উচ্চ রক্তচাপ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২২ এএম
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই এটি হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, বৃক্ক বা কিডনির বৈকল্য এবং অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। একসময় উচ্চ রক্তচাপকে ধরা হতো মূলত উচ্চ আয়ের দেশগুলোর জীবনধারাজনিত রোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে ভিন্নকথা ইদানীং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও দ্রুত বাড়ছে এই রোগের প্রকোপ। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ ধনী দেশগুলোতে কমে এখন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বেশি হচ্ছে। এতে বলা হয়, ৩০-৭৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ৩৪ বছরে বিশ্বে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ কোটি থেকে ৭৫ কোটি বেড়ে বর্তমানে তা ১৪০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ২৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাজধানীর মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বিএমএ ভবনে ‘বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, অগ্রগতি, বাধা এবং করণীয়’ শীর্ষক কর্মশালায় বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্বাভাবিক
অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের রক্তচাপের পরিমাপ ১২০/৮০ মিমি পারদচাপ ধরা
হয়ে থাকে। ১৪০/৯০ মিমি পারদচাপ বা তার বেশি হলে বুঝতে হবে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা। অত্যধিক উচ্চ রক্তচাপ ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি,
বিভ্রান্তি, উদ্বেগ, বুকে ব্যথা এবং পেশি কম্পনের কারণ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ অর্থাৎ স্ট্রোক এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত এমনকি বিকল হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বৈষম্যের এক উদ্বেগজনক চিত্র।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তৃণমূল পর্যায়ে
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি এ খাতে টেকসই
অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য জীবন বাঁচানোসহ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধ
সম্ভব।
২৪ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে উচ্চ
রক্তচাপ বাড়ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি
সম্পর্কে বলা হয়, দেশে প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভেতে
বলা হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে। ডব্লিউএইচও’এর
চলতি বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ৩০-৭৯ বছর বয়সিদের অর্ধেকই
তাদের উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে জানে না, যা পুরুষের ক্ষেত্রে ৫৩ ও নারীদের ক্ষেত্রে ৪৫
শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৯ শতাংশ। নিয়মিত
ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের
হার প্রতি ৭ জনে ১ জন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ
হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫২ শতাংশের ৪৮ শতাংশ পুরুষ, ৫৬ শতাংশ নারী।
বলা হয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে নগরায়ণ
ও জীবনধারার পরিবর্তন উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষ
কম শারীরিক পরিশ্রমী কাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, বাড়ছে ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত লবণযুক্ত
খাবারের ব্যবহার। একই সঙ্গে ধূমপান, মাদক সেবন এবং মানসিক চাপ সব মিলিয়ে ঝুঁকি বহুগুণ
বেড়ে যাচ্ছে। দুঃখজনক সত্য হলো, এখনও সচেতনতা বা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেভাবে
গড়ে ওঠেনি। আরেকটি বড় সমস্যা হলো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ঘাটতি। উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ওষুধ সহজলভ্য হলেও দরিদ্র ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অনেকেই জানেন
না, তারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। যারা জানেন, তাদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যসেবার
ব্যয় ও ওষুধের অপ্রাপ্যতার কারণে নিয়মিত চিকিৎসা বা ওষুধ চালিয়ে যেতে পারেন না। ফলে
নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ নীরবে শরীরের ভেতর ক্ষতি করে চলছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত
ও সঠিক ব্যবস্থাপনা অনেক দেশে এখনও অপ্রতুল। স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই সংকট একে আরও ঘনীভূত
করছে। রয়েছে প্রশিক্ষিত জনবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবস্থার অভাবও।
উপরন্তু, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় অসংক্রামক রোগÑ
বিশেষ করে, উচ্চ রক্তচাপÑ নীতিনির্ধারণে পিছিয়ে পড়েছে।
আমরা মনে করি, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমন্বিত
উদ্যোগ জরুরি। এই ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে লবণ গ্রহণ কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
ও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম উৎসাহিত করতে গণসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। প্রাথমিক
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনা খরচে বা স্বল্প খরচে রক্তচাপ পরিমাপ ও পরামর্শের ব্যবস্থা
নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি নিতে
হবে। এখনই এই নীরব মহামারির এই থাবা রুখতে হবে। তাই সময় এসেছে উচ্চ রক্তচাপকে জাতীয়
ও বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের শীর্ষে স্থান দেওয়ার।