ইমেইল থেকে
জুবায়ের মাহমুদ
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২৩ এএম
আপনি অবস্থান করছেন সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি পরিবেশে নিজের পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য আবাসস্থলে। হঠাৎ করেই এক মুহূর্তের তীব্র শব্দ অথবা প্রচণ্ড আলো আপনার স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহ থামিয়ে দিল। কিছু বোঝার আগেই হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেল কিংবা আগুনের ভয়াবহ শিখা আপনাকে শঙ্কিত করে তুলল। এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে ঠিক এমনই এক আকস্মিক ও নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে আমাদের চারপাশের নীরব প্রাণীরা বিশেষ করে পাখিকুল।
থার্টিফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ও ফানুস
ওড়ানো উৎসব ও উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বছরের শেষ দিন, জাতীয় ও সামাজিক
উৎসব কিংবা ব্যক্তিগত আনন্দানুষ্ঠান সব ক্ষেত্রেই আকাশ ভরে ওঠে আলো ও শব্দে।
কিন্তু এই স্বল্প সময়ের বিনোদনের আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি লুকিয়ে আছে, সে বিষয়ে
আমাদের সচেতনতা অত্যন্ত সীমিত। কয়েক মিনিটের আনন্দের বিনিময়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত
করছি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই নিরাপত্তা।
পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক হলেও তাদের ভূমিকা কেবল
সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তারা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। ফসলের জন্য ক্ষতিকর অসংখ্য কীটপতঙ্গ খেয়ে তারা কৃষি উৎপাদন রক্ষায়
ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং কৃষিভিত্তিক
অর্থনীতি উপকৃত হয়। অথচ এই উপকারী প্রাণিকুলই আজ মানুষের বিনোদনের বলি হচ্ছে।
আতশবাজির বিকট শব্দ ও তীব্র আলো পাখিদের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ। উচ্চমাত্রার শব্দে
অনেক পাখির হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়, দিশাহারা হয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উড়ে গিয়ে
ভবন, বৈদ্যুতিক তার কিংবা গাছের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারায়। ফানুস থেকে নির্গত
আগুনে ধ্বংস হয়ে যায় তাদের বাসা, ডিম ও বংশবিস্তারের স্বাভাবিক পরিবেশ।
দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর, যা পরিবেশগত ভারসাম্যকে
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এই সমস্যাটি শুধু পাখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শীত মৌসুমে দেশের
অধিকাংশ অঞ্চল শুষ্ক থাকে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক
বেশি। উড়ন্ত ফানুস প্রায়ই আবাসিক ভবন, বস্তি, দোকানপাট কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের
ওপর পড়ে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে। বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সঞ্চালন লাইনের ওপর পড়লে
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, কোথাও কোথাও ভয়াবহ দুর্ঘটনারও সৃষ্টি হয়। আবার ফসলের
মাঠে পড়ে আগুন ধরে গেলে কৃষকের বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই ভস্মীভূত হয়ে যায়। এসব
ঘটনায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্পদহানি ঘটে এবং মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
উদযাপনের নামে এই অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড সামাজিক ও অর্থনৈতিক
ক্ষতিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন
ভোগান্তি পোহাতে হয়। অথচ সামান্য সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণই এই ক্ষতি অনেকাংশে
প্রতিরোধ করতে পারে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, মানুষ প্রকৃতির বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন
সত্তা নয়। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশÑ এই তিনের মধ্যে গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা
বিদ্যমান। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব অবশ্যম্ভাবীভাবে মানুষের জীবনেই
ফিরে আসে। আজ যে পাখি মারা যাচ্ছে, আগামীতে তার অনুপস্থিতিতে ক্ষতিকর পোকামাকড়
বেড়ে গিয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্যব্যবস্থা ও
জনস্বাস্থ্যের ওপর।
তাই প্রয়োজন উৎসব ও আনন্দ উদযাপনের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
গ্রহণ করা। আনন্দ বন্ধ করার কথা বলছি না; বরং আনন্দকে দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব
করার আহ্বান জানাচ্ছি। বিকল্প হিসেবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীতানুষ্ঠান,
আলোচনাসভা, সীমিত ও নিরাপদ আলোকসজ্জা কিংবা পরিবারকেন্দ্রিক আয়োজনের মাধ্যমে আনন্দ
প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে আনন্দও থাকবে, আবার কোনো প্রাণ বা পরিবেশের ক্ষতিও হবে
না।
আতশবাজি ও ফানুস বর্জন করে আমরা শুধু পাখি বা পরিবেশ নয়,
নিজেদের ভবিষ্যৎও রক্ষা করতে পারি। প্রকৃতি নিরাপদ থাকলেই মানুষের জীবন নিরাপদ।
তাই আসুন, সচেতন হই এবং এমন উদযাপন বেছে নেই, যেখানে আনন্দের সঙ্গে মানবিকতা ও
দায়িত্ববোধের সমন্বয় থাকবে।
জুবায়ের মাহমুদ
শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়