কর্মসংস্থান
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:১১ এএম
প্রায় ২৯ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন যার কাঁধে, সেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর যে বিশাল সংখ্যক তরুণ-তরুণী একটি নিশ্চিত জীবনের সন্ধানে বের হয় এই সংখ্যাটি আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের ২০২৫ সালের প্রাক্কলন থেকে প্রাপ্ত, তাদের স্বপ্নগুলো কেন অকালে ঝরে যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। নীতি-নৈতিকতা আর শৃঙ্খলার কঠিন বেড়িতে থেকেও এই প্রতিষ্ঠানটিই কেন দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে? বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডির ২০১৫ সালের জরিপটি যেন এক নির্মম উপহাস ছুড়ে দেয়; ওই জরিপের পরিসংখ্যান আমাদের দেখায় যে উচ্চশিক্ষিত বেকারের প্রায় ৬২ শতাংশ এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা। এই বিপুল হার আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য উন্মোচন করে : ডিগ্রি অর্জন এবং কর্মসংস্থানÑ এই দুইয়ের মধ্যে আজ এক যোজন যোজন দূরত্ব।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসর ২০২০ সালের লেবার
ফোর্স সার্ভে থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে হৃদয় কেঁপে ওঠে : স্নাতকোত্তর শেষ করার
তিন বছর পরও প্রায় ২৮.২৪ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘুরছেন। এই তথ্য
উচ্চশিক্ষার বিনিয়োগের কার্যকারিতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমনকি, বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ, ২০২২-এর ফলাফল এই পরিস্থিতির
গভীরতা নিশ্চিত করে; ওই জরিপ অনুসারে, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার এখনও ৯.৮ শতাংশের
বেশি। এই সংখ্যা আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারকদের কাছে এক নীরব আবেদন, যা প্রমাণ
করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও গুণগত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমরা চরমভাবে
ব্যর্থ হয়েছি।
এই উচ্চ বেকারত্বের পেছনে যে পঞ্চাশটি মৌলিক জিনিস দায়ী, তা
যেন শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক মারণফাঁদ। শিক্ষকের মান ও পদ্ধতির দুর্বলতা
এখানে প্রধান ভূমিকা নেয়। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানতে
পারি যে, অপ্রচলিত পাঠ্যক্রম প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ;
এই তথ্যগুলো দেখায় যে কলেজগুলো শিল্প-জগতের গতি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতি, কলেজগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবের অনুপ্রবেশ, যা বিভিন্ন সূত্রে
প্রায় ৩০ শতাংশ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের
অভাব এই শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
বিআইডিএসের ২০১৮ সালের এক গবেষণায় আমরা আবিষ্কার করি যে, গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ইংরেজিতে
কথা বলার দক্ষতা মাত্র ১২ শতাংশের; একই সঙ্গে, সিপিডির ২০১৯ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে
দেখা যায় যে আইটি ও ডিজিটাল দক্ষতার অভাব রয়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশের মধ্যে। এই করুণ
তথ্যগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরে যে, এই বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের
জন্য ন্যূনতম প্রস্তুতিও নেয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে ইন্টার্নশিপের সুযোগ
কার্যত নেই; কার্যকর ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেলের অনুপস্থিতি (যা বিআইডিএসের ২০২০ সালের
জরিপ অনুযায়ী ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর প্রধান অভিযোগ) তাদের হতাশার অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।
গ্রামীণ অঞ্চলে বেকারত্বের উচ্চ হার, যা প্রথম আলোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী
প্রায় ৭২ শতাংশÑ এই পরিসংখ্যানটি আঞ্চলিক বৈষম্যের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। নারীর ক্ষমতায়ন
সত্ত্বেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার উচ্চ, যা
প্রায় ৭৭ শতাংশ। এই বিশেষ তথ্যটি বিআইডিএস, ২০২০ সালের জরিপ থেকে প্রাপ্ত, যা লিঙ্গভিত্তিক
বৈষম্যের করুণ চিত্র তুলে ধরে।
কেন এই করুণ পরিবেশ সৃষ্টি হলো? এর পেছনে যে চল্লিশটি কারণ নিহিত,
তার প্রধান অংশ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ত্রুটি। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক
বিবেচনা, যা শিক্ষাবিদদের মতে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, শিক্ষার মানকে ক্রমাগত
নামিয়ে এনেছে। এই অব্যবস্থা জ্ঞান বিতরণের কেন্দ্রগুলোকে ক্ষমতার আখড়ায় পরিণত করেছে।
এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ৬১টি থেকে ৭০টি চ্যালেঞ্জ,
যা দক্ষতা ও মানসিকতার দুর্বলতার ফসল। বিজিএমইএর ২০২১ সালের এক জরিপে দেখা যায়, নিয়োগকর্তাদের
মতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের সফট স্কিলের
ঘাটতি রয়েছে। এই তথ্যটি স্পষ্ট করে যে, পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং নমনীয় দক্ষতার অভাবই
তাদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মূল কারণ। অন্যদিকে, শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়েও
প্রশ্ন আছে; ইউজিসির ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষকের ডিজিটাল
টুলস ব্যবহারে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। এই অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকগণ কীভাবে আধুনিক
বিশ্বের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করবেন?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা কেন করপোরেট চাকরির দিকে
না গিয়ে শুধু বিসিএসর মতো সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছে? এই প্রবণতার পেছনে যে দশটি কারণ
রয়েছে, তা সমাজ ও অর্থনীতির নিরাপত্তাহীনতা থেকে উদ্ভূত। বিআইডিএসর একটি জরিপে এই
মর্মে আমরা নিশ্চিত হই যে প্রায় ৪৩.১৩ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট সরকারি চাকরিতে আগ্রহী।
এই তথ্যটি আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, বেসরকারি খাতের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার
অভাবই এই বিপুল আকর্ষণের মূল কারণ।
সবচেয়ে কঠিন হলো সেই ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রিটিক্যাল কারণ,
যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের শুধুমাত্র সনদধারী বেকারে পরিণত করছে।
কলা ও সমাজবিজ্ঞানে প্রায় ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তির যে প্রবণতা, তা অপ্রয়োজনীয়
ডিগ্রি উৎপাদনের এক মারাত্মক প্রবণতা। অর্জিত তত্ত্বীয় জ্ঞান বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের
সুযোগ বা দক্ষতা তৈরি না হওয়া এক বড় ব্যর্থতা। বিআইডিএসর তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা
দেখতে পাই যে, মাত্র ১৬.২৪ শতাংশ স্ব-উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেখায়। এই পরিসংখ্যানটি
নির্দেশ করে যে, উচ্চশিক্ষা স্ব-উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক
স্থবিরতা আরও বাড়াচ্ছে।
এই বেকারত্বের হার রাতারাতি কমবে না, যদি না শিক্ষাব্যবস্থায়
বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়। আসুন, এবার আমরা ২০১৫ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্বের চিত্রকে একটি ধারাবাহিক প্রবাহে দেখি।
২০১৫ অর্থবছর নাগাদ আনুমানিক ৬.০০ লাখ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়েছিল,
যখন উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার ছিল ৪.৩ শতাংশ এবং এনইউ গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার
ছিল ২৫.০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি ডেটা, ২০১৫) এই তথ্য নিশ্চিত করে, যা সেই সময়েও
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান সংকটের ইঙ্গিত দিত। এরপর ২০২০
সালে আনুমানিক গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বেড়ে ৭.২০ লাখে পৌঁছে এবং কোভিড ও অর্থনৈতিক
মন্দার প্রভাবে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার ৫.৩ শতাংশ এবং এনইউ গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের
হার ২৮.০ শতাংশে উন্নীত হয়, যা বিআইডিএস, ২০২০-এর তথ্য দ্বারা সমর্থিত।
২০২২ সালে যখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা ফেরে, তখন আনুমানিক
গ্র্যাজুয়েট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭.৫০ লাখে। যদিও এই সময় উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার
সামান্য কমে ৪.৮ শতাংশ হয়, কিন্তু এনইউ গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার তখনও ২৭.০ শতাংশে
স্থির থাকে ( লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২২)। এই পরিসংখ্যান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সামগ্রিক
অর্থনীতির উন্নতি হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি
হয়নি।
২০২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আনুমানিক গ্র্যাজুয়েট সংখ্যা
৮.০০ লাখে পৌঁছবে। এই সময়ে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার ৪.৫ শতাংশ থাকলেও এনইউ গ্র্যাজুয়েট
বেকারত্বের হার ২৬.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আমাদের বিশ্লেষণ নির্দেশ করে। তবে এটিও
চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়। আশার আলো দেখা যেতে পারে, ২০৩০ সালের
প্রক্ষেপণে; যদি শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়, তবে আনুমানিক ৮.৮০ লাখ গ্র্যাজুয়েট
থাকা সত্ত্বেও এনইউ গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার ২০.০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আমাদের দৃঢ় আশা, ২০৪০ সাল নাগাদ যখন আনুমানিক ৯.৫০ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হবে, তখন
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হার কমবে এবং এনউই গ্র্যাজুয়েট বেকারত্বের হার ১২.০
শতাংশে নেমে আসবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া কোনো বিকল্প
নেই।
আমাদের এই তরুণ প্রজন্ম একটি সনদ নিয়ে পথে পথে ঘুরতে পারে না।
তাদের চোখের জল আর বুকের হাহাকার যেন আমাদের ঘুম ভাঙায়। ২০২৬ সাল থেকে ২০৫০ সালের
মধ্যে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব সংস্থারই সুনির্দিষ্ট
ভূমিকা রাখা জরুরি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত অবিলম্বে অপ্রচলিত বিভাগগুলো কমিয়ে
ভবিষ্যৎমুখী বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া। শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিশ্চিত করতে
হবে; এই বিষয়ে ইউজিসির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষকের
প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কলেজগুলোতে শক্তিশালী ক্যারিয়ার প্লেসমেন্ট সেল
প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং প্রতিবছর কমপক্ষে ৫০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটের ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত
করতে হবে।
দেশের মেরুদণ্ড এই তরুণদের হাতেই, তাদের স্বপ্নকে ব্যর্থ হতে দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎকে ব্যর্থ হতে দেওয়া। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারি। সনদ নয়, চাই মেরুদণ্ড প্রযুক্তির মশালে জ্ঞান আনো ঘরে, ব্যর্থতার বেড়ি ভেঙে কর্মযুদ্ধ কর জয়।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়