পর্যবেক্ষণ
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:১৯ এএম
বাংলাদেশ আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট উন্নয়ন বনাম অনুন্নয়নের নয়, ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতারও নয়। বরং এটি চেতনা ও আকিদার নামে রাষ্ট্র ও সমাজকে বিভক্ত করে ফেলার রাজনীতি বনাম মানুষের বাস্তব জীবনঘনিষ্ঠ প্রয়োজনের রাজনীতির দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমাজকে টেনে নেওয়া হয়েছে পরিচয়ভিত্তিক ও বিশ্বাসকেন্দ্রিক সংঘাতের দিকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন রাজনীতি মানুষের বাস্তব প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চেতনা বা আকিদাকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার বানায়, তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয় এবং সমাজ ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্র টিকে থাকে নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই, সুনাগরিক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে, কোনো একক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নয়।
বাংলাদেশের
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও প্রকট। কর্মসংস্থানহীন তরুণ, দ্রব্যমূল্যের চাপে নাকাল জনগণ, ভেঙে পড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা এসব বাস্তব
সংকটের সমাধান কেবল
চেতনার
স্লোগানে কিংবা আকিদার হুংকারে হয় না। হয় দায়িত্বশীল নীতিমালা প্রণয়ন, ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টার
মাধ্যমে। ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, মানুষের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও মর্যাদার
দাবিতেই কেন্দ্রীভূত হয়; বিভাজনের
রাজনীতি সেই দাবিকে বিলম্বিত করে মাত্র। এই কারণে আজকের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আসলে আদর্শের সংঘাত
নয়, বরং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশ্নে হওয়া উচিত।
আমাদের
চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, নানা
চেতনা ও আকিদা নিয়ে চিৎকার আর গুঞ্জরণের অভাব নেই। সভা-সমাবেশ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশনের টকশো সবখানেই নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষের
উচ্চকণ্ঠ
অবস্থান। নানা কায়দায় মিথ্যা তথ্য আর তত্ত্বে একে অন্যের মতকে অস্বীকার অথবা ভ্রান্ত প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় মত্ত। কিন্তু জাতি ও রাষ্ট্রের
সমস্যা সমাধানে কাজের জায়গায় রয়েছে ভয়াবহ রকমের শূন্যতা। শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত ও প্রশাসনিক অবক্ষয়, স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য ও অনিয়ম, কর্মসংস্থানের সংকট ও অব্যবস্থাপনা, ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতা, প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও জবাবদিহির অভাব এবং সর্বস্তরে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপÑ এসব মৌলিক প্রশ্নে
রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলো যতটা নীরব, মতাদর্শের
প্রশ্নে তারা ততটাই সোচ্চার ও সরব। এই বৈপরীত্য কেবল অদক্ষতার নয়, এটি এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত বিচ্যুতি।
বাংলাদেশের
মানুষ আজ আর রাজনৈতিক বক্তব্য বা স্লোগানে সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। মিথ্যের
রাজনৈতিক ব্যবসাবেসাতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে যে, কথার প্রলোভনে ভুললে
রাজনৈতিক নেতাদের উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা আর বাস্তব জীবনে তার ফলাফল থেকে তাদেরকেই ভুগতে
হবে। তাই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে তাদের পরিমাপ করে দেখতে হবে, নেতাদের ও তাদের দলের অতীতে
ও বর্তমানে কথা ও কাজে মিল বা অমিল কতটুকু হতে পারে। তাই আজ সাধারণ মানুষ সরাসরি
প্রশ্ন করছেÑ কেন দেশের শিক্ষিত যুবসমাজ বেকার ঘুরে বেড়ায়? কেন দ্রব্যমূল্য তাদের
নাগালের বাইরে চলে গেছে? কেন বিচার পেতে দেশের সাধারণ নাগরিকদের বছরের পর বছর
অপেক্ষা করতে হয়? কেন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসন নাগরিকের সেবক না হয়ে
ক্রমে প্রভু হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নগুলো কেবল আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; এগুলো আসলে রাষ্ট্রের নৈতিক
ভিত্তির প্রশ্ন। কারণ যে রাষ্ট্র তার তরুণদের কাজ দিতে পারে না, নাগরিককে ন্যায্যমূল্যে
খাদ্য-রসদ সরবরাহ করতে ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র কাগজে-কলমে
শক্তিশালী হলেও বাস্তবে নিতান্তই দুর্বল।
আমাদের
এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, জনগণের মনের এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো চেতনার গ্রন্থে
নেই, কোনো আকিদার বয়ানেও নেই।
এগুলোর সমাধান পাওয়া যায় কেবল সুশাসনে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নৈতিক নেতৃত্বে। বাঙালি
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, উন্নয়ন কেবল আয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি মানুষের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত
গ্রহণের স্বাধীনতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া। সেই সক্ষমতা নিশ্চিত না হলে স্লোগান যতই
জোরালো হোক, মানুষের জীবন বদলায় না। আজকের বাংলাদেশে জনগণ সেই
বাস্তব পরিবর্তনটাই দেখতে চায়। তারা এমন রাষ্ট্র চায়, যেখানে প্রশাসন ক্ষমতার
প্রদর্শক নয়, বরং নাগরিক সেবার মাধ্যম; যেখানে বিচার বিলম্বিত নয়, দ্রুত, ন্যায়সংগত ও কার্যকর এবং
