পর্যবেক্ষণ
ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:০৫ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:০৯ এএম
বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি নাগরিককে প্রবীণ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যান্য দেশে কিছু উন্নত দেশে এই বয়সসীমা ৬০ বা ৬৫ বছর ধরা হয়, যা দেশ অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। আইনি প্রেক্ষাপটে ভারতের মতো কিছু দেশে নির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি নাগরিকদের প্রবীণ নাগরিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই বয়সের পর তারা সমাজে বিশেষ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
গণমানুষের বাস্তব
জীবনে বার্ধক্যের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় আমাদের কারও নেই। আজকে যারা যুবক
তারা আগামী দিন প্রবীণ। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন একটা নির্দিষ্ট
সময়ের জন্য। মানুষের দুনিয়ার জীবন হলো জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়। অবশ্যই আমাদের
আরও একটি জীবন রয়েছে, যার নাম পরকালীন জীবন। যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। দুনিয়ার
জীবনটা হলো ক্ষণকালীন এবং পরকালীন জীবনের শস্যক্ষেত্র। পরকালের জীবনই প্রকৃত জীবন,
অনন্ত জীবন। মানব জীবনচক্র মূলত কয়েকটি পর্যায় ক্রমিক স্তরের সমষ্টি। শৈশব, কৈশোর,
যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য এই পাঁচটি স্তরে মানুষের জীবনকে ভাগ করা হয়েছে। প্রকৃতির
স্বাভাবিক নিয়মেই জীবনের এক একটা স্তর অতিক্রম করে অন্য স্তরে উপনীত হতে হয়। জীবনচক্রের
সর্বশেষ ধাপ বা পরিণতি হলো বার্ধক্য বা প্রবীণত্ব।
মানব জীবনে বার্ধক্য বা প্রবীণত্ব হচ্ছে সবচেয়ে নাজুক ও স্পর্শকাতর অবস্থা। শুধু বয়সের কারণে বা বার্ধ্যকের কারণে প্রবীণরা গুরুত্বহীন অবস্থায় অবমূল্যায়নের জীবন ধারণ করবেন, তা এই সচেতন ও সভ্যসমাজে হতে পারে না। তারা অবজ্ঞা-অবহেলায় থাকতে পারেন না। আধুনিক ও নবীন সমাজ আমরা সকলে দায়বদ্ধ প্রবীণ সমাজের নিকট। প্রবীণরাই আমাদের জন্ম দিয়েছেন, তারাই আমাদের শিশুকাল, শৈশবকাল ও কৈশোরকালের লালন-পালনকারী। তাদের কারণেই আমরা পৃথিবীর আলো-বাতাসে বড় হয়েছি, আমাদের সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র এমনকি পৃথিবীটা বাসযোগ্য হয়েছেÑ এই প্রবীণ মানুষগুলোর পরিশ্রমে, তাদের প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তায়। তাদের আত্ম-উৎসর্গিত জীবনের চরম সুবিধাভোগী আমরাই। প্রবীণদের জীবনকাল বিসর্জনের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে আমাদের এই আধুনিক উন্নতমানের সুন্দর সমাজব্যবস্থা। প্রবীণরা হলোÑ এই সুন্দর জীবন ও সুন্দর সমাজব্যবস্থার রচয়িতা। তাদের প্রতি কোনো বৈষম্য নয়, কোনো করুণা নয়, কোনো অবহেলা নয় বরং প্রদর্শন করতে হবে নৈতিক, আদর্শিক ও ধার্মিক মহা প্রতিদান। তারাই আমাদের জীবনের শত প্রেরণার নিরন্তর উৎস, জীবন্ত কিংবদন্তি। একজন সক্ষম মানুষ তার জীবনের পুরোটা সময় শেষ করে দেয় যে পরিবারের জন্য, জীবনের শেষ সময়ে সেই পরিবারে থাকাটা তার নৈতিক অধিকার। এটা তাদের প্রতি কোনো দয়া নয়। কোনো অনুগ্রহ নয়। সুতরাং পরিবারই হচ্ছে প্রবীণদের আসল ঠিকানা। অথচ বাবা-মা প্রবীণ হয়ে গেলে আজকের সন্তানরা তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে বাবা-মায়ের মনের যে লুকানো আকুতি তা সন্তানরা দেখতে পায় না।
মানবজীবনকে সুন্দর
থেকে সুন্দরতর করার অভীষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার
ভিড়ে বিশ্বময় মনুষ্যত্বের মৌলিক উপাদানগুলো আজ বিলীনের পথে। পরিণতিতে প্রচণ্ড রকম মেধাবী
এবং দক্ষতায় শীর্ষে অবস্থানকারী এ মানুষ জীবনের একপর্যায়ে সবার থেকে আলাদা হয়ে একান্তই
নিঃসঙ্গ জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও
একাংশ, বিশেষভাবে যৌবনকাল পাড়ি দেওয়া সিনিয়র সিটিজেনদের এ পরিণতি দিবালোকের মতোই স্পষ্ট।
চলতি সপ্তাহে দেশের কিছু শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের ভয়াবহ
সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একটি পত্রিকার ‘জাপানে গত ৬ মাসে নিজবাড়িতে নিঃসঙ্গ
অবস্থায় মারা গেছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ’ শিরোনামে সংবাদটি দেশের বিবেকবান মানুষের
মনে নাড়া দিয়েছে। জাপানের জাতীয় পুলিশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে
মার্চ পর্যন্ত নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা ২১ হাজার ৭১৬, যা আনুপাতিক হারে
বছরে দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৮৬৪। একাকী জীবনের নির্মমতায় সৃষ্ট বিভিন্ন শারীরিক বিপর্যয়ে
এ বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর হার জাপানের ২০২৩ সালের মৃত্যুর পরিসংখ্যান অনুযায়ী পঞ্চমতম।
কানাডা ও আমেরিকায়
সিনিয়র সিটিজেনরা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন, যেমন মাসিক পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা
