রাজনীতি
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:১৭ এএম
গত এক দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। বাংলাদেশে যেমন ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব রাজনৈতিক পরিসরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তেমনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে এই প্রবণতা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। অভিবাসন সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরিচয় রাজনীতি এবং সামাজিক ভয়ের রাজনীতি এই উত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। তবে একই সঙ্গে ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানিতে, ডানপন্থার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের শক্তিশালী গণপ্রতিরোধও গড়ে উঠেছে। এই লেখায় জার্মানির প্রতিবাদ আন্দোলনের কাঠামো, ইউরোপে ডানপন্থা মোকাবিলার কৌশল এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য পাঠ আলোচনা করা হলো।
জার্মানিতে ‘আলটারনেটিভ
ফর জার্মানি’ (এএফডি) নামক কট্টর ডানপন্থী দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য ভোট
ও রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করেছে। অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য, ইসলামোফোবিয়া এবং ইউরোপীয়
ইউনিয়নবিরোধী অবস্থান দলটিকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির কাছে জনপ্রিয় করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে জার্মানির বিভিন্ন শহরে বার্লিন, হামবুর্গ, মিউনিখ,
কোলনসহ লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
এই প্রতিবাদগুলো
হঠাৎ বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠেনি; বরং এর পেছনে ছিল একটি সুসংগঠিত নাগরিক নেটওয়ার্ক।
মানবাধিকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, চার্চভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, ছাত্র সংগঠন, শিল্পী ও
সাংস্কৃতিক কর্মীরা যৌথভাবে এই আন্দোলন সংগঠিত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখানে একটি
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেÑ ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ
গ্রুপের মাধ্যমে দ্রুত জনসমাগম নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি মূলধারার মিডিয়াও এসব
কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে, যা জনসমর্থন বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
জার্মানিতে ডানপন্থার
বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল মূলত নাগরিক সমাজ। ‘ফ্রাইডম অ্যান্ড ডাইভারসিটি’ বা
‘ডেমোক্রেসি রক্ষা আন্দোলন’-এর মতো প্লাটফর্মগুলো বিভিন্ন সংগঠনকে এক ছাতার নিচে এনেছে।
রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি নেতৃত্ব না দিয়ে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে, যাতে আন্দোলনটি দলীয়
রঙে রঞ্জিত না হয়। এই কৌশল আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ
দিক হলো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। কনসার্ট, নাটক, আর্ট এক্সিবিশন ও সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে
বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা হয়েছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে
ডানপন্থী মতাদর্শের সমালোচনামূলক আলোচনা এবং ইতিহাসচর্চা জোরদার করা হয়েছেÑ বিশেষ
করে, নাৎসি অতীতের ভয়াবহতার স্মরণ করিয়ে দিয়ে।
ইউরোপে ডানপন্থীদের
মোকাবিলায় প্রধানত চারটি কৌশল দেখা যায়। প্রথমত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।
ঘৃণাভাষণ, বর্ণবাদ ও সহিংস উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়। জার্মানিতে
সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত দল বা সংগঠনের ওপর নজরদারি চালায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা
সংস্থা।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক
মূলধারার দায়িত্বশীল ভূমিকা। মধ্যপন্থী দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে ডানপন্থীদের ভাষা বা
এজেন্ডা অনুকরণ না করে বরং স্পষ্টভাবে তার বিরোধিতা করে। এতে ভোট হারানোর ঝুঁকি থাকলেও
গণতান্ত্রিক নৈতিকতা রক্ষা পায়।
তৃতীয়ত, সামাজিক
ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অসন্তোষ কমানোর চেষ্টা করা হয়। চতুর্থত, গণমাধ্যম
ও শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকাÑ ভুয়া খবর ও প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে ফ্যাক্টচেকিং, মিডিয়া
লিটারেসি এবং ইতিহাস শিক্ষা জোরদার করা হয়।
বাংলাদেশে ডানপন্থী
রাজনীতির উত্থান কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক
পরিসরেও এর প্রভাব বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ
পাঠ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, শক্তিশালী
নাগরিক সমাজ গড়ে তোলা। রাজনৈতিক দলনিরপেক্ষ মানবাধিকার সংগঠন, সাংস্কৃতিক জোট ও পেশাজীবী
সংগঠনগুলোকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধকে গুরুত্ব
দিতে হবে নাটক, গান, চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে ব্যবহার
করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, শিক্ষা
ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বিকৃতি ও ঘৃণাভাষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা
তৈরি করতে হবে। চতুর্থত, আইনের শাসন নিশ্চিত করাÑ সহিংসতা ও উগ্রতার বিরুদ্ধে সমানভাবে
আইন প্রয়োগ না হলে ডানপন্থী শক্তি আরও উৎসাহিত হয়।
সবশেষে, রাজনৈতিক
মূলধারার দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের জন্য যদি ডানপন্থী
ভাষা বা এজেন্ডার সঙ্গে আপস করা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, কিন্তু এটি অপরাজেয় নয়। জার্মানি ও ইউরোপের অভিজ্ঞতা দেখায়Ñ সচেতন নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, আইনের শাসন এবং দায়িত্বশীল রাজনীতির সমন্বয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই পাঠগুলো প্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ রক্ষার লড়াই কোনো একক দলের নয়; এটি সমগ্র সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
হাবিব বাবুল
জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক