× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রেলপথ আধুনিকায়ন

চলুক রেলগাড়ি ঝমাঝম

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৩২ এএম

 চলুক রেলগাড়ি ঝমাঝম

রেলগাড়ি হচ্ছে স্থলপথে সবচেয়ে নিরাপদ, দ্রুতগামী, সাশ্রয়ী পরিবেশ-বন্ধু এবং বেশি যাত্রী ও মালবহনে সক্ষম যান। এই যে আমরা নদী-নালা-খাল-বিল বেঁধে ফেলে, জমি নষ্ট করে রাস্তা বানাচ্ছি, এই যে বাস-মিনিবাসে সড়ক ভরিয়ে দেশটাকে লোহালক্কড়ের জঞ্জালের ভাগাড় বানাচ্ছি, এই যে জ্বালানি তেল-গ্যাস পুড়িয়ে পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছি, এই যে রোজ সড়ক দুর্ঘটনায় অগণিত মানুষ মারছি, পঙ্গু করছি এবং এই যে যানজটের সময় ও কর্মঘণ্টা নাশ করছি এসবের একটাই ইতিবাচক বিকল্প হচ্ছে রেল। কায়েমি স্বার্থের কাছে নত হয়ে আমরা সে রেলকে ধ্বংস করেছি। রেলের উন্নতি, আধুনিকায়ন ও বিকাশ আমরা চাইনি। দুর্নীতি, লুট-লোপাট, অনিয়ম ও অদক্ষতায় আমরা রেলকে অকেজো ও ব্যর্থ হতে দিয়েছি। জাতীয় স্বার্থে এ ধারা ঘুরিয়ে দেওয়া দরকার।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়ে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কথা জানা গেল। এই রুটে যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে চট্টগ্রাম-দোহাজারী পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রেলপথ উন্নয়ন এবং নতুন বাইপাস নির্মাণে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। ২২ ডিসেম্বর, সোমবার ঢাকায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং এডিবির মধ্যে এ-সংক্রান্ত ঋণচুক্তি সই হয়। এটি খুব বড় উদ্যোগ নয়, তবে একে আমরা আশার আলোকবিন্দু হিসেবে দেখতে চাই।

২৩ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘এডিবির ঋণে আধুনিক হচ্ছে রেল যোগাযোগ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। চুক্তি ও প্রকল্প নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত বিদ্যমান রেললাইন আধুনিকায়ন এবং পাহাড়তলী থেকে ঝাউতলা স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ২.৫ কিলোমিটার নতুন বাইপাস লাইন নির্মাণ করা হবে।

উল্লেখ্য, ঢাকাগামী বা ঢাকা-কক্সবাজার রুটের ট্রেনগুলো বর্তমানে চট্টগ্রাম স্টেশনে থেমে রিভার্স নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। বাইপাস চালু হলে সরাসরি ট্রেন চলবে। যাত্রাপথেও সময় কমে আসবে। আমরা মনে করি, এই রেলপথ আধুনিকায়ন শুধু দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহরকে যুক্ত করবে না, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন ও আঞ্চলিক সংযোগকে নতুন গতি দেবে। অবহেলিত এই রেলপথ আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শীÑ এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় উঁচু করে রেলপথ নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ঢাল স্থিতিশীলতার মতো জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থাপন করা হবে কম্পিউটারাইজড ইন্টারলকিং সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ডুয়েলগেজ রেললাইন। রুটে তিনটি স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হবেÑ যেখানে নারীসহ সব যাত্রীর জন্য অধিক নিরাপদ সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে। প্রকল্পে ৩০টি জ্বালানিসাশ্রয়ী মিটারগেজ লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন এবং রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম কেনা হবে, যা জ্বালানি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ কমাবে। তদারকি, লোকোমোটিভ পরিচালনা এবং রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে। পাশাপাশি জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিংয়ের জন্য বিশেষ কৌশল প্রণয়নের কথাও বলা আছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে প্রকল্পকে বাংলাদেশের পক্ষে লাভজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে, অপারেশন পর্যায়ে ২৫ বছর ধরে যাত্রা সময় সাশ্রয় এবং সড়ক পরিবহনের পরিবর্তে রেল ব্যবহারে পরিচালন ব্যয় কমার সুফল ধরা হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মুনাফার হার ধরা হয়েছে ১২.৫ শতাংশ, যার গ্রহণযোগ্য সীমা ৯ শতাংশের ওপরে। তবে আর্থিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আর্থিক মুনাফা নেতিবাচক এবং মূলধনি বিনিয়োগের খরচ রাজস্ব দিয়ে কাভার করা সম্ভব নয়। ফলে প্রকল্প পরিচালকের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় বহনের সক্ষমতাই মূল বিবেচ্য ধরা হয়। বিশ্লেষণ অনুযায়ী অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় কাভার হবে। এতে প্রায় অর্ধেক ব্যয় সরকার বাজেট বরাদ্দ দিয়ে বহন করবে। বাজেট কমে গেলে সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ঝুঁকি বাড়বে, যার ঝুঁকি রেটিং ‘উচ্চ’ ধরা হয়েছে। এ ঝুঁকি কমাতে সরকারকে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আয় বাড়াতে ভাড়া সমন্বয় এবং দক্ষতা উন্নয়নে স্বচ্ছতা জরুরি।

নানা কারণে কক্সবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর। সেখানে যাতায়াতের প্রধান ভরসা সড়কপথ। ফলে সড়কে যানজট, দুর্ঘটনা ও সময়ক্ষেপণ ছিল নিত্যসঙ্গী। আধুনিক রেলপথ চালু হলে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত হবে। পর্যটকদের জন্য এটি হবে বড় আকর্ষণ; একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা সহজ হবে। পর্যটন খাতের বিকাশ মানেই হোটেল, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের প্রসার, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক সংযোগ। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে উন্নত রেল যোগাযোগ হলে পণ্য পরিবহন সহজ হবে, কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছবে। ভবিষ্যতে এই রেলপথকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও ভাবা যায়।

এ কথা সত্য যে, এই ধরনের বড় প্রকল্পের সঙ্গে যেমন সম্ভাবনা থাকে তেমনি থাকে চ্যালেঞ্জও। ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত প্রভাব, ব্যয় বৃদ্ধি ও কাজের ধীরগতিÑ এসব ঝুঁকি এড়াতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ানুবর্তিতা, স্থানীয় জনগণের স্বার্থরক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো উন্নয়নের সুফল ম্লান হয়ে যেতে পারে।

আমরা মনে করি, এই আধুনিকায়ন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রকল্প দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এখন প্রয়োজন সদিচ্ছা, জবাবদিহিতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে এই রেলপথ সত্যিকার অর্থেই জনগণের কল্যাণে আসে।

আমরা চাই, একটি প্রকল্প কেবল নয়। সারা দেশে রেলের দক্ষতা, সেবার যোগ্যতা ও বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত করে আধুনিকায়ন করা হোক। দুর্নীতি বন্ধ হোক। রেলের গাড়ি স্থলপথে হোক প্রধান বাহন, মূল ভরসা। শৈশবের সেই স্মৃতিময় ছড়ার ছন্দে চলুক রেলগাড়ি ঝমাঝম।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা