পরিপার্শ্ব
মতি লাল দেব রায়
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:০৩ এএম
প্রজাপতি হচ্ছে প্রকৃতি তথা বনের স্বাস্থ্য নির্ণায়ক একটি স্পন্দনশীল প্রাণী। এটি সৃষ্টিকর্তার এক অপূর্ব সৃষ্টি। একে প্রকৃতির এক অলংকারও বলা হয়। যে বনে বা অঞ্চলে বেশি প্রজাপতি দেখা যায় সেই অঞ্চলের প্রকৃতি ও পরিবেশ আলাদা আবহে তৈরি। আমাদের দেশে যেসব প্রজাপতি দেখা যায়, তার মধ্যে রাজকিঙ্কর, উদয়াবল্লী, সাত ডোরা, নীরদ সিন্ধু, মনমেঘা, কস্তুরী শার্দুল, নীল ডোরা, চোরকাঁটা কমলা, নীল পুনম, কমলা শিখীপর্ণ, বনবেদে, নাবিক, রাইনকশি, হেমশুভ্র, চৈতালি দূত, গোতুম, তিলাইয়া পঞ্চতিলা, তিন্নি, নীল বিজুড়ী, মলয় মসলা উল্লেখযোগ্য।
আমাদের দেশে সিলেটের রাজকান্দি পাহাড়ে যাতায়াত আগে অনেক কষ্টসাধ্য
ছিল। এখন রাস্তাঘাট অনেক উন্নত হওয়ায় সেখানে যাওয়া খুব সহজ হয়েছে। সেখানকার বনে অনেক
মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। রাজকান্দি বনভূমিতে গাছপালা ও অনেক বন্যপ্রাণী বাস
করে। মাটির নিচে রয়েছে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন গ্যাস, তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ
রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।
আমি
আজকে সেই বনভূমির প্রজাপতির জীবনচক্র, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান, প্রিয় খাদ্য, খাদ্যের
উৎস, পানি, কতদিন বাঁচে সে বিষয়ে বলছি। রাজকান্দি আদমপুর বিটের একটি বৃহত্তর অংশ। এই
বন খুব ঘনবসতি ট্রপিক্যাল ফরেস্টে পরিপূর্ণ এবং জীববৈচিত্র্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার।
এখানে এখনও বহু বন্যপ্রাণী আছে, যার কয়েকটি পৃথিবী থেকে বিপন্ন হওয়ার পথে। এই বনভূমির
বিভিন্ন রকমের প্রবেশদ্বার এবং বহিরগমন রাস্তা আছে। আছে জলপ্রপাত এবং পাহাড়ি এলাকা।
এ কারণে প্রকৃতিপ্রেমী এবং পাহাড়রোহীদের জন্য একটি আদর্শ স্থান। স্থানীয় জলাধার আছে,
যা কার্বন শোষণের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করে থাকে।
সম্প্রতি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষকদল আদমপুর ফরেস্ট বিটে প্রজাপতির একটি তালিকা
প্রকাশ করে। এই ডকুমেন্ট অনুযায়ী ২৬৬ প্রজাতির প্রজাপতির মধ্যে ১৪৯ (জেনেরা-Genera)
এবং ৬ পরিবার, পাপিলিও্নাইড (Papilionidae) পিয়ারিডা (Pieridae) নাইম্ফালিডা (Nymphalidae)
লাইকানিডা (Lycaenidae) হেস্পনিডা (Hesperiidae) এবং রাইও ডি নি ডা (Riodinidae) নামে
লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বে ১৮ হাজার ৫০০
প্রজাতির বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি আছে, তার মধ্যে রাজকান্দি ফরেস্টে প্রায় ৫০ প্রজাতির
প্রজাপতির দেখা মেলে। বিপন্ন প্রায় রাজকিঙ্কর প্রজাপতি এই বনে রয়েছে। প্রসারিত
অবস্থায় এক ডানার এক প্রান্ত থেকে অন্য ডানার অন্য প্রান্তের দীর্ঘ ৬৫ থেকে ৭৫ মিলিমিটার।
ওপরের দিকে তামাটে কমলা, এর সামনের ডানার শীর্ষের কালো পাড় পুরুষদের তুলনায় বেশি চওড়া।
পুরুষের ডানার নিচের অংশ ফ্যাকাশে কমলা এবং স্ত্রীরটি ফ্যাকাশে বাদামি কমলা ধূসর, কালো
এবং কয়েকটি লাল দাগ তোপে চিহ্নিত। বাংলাদেশ বন বিভাগের এই প্রজাপতির পোষক গাছ সম্পর্কে
তথ্যের অভাব রয়েছে। জানা গেছে, এই বনে ২৬.৬৯% প্রজাপতির বিপন্নপ্রায়,৩০.০৮% গুরুত্বহীন,
২৩.৬৮% ভালনারেবল ১.৫০ %-এর তথ্যের অভাব এবং ১৮,০৫% মূল্যায়ন করা হয়নি। এই তথ্য পরবর্তী
প্রজাপতি সংরক্ষণ এবং গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রজাপতি
খুব ঠান্ডা আবহাওয়া, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণমুক্ত পরিবেশ পছন্দ করে। ফরেস্ট বন্যপ্রাণী
এবং জীবজগতের জন্য খুব একটা ঠান্ডা স্থান- যা তাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত। তাই সকল
প্রকার প্রজাপতির জন্য এই ফরেস্টে বসবাসের জন্য খুব উপযুক্ত স্থান। যেমন কাদামিশ্রিত
জল, মধু, শিখরযুক্ত ফল, গাছের রস প্রজাপতি মৃত পশু, পচা ফল, রক্ত, পশুপাখিদের মলমূত্র
খেতে পছন্দ করে।
প্রজাপতিদের
খাদ্যের উৎস, অমৃত (নেকটার) সব চেয়ে পরিচিত খাদ্য হচ্ছে নেকটার বা যাকে অমৃত বলা হয়ে
থাকে। অন্য সকল জাতীয় ফুলেও পাওয়া যায়, যা তাদেরকে শক্তির জন্য চিনি দিয়ে থাকে। কিছু
প্রজাপতি গাছ থেকে মিষ্টি রস খেয়ে থাকে। অনেক প্রজাতি যারা রেইন ফরেস্ট তারা পতিত গাছের
রস এবং ক্ষয়ে যাওয়া ফলের রস খায়। পশুপাখির মলমূত্র পুরুষ প্রজাপতি পাখি এবং অন্যান্য
জন্তুর প্রস্রাব ভাইটেল খনিজ পদার্থ ও লবণের জন্য পান করে থাকে।
প্রজাপতি
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পরিবেশে বসবাস করে যদি সেখানে প্রয়োজনীয় খাদ্যের উৎস,
পরিপূর্ণ বয়সের জন্য অমৃত এবং অতিথি প্ল্যান্টের জন্য কেটার পিলার থাকে। সাধারণ বাসস্থান
যেমন ফরেস্টের ভিজা মাটি, তৃণভূমি, শহরের বাগান তারা খাওয়ার এবং ডিম পাড়ার জন্য প্ল্যান্টের
প্রয়োজন হয়। প্রজাপতি অন্যান্য অনুপ্রবেশকারী এবং প্রাণীর হাত থেকে প্রতিরোধ করার জন্য
তারা গাছপালা, জঙ্গল এবং কোনো সময় পাতার নিচে অথবা পাথরের মাঝখানে বসবাস করে।
প্রজাপতি
বিস্ময়কর প্রাণী, যা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া সকল মহাদেশেই দেখা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে
মোট প্রায় ৪০টি জাতীয় পার্ক আছে, তার মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কক্সবাজার, টেকনাফ
জাতীয় পার্ক, ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক, সাতছড়ি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, রেমা কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী
অভ্যারণ্য চুনারুঘাট, লাউয়াছড়া জাতীয় পার্কসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত
হচ্ছে। আমি দীর্ঘ ৭ বছর জাতীয় পার্ক ব্যবস্থাপনার ওপর একজন কনসালটেন্ট ফর সসিয়েল মবিলাইজেশন
হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতায় সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে পারলে দেশের
সকল বনভূমি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
রাজকান্দি
ফরেস্টকে জাতীয় পার্ক ঘোষণা করা হলে এর বাফার জোনে যারা বসবাস করে এবং এই বনের ওপর
জীবিকা নির্বাহ করে তাদেরকে সংগঠিত করে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা যাবে। এলাকার যুবকের
কর্মসংস্থাপন হবে, দেশের অন্যান্য পার্কের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে। ভেজা মাটিতে বিভিন্ন
প্রজাতির প্রজাপতি বাস করতে পারে কারণ, ঘন জঙ্গল ও আর্দ্রতার যোগ হয়। এতে বনের ওপর
নির্ভরতা কমবে এবং বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে।
কমলগঞ্জে এত বড় একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নীরবে পড়ে আছে তাকে নিয়ে আমরা একটুও চিন্তা করিনি। কমলগঞ্জের প্রাকৃতিক সোনাকে খুঁজে বের করে আনতে হবে কমলগঞ্জের জনসাধারণকে। আমাদের উন্নয়ন শুরু করতে হবে। তাই সকল ভেদাভেদ ভুলে আজীবন উপেক্ষিত থেকে নিজেদের উন্নয়নের জন্য কিছু করি। আজও সরকার থেকে রিলিফের চাল দেওয়া হয় আমাদেরকে, তার কারণ, আমরা নিজেই। নির্ভরশীলতা ত্যাগ করুন। তাই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ- রাজকান্দি ফরেস্টকে একটি ‘জাতীয় পার্ক’ হিসেবে ঘোষণা করুন। দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশকে জীববৈচিত্র্যের সূতিকাগার হিসেবে গড়ে তুলুন।
মতি লাল দেব রায়
কলাম লেখক ও সংগঠক