যেখানে নেতৃত্বের মাপকাঠি বক্তৃতার তেজ বা গলাবাজি নয়, বরং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান
ইতিবাচক পরিবর্তন।
আমাদের
মনে রাখতে হবে যে, ফলেই গাছের আসল পরিচয়। কেউ
কী বিশ্বাস করে, তা তার মুখের বুলি বা নানা
ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা দলীয় পরিচয়ের
ঘোষণায় নয়; তার কাজেই প্রকাশ পায় সে
আসলে কিসের ধারক ও বাহক। নৈতিকতা, দেশপ্রেম
বা মানবিকতার প্রকৃত মাপকাঠি বক্তৃতার মঞ্চের চিৎকার বা হুঁশিয়ারিতে নয়, ব্যক্তিমানুষের দৈনন্দিন আচরণে ও তার দৃশ্যমান
অব্যাহত কর্মে। একজন মানুষ ধর্মপ্রাণ হয়েও দুর্নীতিবাজ হতে পারে, আবার ধর্মনিরপেক্ষতার উচ্চকিত স্লোগান দিয়েও
স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়, বরং তার অহরহ উদাহরণ আছে আমাদের দৈনন্দিন চর্যায়ই।
দর্শনের ভাষায় একে বলা যায়, গুণের বাস্তব পরীক্ষা। কেউ যদি ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের কথা বলে, তবে তার নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যক্তিগত আচরণে তার
প্রতিফলন থাকতে হবে। নইলে বিশ্বাস পরিণত হয় কেবল প্রতীকী পুঁজিতে, নেতার আদর্শে কাজ না করে নেতার মাজারে পুষ্প অর্পণে
দিন কাটে দলের নেতা-কর্মীদের। আর সেই প্রতীকী পুঁজি একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত
হলেও তা কখনোই রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয় না।
স্বৈরাচারমুক্ত
ও বৈষম্যহীন জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হলো, কোনো বিশেষ চেতনা বা আকিদাকে ব্যবহার করে দেশের
জনগণকে শত্রু-মিত্রে ভাগ করা। এতে কেবল সমাজ বিভক্ত হয় না, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিপরীতে গণ-ঐক্যও ভেঙে পড়ে।
ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, কোনো জাতি যদি অভ্যন্তরীণ বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে
বিশ্বাস বা চেতনাকে ব্যবহার করে, তাহলে
তার স্থিতিশীলতা ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী
সমাজে, যেখানে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি
ও রাজনৈতিক পরিচয় বৈচিত্র্যময়, সেখানে
বিভাজন আরও ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে একমাত্র টেকসই পথ হলো
রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’কে ধারণ, লালন ও প্রতিষ্ঠা করা। এটি
মানে ভিন্নমত উপেক্ষা করা নয়, বরং
ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন জাতিসত্তার পরিচয় স্বীকার করে রাষ্ট্রীয়
স্বার্থে সম্মিলিতভাবে কাজ করা।
দায়িত্বশীল
নাগরিকত্ব কেবল অধিকার নয়, এটি
কর্তব্যের প্রতিফলনও বটে। নাগরিক তার ছোট বা বড় কোনো স্বার্থ নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে। এতে
আত্মবিশ্বাস ও গর্বের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে, যা কোনো চেতনাবাজি বা আকিদাবাজি দিয়ে
সম্ভব নয়। ফরাসি দার্শনিক ও নাট্যকার জাঁ-পল সার্ত্রের ভাষায়, স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি দায়িত্বের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। আমাদের
রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সামাজিক
সংহতি ও ন্যায়পরায়ণতা নির্ভর করে এই দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের প্রবর্তনের ওপর।
বাংলাদেশে এই চেতনা প্রতিষ্ঠা হলে নাগরিকরা শুধু চেতনার উচ্চকণ্ঠ নয়, কর্মের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি
অর্জন করবে। এ কারণে আজকের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয়তার লক্ষ্য একটাই বক্তৃতা নয়, দায়িত্বশীল কর্মমুখী নাগরিকত্ব, যা ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাসী ও গর্বিত আর সমাজকে
শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তুলবে।
দেশের
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা যদি সত্যিকারের পরিবর্তন চাই, তবে এখনই আমাদেরকে কাজ শুরু করতে হবে। অধঃপতনের যে
অতলে আমরা নিমজ্জিত হয়েছি, সেখান
থেকে উঠে আসতে শুধু সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাই নয়, দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, তরুণ সমাজসহ প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন
করতে হবে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তনে শুধু ক্ষমতার হাত বদলই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিদ্যমান অনুপযুক্ত ব্যবস্থার সংস্কার, সম্ভাবনাময় নৈতিক নেতৃত্বকে সমর্থ এবং সর্বক্ষেত্রে
কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। নইলে আবারও আমাদেরকে ইতিহাসের নির্মম সত্যের
সম্মুখীন হতে হবে, আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল হবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামো ও নিয়মনীতি
অপরিবর্তিতই থেকে যাবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে না, ন্যায়বিচার কার্যকর হবে না, দুর্নীতি রোধ হবে না। আমরা যে তিমিরে আছি, সেই তিমির মধ্যেই আটকে থাকব চরম বিপর্যয়ের আগ
পর্যন্ত।
সময় এসেছে চেতনা ও আকিদার উচ্চকণ্ঠের বাইরে গিয়ে কর্মের মাধ্যমে বাস্তবের দুনিয়ায় পরিবর্তন ঘটানোর। বাংলাদেশ আজ সোনালি আগামীর স্বপ্ন দেখছে নবীন স্বপ্নসারথিদের উদ্যম ও উদ্দীপনায়। এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের একটি স্পষ্ট পথ দরকার; আর সেই পথ হলো ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ সৃষ্টি করা। আমাদের চেতনা ও আকিদা যখন মানবিকতার আলোকে উদ্ভাসিত হবে, তখন ভিন্নমত ও বহু বর্ণিল পরিচয়ের মধ্যেও আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারব। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণ কেবল স্বপ্নে নয়, নিরন্তর কর্মে নিহিত।
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য