এবং কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড়। কানাডায় সিনিয়র সিটিজেনরা বৃদ্ধ সুরক্ষা পেনশন, কানাডা পেনশন
প্ল্যান থেকে মাসিক সুবিধা এবং প্রাদেশিক সহায়তার অধীনে আবাসন ফি-তে সাহায্য পেতে পারেন।
আমেরিকায়, নির্দিষ্ট বয়স এবং আয়ের ওপর ভিত্তি করে কর ছাড় পাওয়া যায়।কানাডায় সুবিধার
মধ্যে পেনশনÑ ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি নাগরিক এবং স্থায়ী বাসিন্দারা প্রতি মাসে একটি
নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেতে পারেন, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে। যারা কানাডা পেনশন
প্ল্যান (ঈচচ)-তে অবদান রেখেছেন, তারা ৬০ বছর বয়স থেকে মাসিক অবসরকালীন পেনশন পেতে
পারেন। প্রাদেশিক সহায়তায় যেসব সিনিয়র সিটিজেনের পর্যাপ্ত সঞ্চয় নেই, তাদের অবসরকালীন
বাড়ির ফি মেটাতে প্রদেশগুলো বিভিন্ন সহায়তা প্রোগ্রাম প্রদান করে। এককালীন সহায়তায়
যোগ্যতা অনুযায়ী, কিছু সিনিয়র সিটিজেন এককালীন অর্থ সহায়তাও পেতে পারেন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায়
কানাডায় স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যানের আওতায় সিনিয়র সিটিজেনরা চিকিৎসা সেবা পান।
আমাদের দেশের বাস্তবতা হচ্ছে, দায়িত্ব এবং আন্তরিকতা
থাকলেও কর্মব্যস্ততার কারণে বহু সন্তান বাবা-মায়ের যত্ন নিতে পারেন না। আবার অনেকে
নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে বিদেশে গিয়ে সন্তানের সঙ্গে থাকতে চান না। সামাজিক
বাস্তবতা, মানসিকতা ও পারিবারিক দূরত্বের কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের
সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ফলে তাদের বার্ধক্য আরও কষ্টদায়ক হয়ে উঠছে। মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা
আমাদের সমাজের বোঝা নন, তারা অতীতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে অসামান্য
অবদান রেখেছেন। আজ তারা দ্বিতীয় শিশুর মতো যত্ন ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তাই প্রবীণদের অবহেলা না করে, মর্যাদার সঙ্গে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও মানবিক
দায়িত্ব। অসহায় প্রবীণদের বিষয়টি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারের
পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান, দানশীল ও সচেতন মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ
প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, আজ প্রবীণদের জন্য যে দাবি তোলা হচ্ছে, কাল সেটাই তাদের
নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়াবে। প্রবীণদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই আসলে
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিত করা। কিন্তু
দেশের বাস্তবতায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। কবে পরিবর্তন আসবে, তা কেউ জানে না।
এই ক্ষেত্রে অনেক সময় বৃদ্ধাশ্রমের প্রসঙ্গটি তুলে
ধরেন অনেকেই। আমরা মনে করি, শুধু বৃদ্ধাশ্রম নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ ও আনন্দময় আবাসন
ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এ জন্য প্রতিটি উপজেলায় জন্য প্রবীণবান্ধব আবাসন গড়ে তোলা
যেতে পারে। যেখানে থাকবে হাসপাতাল ও নার্সিং সেবা, মানসম্মত খাবার, বিনোদনের
ব্যবস্থা, প্রার্থনার স্থান, খেলার মাঠ, ব্যায়ামাগার এবং আরামদায়ক আবাসন। একই
বয়সের মানুষ একসঙ্গে থাকার কারণে প্রবীণরা এখানে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সময় কাটাতে
পারবেন। ধনী প্রবীণরা খরচ বহন করে থাকতে পারবেন, আর গরিব ও অসহায় প্রবীণদের জন্য
থাকবে সরকারি খরচে থাকার সুযোগ। প্রয়োজনে সন্তানরা বিদেশ থেকে এসে কিছুদিন
বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে থাকতে পারবেন। এতে একদিকে প্রবীণদের জীবনে আনন্দ আসবে,
অন্যদিকে সন্তানদের মধ্যেও থাকবে মানসিক শান্তি।
তবে আশার কথা, বয়স্ক তথা সিনিয়র নাগরিকদের কল্যাণেÑ বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম গঠিত হয়েছে, নেতৃত্ব প্রদানে কাজ করছেনÑ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। কাজেই দেশ ও জাতির স্বার্থে আশা প্রকাশ করছি বর্তমান সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল হিসেবে ষাটোর্ধ্ব বয়সের নাগরিকদের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা অতীব জরুরী বিষয়; বিশেষ করে স্বল্প ভাড়ায় সব শ্রেণির যাতায়াত, হাসপাতালে সাশ্রয়ী মূল্যে পৃথক চিকিৎসাসেবাসহ বাসস্থান প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের সহানুভূতির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবীণ নাগরিকদের জীবনের শেষান্তে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির ছোঁয়া লেপনে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমীপে সহৃদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন