ব্যাংকিং খাত
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২৭ এএম
সম্প্রতি আমার পরিচিত একজন ব্যক্তি একটি ব্যাংকের শাখায় গিয়েছিলেন কিছু স্থায়ী আমানতে (এফডিআর-ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) অর্থ জমা রাখার জন্য। এটি কোনো নতুন স্থায়ী আমানত ছিল না। অন্য একটি ব্যাংকে আগে থেকেই এই অর্থ স্থায়ী আমানতে জমা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেই ব্যাংক সমস্যায় আছে মর্মে বাজারে খবর থাকায়, একজন সাবধানী আমানতকারী এবং জীবনের শেষ সম্বল হওয়ায় তিনি সেই ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করে অন্য একটি ব্যাংকে, যেটি অপেক্ষাকৃত ভালো বলে মনে করা হচ্ছে, সেই ব্যাংকের স্থায়ী আমানতে জমা রেখেছেন। তিনি তার পূর্বের ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করতে যেয়েও এক ধরনের বিড়ম্বনার সম্মুখীন হন, যা একটি ভিন্ন বিষয় এবং আজকের লেখার প্রসঙ্গ নয়। যে ব্যাংকে তিনি নতুনভাবে স্থায়ী আমানতে অর্থ জমা রাখতে গিয়েছিলেন, সেই ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংক আমানতের এমন দুর্দিনে কোনোরকম মার্কেটিং ছাড়াই কিছু আমানত পেয়ে যাওয়ায় বেজায় খুশি এবং এ কারণে তারা কীভাবে সবচেয়ে ভালো সেবা সেই গ্রাহককে দেবেন, তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা তাদের সর্বোচ্চ মাত্রার
সেবা প্রদানের প্রয়াস হিসেবে সবচেয়ে বেশি সুদের হারের মাসিক সুদ প্রদানের মতো স্থায়ী
আমানতে অর্থ রাখার ব্যবস্থা করেছিল। সেই পরিচিত ব্যক্তি ব্যাংকিং লেনদেন-সংক্রান্ত
বিষয়ে সব সময়ই আমার সঙ্গে আলোচনা করেন এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমি সবকিছু শুনে
তাকে জানালাম যে আপনি যেহেতু দেশের বাইরে ছেলেমেয়েদের কাছে থাকেন এবং চাইলেই নির্ধারিত
সময়ে দেশে যেতে পারবেন না, তাই ব্যাংকের এই প্রডাক্ট আপনার জন্য সুবিধার হবে না। আমি
তাকে আরও বললাম যে সুদের হার যাই হোক না কেন, স্বয়ংক্রিয় নবায়নের সুযোগ সংবলিত এক বছর
মেয়াদি স্থায়ী আমানতই আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি সুবিধার হবে। যেহেতু ব্যাংকের কর্মকর্তারা
ইতোমধ্যে তাকে একটি প্রডাক্ট দিয়েই ফেলেছে, তাই তারা সেটি রাখার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি
নিয়ে আমি যখন একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললাম, তখন সেই কর্মকর্তা
আমাকে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে এই আমানতে সুদের হার সর্বোচ্চ এবং প্রতি
মাসে সুদের অর্থ গ্রাহকের সঞ্চয়ী হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জমা হবে, তাই এই ব্যবস্থাই
তার জন্য উত্তম হবে।
আমি যখন সেই কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলাম
যে আপনার গ্রাহক তো দেশে থাকেন না এবং তার খরচ মেটানোর জন্য মাসিক টাকারও প্রয়োজন নেই।
সে ক্ষেত্রে প্রতি মাসে তার ব্যাংক হিসাবে টাকা এসে পড়ে থাকবে এবং তাতে কোনো লাভ হবে
না। তখন সেই কর্মকর্তার উত্তর ছিল যে মাসিক সুদের অর্থ দিয়ে একটি তিন বছর মেয়াদি ডিপিএস
(ডিপোজিট পেনশন স্কিম) চালু করা যাবে, যা মেয়াদ পূর্তিতে ভাঙিয়ে একটি স্থায়ী আমানত
করা যাবে। এই প্রসঙ্গে আমি আরও কিছু বিষয় জানতে চাইলাম, বিশেষ করে গ্রাহক বিদেশে থাকা
অবস্থায় স্থায়ী আমানতই-বা কীভাবে হবে এবং সেই এফডিআর গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরই বা হবে
কীভাবে? এসব প্রশ্নের সদুত্তর সেই কর্মকর্তার কাছে ছিল না। ফলে তিনি তখন স্বীকার করলেন
যে এই প্রডাক্টটা গ্রাহকের জন্য উপযুক্ত হয়নি। এই বলে প্রডাক্টটি বাতিল করে আমি যেভাবে
বলেছিলাম সেভাবেই একটি সাধারণ স্থায়ী আমানত করে দিয়েছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে।
লেখার শুরুতে আমার পরিচিত ব্যক্তির অভিজ্ঞতার
বিষয়টি দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে উল্লেখ করলাম এই কারণে যে পাঠকরা যেন দেশের ব্যাংকিং খাতের
সেবার মান সম্পর্কে একটা ধারণা পায়। ব্যাংক থেকে মানসম্পন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমার
সেই পরিচিত ব্যক্তি একাই যে এরকম বিড়ম্বনার সম্মুখীন হয়েছেন তেমন নয়। অধিকাংশ গ্রাহক
এখন আর ব্যাংক থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং উপযোগী সেবা পায় না। ব্যাংকাররা যেভাবে যা
বুঝিয়ে দেয়, সেটাই গ্রাহকদের গ্রহণ করতে হয়। আমানত রাখা, ঋণ গ্রহণ, অর্থ স্থানান্তর
বা এলসি খোলাসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবার ক্ষেত্রে একই অবস্থা। মানসম্পন্ন ব্যাংকিং
সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যে ব্যাংকারদের চেষ্টার কমতি আছে, তেমন নয়। ওপরে উল্লিখিত ঘটনার
ক্ষেত্রে সেই ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টা, সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিল
না। কিন্তু দুটো কারণে সেই ব্যাংকার গ্রাহককে তার জন্য সবচেয়ে উপযোগী সেবা প্রদান করতে
পারছিল না, যার একটি হচ্ছে যথাযথ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমানত
সংগ্রহের টার্গেট।
এখন নির্বিচারে সকল শ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তাদেরকে
আমানত সংগ্রহের টার্গেট দেওয়া হয়। আর এসব টার্গেট পূরণ করতে যেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্পন্ন
সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না। এমনকি টার্গেট পূরণ করতে যেয়ে অনেক ব্যাংকার অনৈতিক পন্থাও
অবলম্বন করে, যেমনÑ উইন্ডো ড্রেসিং বা স্পিড মানি দিয়ে ডিপোজিট সংগ্রহ করার মতো কাজ।
এরকম টার্গেট অর্জনের চাপ থেকেই ব্যাংক কর্মকর্তারা আমার পরিচিত ব্যক্তিকে মাসিক সুদ
প্রদানের মতো স্থায়ী আমানত করে দিয়েছিল এবং সেই সঙ্গে মাসিক সুদের অর্থ দিয়ে ডিপিএস
চালু করার ব্যবস্থা করেছিল। অর্থাৎ একজন গ্রাহকের কাছে একই পরিমাণ আমানত দিয়ে দুটো
প্রডাক্ট, অর্থাৎ স্থায়ী আমানত এবং ডিপিএস বিক্রির টার্গেট পূরণের চেষ্টা। এই উদ্যোগ
সরাসরি উইন্ডো ড্রেসিং না হলেও, মূলত উইন্ডো ড্রেসিং ছাড়া আর কিছুই না।
মানসম্পন্ন ব্যাংকিং সেবা দিতে গেলে
ব্যাংকারদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। পর্যাপ্ত এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই
ভালো ব্যাংকার তৈরি হতে পারে। শুধুমাত্র একাডেমিক শিক্ষা বা সেকেলে ব্যাংকিং ডিপ্লোমার
মাধ্যমে ভালো ব্যাংকার তৈরি হবে না। যে সকল জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের বিস্তর কাজের অভিজ্ঞতা
আছে, তাদের মাধ্যমে কর্মরত ব্যাংকারদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এই ধরনের প্রশিক্ষণের কয়েকটি দিক থাকে। প্রথমত. ব্যাংকিং ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের মতো
একটি বিশেষায়িত পেশা, যা সব সময় চর্চা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আপডেট রাখতে হয়। ব্যাংকের
প্রডাক্ট সম্পর্কে সঠিক ধারণা এবং ব্যাংকিং জ্ঞানের ব্যাপারে আপডেট থাকতে হলে পর্যাপ্ত
প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত. প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাংকিং জ্ঞানের পাশাপাশি
পরিস্থিতি পর্যালোচনা (সিসিয়েশনাল এনালাইসিস) এবং কেস স্টাডির মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা
মোতাবেক সেবা প্রদানের জন্য ব্যাংকারদের প্রস্তুত করে তোলা হয়। তৃতীয়ত. প্রশিক্ষণের
মাধ্যমে ব্যাংকারদের উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত করা হয় গ্রাহকদের সেবা প্রদানের জন্য।
ব্যাংকে একেক গ্রাহকের চাহিদা এবং ঝুঁকি
গ্রহণের ক্ষমতা একেক রকম। যে গ্রাহকের মাসিক খরচ চালানোর জন্য মাসিক টাকার প্রয়োজন,
তাকে যদি বছরভিত্তিক স্থায়ী আমানত করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই গ্রাহকের উপকারের চেয়ে অপকারই
বেশি হবে। একইভাবে যে গ্রাহকের মাসিক অর্থের প্রয়োজন নেই, তাকে যদি মাসিক সুদ প্রদানের
সুযোগ আছে এমন স্থায়ী আমানত করে দেওয়া হয়, তাহলে একই অবস্থার সৃষ্টি হবে। তার চেয়েও
বড় কথা হচ্ছে, মানুষ ব্যাংকারদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মনে করে জন্যে তাদের কাছে যায় নিজের
কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকারদের উপদেশ মোতাবেক জমা রাখার জন্য। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায়
একজন ব্যাংকারকে গ্রাহকের আর্থিক পরামর্শক বা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজারের দায়িত্ব
পালন করতে হয়। উপযুক্ত এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া একজন ব্যাংকার কখনোই গ্রাহকের আর্থিক
পরামর্শক হয়ে উঠতে পারবে না।
এখন আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রশিক্ষণের
গুরুত্ত্ব একেবারেই নেই। আমরা যখন ব্যাংকিং পেশায় যোগ দিয়েছিলাম, তখন অনেক প্রশিক্ষণ
দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। আমি নিজে অনেক প্রশিক্ষণ পেয়েছি। আমরা যে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকে
চাকরি করি, সেখানেও বছরে অন্তত পনেরো থেকে বিশটা বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এমনকি
বাংলাদেশে যে কয়েক বছর ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলাম, তখনও আমি নিজে অনেক
ব্যাংকারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কিন্তু এখন বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব
সেভাবে নেই বললেই চলে। প্রতিটা ব্যাংকে প্রশিক্ষণ একাডেমি আছে, যেখানে একজন ঊর্ধ্বতন
কর্মকর্তা দায়িত্বও পালন করেন। এমনকি আছে বিআইবিএমের (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক
ম্যানেজমেন্ট) মতো প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রচুর ট্রেনিং হয়। কিন্তু ব্যাংকার তৈরি বা
ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার তৈরির জন্য যে মানের বাস্তবভিত্তিক এবং অনুপ্রেরণামূলক প্রশিক্ষণের
প্রয়োজন, তার বড় অভাব।
এখন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং এমডি বা সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের কাছে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব সবার নিচে। আমার পরিচিত একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার, যিনি আধুনিক ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট অভিজ্ঞ, তিনি অবসরে যেয়ে নিজের আগ্রহ থেকে ভালো ক্রেডিট অফিসার তৈরির উদ্দেশ্যে ক্রেডিটের ওপর প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি দেশে-বিদেশের মানসম্পন্ন ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নতমানের ট্রেনিং মডিউলও তৈরি করেছেন। কিন্তু তিনি এই প্রশিক্ষণের ব্যাপারে যেরকম সারা পাবেন বলে আশা করেছিলেন, বাস্তবে তেমনটা পাননি বরং হতাশই হয়েছেন। আসলে ব্যাংকের বোর্ড, সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক যদি ব্যাংকারদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন না করে, তাহলে ব্যাংক থেকে কখনোই ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে না। প্রশিক্ষণ ব্যতীত ভালো ব্যাংকারও তৈরি হবে না। আবার ভালো ব্যাংকার না হলে, মানসম্পন্ন গ্রাহকসেবা প্রদান করা যাবে না, গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হবেন এবং দেখা দেবে নানান অব্যবস্থা ও অনিয়ম। তাই ব্যাংকে মানসম্পন্ন গ্রাহকসেবা নিশিচত করতে হলে ব্যাংকারদের পর্যাপ্ত কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সকল ব্যাংককে তাদের কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রদানে বাধ্য করা।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা