বড়দিন
পপি দাস হাসদাক
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৪০ এএম
স্বাভাবিকভাবে বলতে গেলে বড়দিন হলো বছরের ৩৬৫টা দিনের মধ্যে যে দিনটি অন্যান্য দিন থেকে বেশি দীর্ঘ স্থায়ী হয়ে থাকে তাকে বড়দিন বলে। কিন্তু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বড়দিন বা ক্রিসমাস একটি বাৎসরিক খ্রিস্টের উৎসব। ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন। খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা যিশুর জন্মদিন উৎসবটি খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করে থাকে প্রতিবছর। এটি মূলত খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও বর্তমানে এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এ দিনটিকে ঘিরে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। যেমন : কেউ কেউ
মনে করেন, এই দিনটি একটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব। অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ
অয়নান্ত দিবসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মজয়ন্তী পালনের প্রথাটির
সূত্রপাত হয়। খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসীরা বারো দিনব্যাপী এই খ্রিস্টমাসটাইড অনুষ্ঠানের
সূচনা দিবস পালন করে থাকে। আমরা বাঙালি, বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। ছয় ঋতুর বৈচিত্র্যময়
এই দেশটি। রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের সম্প্রদায় মিলে একত্রে বসবাসের এক অন্য রকম ইতিহাস।
সেজন্য বলে, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এই প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে সকলে একজন আরেকজনের
উৎসবে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখি এবং একজন আরেকজনের উৎসবে আনন্দ-ফুর্তি করে থাকি।
বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই বড়দিন একটি প্রধান উৎসব তথা সরকারি ছুটির
দিন হিসেবে পালিত হয়। এমনকি অ-খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশেও মহাসমারোহে বড়দিন
উদযাপিত হতে দেখা যায়। কয়েকটি অ-খ্রিস্টান দেশে পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসনকালে বড়দিন
উদযাপনের সূত্রপাত ঘটেছিল।
যিশুর জন্মের দ্বারা ঈশ্বর তাঁর শাস্ত্রের বচন পূর্ণ করেছিলেন। তাই
আজও আমরা জাগতিক মানুষ হিসেবে যিশুখ্রিস্টকে পরিত্রাণ হিসেবে মানি ও তার জন্মদিনটিকে
পালন করি।
যিশুর জন্ম হয়েছিল হেরোদ রাজার সময়। ওই সময় তিনজন পণ্ডিত আকাশের তারা
গণনা করছিলেনÑ হঠাৎ একটা নতুন তারা দেখতে পেয়ে তারা সোজা চলে যান রাজা হেরোদের কাছে।
তারা তাদের মূল্যবান উপহারÑ স্বর্ণ, কুন্দুরু ও গন্ধরস সোজা চলে গিয়েছিলেন রাজদরবারে।
কিন্তু রাজদরবারে গিয়ে অবগত হন সেখানে কোনো রাজপুত্র জন্মগ্রহণ করেননি। তারা বাইরে
বের হতে দেখেন আকাশে ওই নব তারাটি। সেই তারা অনুসরণ করে যিশুকে দেখতে পান এবং পণ্ডিতগণ
যিশুকে প্রণাম করেন ও উপহার সামগ্রী তার চরণে রাখেন।
তাঁর জন্মের এ শুভ দিনটিকে স্মরণ করতেই এই উৎসব পালিত হয়।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলন
খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে
অংশ নেন। কীর্তন- প্রার্থনা বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। ছোট-বড় সকলে মিলে বড়দিনের কীর্তন
বা ধর্মীয় গান গায়। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও এই উৎসবে শামিল হন।
উদযাপন পদ্ধতি : সাজসজ্জা
বাড়ি ও চার্চে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন আলোকসজ্জা,
তারার ঝাড়, রঙিন কাগজ দিয়ে নানা ধরনের নকশা দিয়ে ঘর সাজানো হয়। তবে লাল-সাদা রঙের
প্রাধান্য বেশি দেখা যায়।
সান্তাক্লজ
শিশুরা বিশ্বাস করে যে, সান্তাক্লজ রাতে এসে তাদের জন্য নানারকম উপহার
সামগ্রী নিয়ে আসে। এই উৎসব ঘিরে কত চরিত্র! কত গল্প! তার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়- সান্তাক্লজ।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অপরূপ এক কিংবদন্তি চরিত্র সেইন্ট নিকোলাস। সাদা লম্বা দাড়ি,
সাদা চুল, লাল পোশাক আর হাসিমাখা মুখে তিনি যেন ছোটদের আনন্দ নিয়ে আসেন। ‘জিঙ্গল বেলস’-এর
সুরে ঝোলা ভরা উপহার নিয়ে বাচ্চাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া তার অন্যতম কাজ।
উপহার ও কেক
এই দিনে পরিবার-বন্ধুদের মধ্যে নানা ধরনের উপহার বিনিময় করা হয়।
যেমন, নতুন নতুন জামাকাপড়, শুভেচ্ছা কার্ড, ডায়েরি। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের পিঠা, বিশেষ
কেক, পুডিং, ডোনাট, চকলেট ইত্যাদি।
মূল বার্তা
বড়দিন কেবল একটি উৎসব নয়, এটি ত্যাগ, তিতিক্ষা, ভালোবাসা ও ঐক্যের
প্রতীক। এই দিনটি মানুষকে পরোপকার, দয়া ও শান্তির বার্তা দেয় এবং দরিদ্রদের সাহায্য
করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
আনন্দে, আলোয়, আর ভালোবাসায় ভরা এক অপূর্ব সময়। খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা সারা বছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকে। বড়দিন শুধু সাজগোজ, উপহার বা উৎসবের টেবিলের নানা মুখরোচক খাবারের নাম নয়। এটি এক গভীর মানবিকতার, দানশীলতার ও ত্যাগের স্মারক। তাই আমাদের চারপাশে যারা গরিব, দুঃখী, সুবিধাবঞ্চিত, নিপীড়িত, অসহায় তাদের মুখে হাসি ফোটানোর অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে আমাদের যিশুখ্রিস্ট খুশি হবেন। তার কাছে সকলেই সমান। তাই তিনি নিজে নিচু হয়ে সকলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তাঁর সন্তান হিসেবে আমাদেরও তাঁর পথ অনুসরণ করা উচিত। বড়দিন বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। এটি সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে একত্রিত করে এক আনন্দময় ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
পপি দাস হাসদাক
ভাইস প্রিন্সিপাল, টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দিনাজপুর