× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

অবহেলিত সম্পদ মাছের আঁশ

সাদেকুর রহমান

প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৫৯ পিএম

মাছের আঁশ একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত

মাছের আঁশ একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ নদী প্রধান দেশ। জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদীর কারণে এদেশে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ বিশ্বের মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। এত দিন আমরা জানতাম, মাছকে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করা যায়। কিন্তু এই বিশাল মৎস্য উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজাত পণ্য মাছের আঁশ। কিন্তু এটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত। মাছের আঁশ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। বিভিন্ন শিল্পে এটি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশের জন্য মাছের আঁশ একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হতে পারে। একটি মাছের মোট ওজনের ২-৫ শতাংশ আঁশ হিসেবে পাওয়া যায়। দেশে ৪.৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই হিসাবে বাংলাদেশ বছরে ১ লাখ  ৯০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন মাছের আঁশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

মাছের আঁশে থেকে কোলাজেন, জিলাটিন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। সাধারণত এসব উপাদান দিয়ে কসমেটিক্স পণ্য তৈরি করা হয়। এমনকি ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার হয়। মাছের আঁশে রয়েছে নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম। এগুলো জৈব সারের ভালো উৎস। জৈব সার উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। মাছের আঁশ থেকে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ রোধ মাছের আঁশ ভূমিকা রাখতে পারে। 

মাছের আঁশ থেকে তৈরি পণ্য ইতোমধ্যেই ফ্যাশন শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছে। মাছের আঁশের লেদার শুধু টেকসই নয়, পরিবেশবান্ধবও। বিশ্বব্যাপী সচেতন ভোক্তাদের কাছে এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, চীন, ভিয়েতনাম এবং জাপানে এ ধরনের আলাদা চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মাছের আঁশের নানা রকম ব্যবহার করে চলেছে। ভিয়েতনাম মাছের আঁশ থেকে লেদার তৈরি করে বিশ্ববাজারে সফলতা অর্জন করেছে। দেশটি বিশেষ করে ব্যাগ, জুতা এবং পোশাক তৈরিতে মাছের আঁশ ব্যবহার করছে। জাপানে মাছের আঁশ থেকে তৈরি কসমেটিক পণ্য বিশেষ করে ত্বকের যত্নের ক্রিম এবং ময়েশ্চারাইজার খুবই জনপ্রিয়। নরওয়ে মাছের আঁশ থেকে জৈব সার ও পশুখাদ্য তৈরি করে স্থানীয় কৃষি এবং মৎস্য খাতকে সহায়তা করছে। মাছের আঁশ দিয়ে চীনারা জিলাটিন তৈরি করে খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে কাজে লাগায়।

আমাদের দেশে মাছের আঁশ সংগ্রহ করা প্রক্রিয়া এখনও ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। আগে আমাদের দেশে বাড়িতেই মাছ কাটা হতো। ফলে মাছের আঁশকে আলাদা ব্যবহার করার চিন্তা করা হতো না। এখন সময় পরিবর্তন হয়েছে। দেশের প্রায় প্রতি বাজারেই মাছ কাটার ব্যবস্থা আছে। এসব স্থানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাছের আঁশ সঠিকভাবে সংগ্রহ করা হয় না। এ ছাড়া দেশে অনেক হোটেল, রেস্তোরাঁ রয়েছে। এগুলো থেকেই মাছের আঁশ সংগ্রহ করা হয় না। বাংলাদেশে মাছের আঁশের প্রাপ্যতা অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি। দেশের অভ্যন্তরে মাছের আঁশের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বাজার গড়ে ওঠেনি।

মাছের আঁশ ভিত্তিক উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুসারে, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৪.৯৯ মিলিয়ন ডলারের মাছের আঁশ ও বর্জ্য রপ্তানি করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই মাছের আঁশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করা হয়। 

মাছের আঁশ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে না। একই সঙ্গে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনেও ভূমিকা বাড়বে। মাছের আঁশ শিল্প গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা পরিবর্তন করে দিতে পারে। এর ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মাছের আঁশ শিল্প সরাসরি ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থানের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। এ জন্য মাছের আঁশ শিল্পের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। দেশের অপ্রচলিত রপ্তানি পণ্য হওয়ার কারণে অনেকেই এ সম্পর্কে কম জানে। সরকার জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে। মাছের আঁশ একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্প। এ কারণে সবুজ অর্থনীতি তহবিল থেকে সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

মাছের আঁশকে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি দুভাবেই কাজ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বে মাছের আঁশ শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা যেতে পারে। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ মাছের আঁশ শিল্পকে একটি টেকসই ও লাভজনক খাতে পরিণত হতে পারে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর সঙ্গে বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। এখন প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।


সাদেকুর রহমান

গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা