পর্যবেক্ষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৫ পিএম
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৫১ পিএম
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের একটি বড় ভূমিকা বরাবরই ছিল, আছে। সাংবাদিকতা ও রাজনীতি একটি আরেকটির সহযাত্রী। এ দুটি পেশায় যারা স্বেচ্ছাব্রতী হন, তারা দেশ, জাতি ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার অঙ্গীকার নিয়েই আসেন। সংবাদ মাধ্যম রাজনীতির অন্যতম বাহন। আর রাজনীতি সংবাদ মাধ্যমের বেঁচে থাকার অন্যতম উপাদান সরবরাহকারী একটি কর্ম। একটি রাষ্ট্রে যত খবর উৎপন্ন হয়, তার একটি বড় অংশ রাজনীতি সম্পর্কিত। আর সেসব খবর মানুষের গোচরে আনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে সংবাদ মাধ্যম। তবে এ দুই পেশার মানুষের কর্মক্ষেত্র আলাদা। একদল খবর তৈরি করে, আরেক দল তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
স্বাধীন সাংবাদিকতার কথা আমরা প্রায়ই শুনি। এই স্বাধীনতা বলতে আমরা অবশ্য বুঝি সরকার বা কোনো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপমুক্ত সাংবাদিকতা। এ স্বাধীনতার জন্য আমাদের দেশের সাংবাদিক সমাজ অতীতে অনেক লড়াই-সংগ্রাম করেছে। সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো সংবাদকর্মীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার থেকেছে। এখন তেমনটি দেখা যায় না। কারণ এখন সাংবাদিক-নেতাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। ফলে তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক দল যখন সরকারে থাকে, তারা সে দল বা সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হন। এই প্রবণতাটির কদর্যরূপ আমরা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেখেছি।
সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত একটি মতবিনিময় সভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো কাউকে (সাংবাদিকদের) পকেটে নিতে চায় না; কিন্তু তারা যদি পকেটে ঢুকে যায়, সেটা বড় সমস্যা।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সাংবাদিকদেরও অঙ্গীকার আছে। তারা সে অঙ্গীকার মোতাবেক স্বাধীন সাংবাদিকতা করবেন।’ (২৫ নভেম্বর ২০২৫-এর পত্রিকাসমূহ)। বর্তমান প্রেক্ষিতে বিএনপি মহাসচিবের মন্তব্যকে অবান্তর বলার অবকাশ নেই। কেননা, রাজনৈতিক মতাদর্শ যেভাবে সাংবাদিকতাকে গ্রাস করেছে, তাতে একটি সংবাদের সত্যতা যাচাই করা অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। কোন পত্রিকা কোন উদ্দেশ্যে সংবাদটি প্রকাশ করল, সেখানে ওই পত্রিকার সম্পাদক বা মালিকপক্ষের কী স্বার্থ রয়েছে, তা নিয়ে পাঠক মহলে এন্তার জিজ্ঞাসা জন্ম হয়। ফলে জনগণের কাছে সংবাদ তথা সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কমে গেছে। আমার এ মন্তব্যে সহকর্মী-সহযোগী কেউ কেউ নাখোশ হতে পারেন। তবে সংবাদপত্রের যারা পাঠক কিংবা টিভি চ্যানেলের যারা দর্শক, তাদের ওপর জরিপ চালালে এর সত্যতা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
আগেই বলেছি রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সম্পর্ক সাংঘর্ষিক নয়, বরং সহযোগীর। আমাদের দেশের অনেক প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ একই সঙ্গে সাংবাদিকতা জগতেও উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সম্পাদক-সাংবাদিক মাওলানা মো. আকরম খাঁ ছিলেন ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় প্রথম বাংলা দৈনিক পত্রিকা দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক ও প্রকাশক। আকরম খাঁ অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগেরও সভাপতি ছিলেন। মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ পদধারী নেতা হওয়া সত্ত্বেও পত্রিকায় তার প্রভাব পড়েনি। আবুল মনসুর আহমদ পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন আইনজীবী হিসেবে। পরে সম্পৃক্ত হন রাজনীতি ও সাংবাদিকতায়। ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক। সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন তৎকালীন দৈনিক নবযুগ ও দৈনিক কৃষকেও। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভাবশিষ্য আবুল মনসুর আহমদ ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ২১ দফার তিনি প্রণেতা। সে নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত থাকলেও তার সাংবাদিক সত্তাকে তা স্পর্শ করতে পারেনি। আবুল মনসুর আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবুল কালাম শামসুদ্দিন তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ-ভারতের কলকাতায় দৈনিক মোহাম্মদীর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে। পরবর্তীকালে ১৯৪০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ছিলেন দৈনিক আজাদের সম্পাদক। তারও পরে ১৯৬৪ সালে নিযুক্ত হন দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পত্রিকাটি দৈনিক বাংলা নামে প্রকাশিত হয়। তিনি ১৯৭২ সালে অবসর নেন। আবুল কালাম শামসুদ্দিন ছিলেন মুসলিম লীগের সক্রিয় নেতা। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি আইন পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে পাকিস্তান গণপরিষদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।
ওপরে যাদের কথা বলা হলো, তারা আমাদের সাংবাদিকতা ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রের প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ। তারা একই সঙ্গে দুটো মাধ্যমে ভূমিকা রাখলেও সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে আলাদা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের পরে আরও অনেকেই সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এ সারিতে অগ্রজ হিসেবে যে নামটি আসে তিনি নির্মল সেন। আজীবন সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োজিত থাকলেও রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত ছিলেন সমানভাবে। বামপন্থী রাজনৈতিক দল শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। সিরাজুল হোসেন খান সাংবাদিক-রাজনীতিক হিসেবে সুপরিচিত। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে সাংবাদিকতার ইতি টেনে ক্ষমতার রাজনীতিতে গা ভাসান। ১৯৮৫ সালে যোগ দেন এরশাদের জাতীয় পার্টিতে ও মন্ত্রী হন। ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময়ের আরেকজন নামকরা সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ ছিলেন আনোয়ার জাহিদ। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন তিনি। ছিলেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাধিকবারের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি। জাঁদরেল সাংবাদিক হিসেবে আনোয়ার জাহিদের খ্যাতি ছিল। কিন্তু সে খ্যাতির খাতায় কালো ছোপ এঁকেছেন নিজেই। স্বৈরশাসক এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য ও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি তার ভাবমূর্তিকে একেবারে তলানিতে নামিয়ে এনেছিলেন। সে ভাবমূর্তি আর উদ্ধার করতে পারেননি। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, উপরোক্ত ব্যক্তিগণ হয় রাজনীতি বাদ দিয়ে সাংবাদিকতায় এসেছেন, না-হয় সাংবাদিতায় ইতি টেনে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। দুটিকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি।
কিন্তু এখন আমরা কী দেখি? যিনি সাংবাদিক, তিনিই রাজনৈতিক দলের কর্মী। মাঠ সাংবাদিকতায় এখন বিভিন্ন বিষয়ের বিট রয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো রাজনৈতিক বিটও রয়েছে। রাজনৈতিক বিটের রিপোর্টারগণ যে যে দলের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন তাদের অনেকে কখনও কখনও দলীয় কর্মীর চেয়ে অধিকতর ‘পার্টিজান’ হয়ে ওঠেন। ফলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতার রাজনীতির বাতাস এমনভাবে সাংবাদিকতা জগৎকে মোহগ্রস্ত করেছে, যে সাংবাদিকদের অনেকে এখন রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাও যদি সমর্থনের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমিত থাকত তাহলে কথা ছিল না। কিন্তু সাংবাদিকদের কেউ কেউ এখন নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত করতে অনেকটাই উদগ্র। এমনও দেখা যায়, সাংবাদিকদের সংগঠনের একজন বড় নেতা একই সঙ্গে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। পাশাপাশি তিনি ওই রাজনৈতিক মতাদর্শের পেশাজীবী সংগঠনেরও শীর্ষস্থানীয় নেতা। তেমন একজনকে জানি, যিনি চট্টগ্রামের একটি সংসদীয় আসন থেকে একটি বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকে ছেঁড়েনি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, রাজনীতির ইন্দ্রজালের শিকার হয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক শওকত মাহমুদ আজ নিঃস্ব। রাজনীতির জালে জড়িয়ে নিজের পেশাগত অবস্থান যেমন হারিয়েছেন, তেমনি ছিটকে পড়েছেন রাজনীতির মল্লযুদ্ধের রিং থেকে। এখন তিনি ষড়যন্ত্র-মামলার আসামি হয়ে কারাগারে।
অবস্থা বিবেচনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা আলমগীর কিন্তু বেঠিক কিছু বলেননি। রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলেও সাংবাদিকদের অনেকেই দলগুলোর পকেটে ঢুকে পড়ে। এই ঢুকে পড়ার কারণটি অস্পষ্ট বা অজ্ঞাত নয়। রাজনৈতিক জার্সি গায়ে চড়াতে পারলে মোক্ষ লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়Ñ এ ধারণাই তাদের ও পথে যেতে উৎসাহিত করে। কেননা একবার রাজনৈতিক দলের বা দল সমর্থিত সংগঠনের কেউকেটা হিসেবে পরিচিত হতে পারলে ভাগ্য ফেরানোর আলাদিনের চেরাগটা হাতের নাগালে চলে আসে। বিগত বছরগুলোতে তো তেমনটিই দেখা গেছে। বলাটা অপ্রাসঙ্গিক নয়, যখন গণমাধ্যমে খবর বেরোয়, একজন সাংবাদিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শতকোটি টাকার লেনদেন কিংবা একজন সাংবাদিকের স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকার স্থিতি, তখন তা অন্যদের প্রলুব্ধ তো করতেই পারে। আজকাল অনেককে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মান নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা যায়। তারা নিরপেক্ষতা খোঁজেন সাংবাদিকতায়। কিন্তু সাংবাদিক-সম্পাদকরা যখন পক্ষভুক্ত হয়ে পড়েন, তখন পক্ষপাতিত্বের গভীর অরণ্যে স্বাধীন বা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা নামের সোনার হরিণ খোঁজা বাতুলতা মাত্র। সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, সাংবাদিকতাকে রাজনীতিমুক্ত না করা পর্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সন্ধান পাওয়া দুষ্কর।
কৈফিয়ত, নিবন্ধটি পাঠে পরিচিত অনেকের মনেই এর লেখক সম্পর্কে প্রশ্ন জাগতে পারে। কেননা, নিবন্ধের লেখক নিজেও একসময় একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিক ছিলেন। তবে একপর্যায়ে এসে তার বোধোদয় হয়েছে, দূর হয়েছে রাজনীতির মোহ। তিনি এখন শুধুই একজন পেশাদার সংবাদকর্মী।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সাংবাদিক ও কলাম লেখক