ে শীতের পরিবর্তিত
ধরন বুঝে অভিযোজনমূলক পরিকল্পনা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শীতের তীব্রতা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, বরং প্রকৃতিরই পাঠানো বার্তা। এই বার্তা উপেক্ষা করলে শুধু শীত নয়, আগামী দিনগুলোতে হয়তো আরও বড় পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের।