গণপিটুনিতে যুবক হত্যা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৫০ পিএম
এক যুবকের প্রাণ নিভে গেল রাস্তায়, মানুষের ভিড়ে, উন্মত্ততার হাতে। অভিযোগ একটাই ধর্ম অবমাননা। এই শব্দ দুটি উচ্চারিত হলেই যেন যুক্তি থেমে যায়, মানবতা পিছু হটে, আইন নিজের জায়গা হারায়। আর আমরা দাঁড়াই বিবেকের কাঠগড়ায়। প্রশ্ন জাগে, ধর্ম কি আমাদের মানুষ হত্যা করতে শিখিয়েছে? নাকি আমরা ধর্মের নামে নিজের অমানবিকতাকেই বৈধতা দিচ্ছি? একশ্রেণির ধর্মান্ধ মানুষ কি বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশকে কলঙ্কিত আসামিরূপে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়? তা না হলে কেন এই নিষ্ঠুরতা? মানুষের জন্য ধর্ম। যাদের হাতে মানুষ নিরাপদ নয়, তাদের হাতে পবিত্র ধর্ম নিরাপদ থাকতে পারে না।
২০ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ধর্ম অবমাননার
অভিযোগে গণপিটুনিতে যুবক নিহত’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, ময়মনসিংহের
ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবক স্থানীয় পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস লিমিটেড কারখানায়
লিংকিং সেকশনে কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাজ করার সময় সহকর্মীর সঙ্গে আলাপে
তিনি ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেন বলে একজন অভিযোগ তোলেন। তাৎক্ষণিক বিষয়টি কারখানার
বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের ব্যবধানে শত শত মানুষ কারখানার সামনে জড়ো হয়। তারা কারখানার
গেটের ভেতরে ঢুকে দীপুকে টেনে বের করে আনে এবং গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়। এ সময়
শিল্পপুলিশ ও ভালুকা মডেল থানা পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের
ওপরেও হামলা চালায়। পরবর্তীতে বিক্ষুব্ধরা নিহতের মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে মহাসড়কের
উভয় পাশে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি
হয়। ঘটনাটি মর্মান্তিক! এক মুহূর্তে একজন মানুষ অপরাধী ঘোষিত,
পর মুহূর্তে মৃত। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এ কোন সমাজ? এ কোন ন্যায়?
আমরা মনে করি, ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়, যার অবস্থান হৃদয়ের
গভীরে। আর বিশ্বাস কখনোই রক্ত চায় না। ধর্মের ইতিহাসে ক্ষমা, সহনশীলতা, ন্যায়বিচারÑ
এই তিনটি স্তম্ভই সবচেয়ে উঁচুতে। অথচ আজ আমরা দেখছি, সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে
এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তদন্ত নেই, বিচার নেই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ
নেই। আমরা মনে করি, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন মানুষের মৃত্যু
নয়; এটি আমাদের বিবেকের মৃত্যু। যারা লাঠি তুলেছে, যারা উস্কনি দিয়েছে, যারা নীরবে
দেখেছেÑ সবাই দায়ী। কারণ নীরবতাও অপরাধের অংশ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ যদি সত্যও হয়,
তার বিচার করবে আদালত, জনতা নয়। জনতার হাতে বিচার মানেই অরাজকতা, আর অরাজকতা মানেই
দুর্বলদের ওপর প্রবলের তাণ্ডব।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলোÑ সমাজে এই ধরনের সহিংসতা ক্রমে ‘ভয়ংকর’
হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ায়, আবেগ উস্কে
ওঠে, তারপর রক্ত ঝরে। তারপর কয়েকদিন শোরগোল, কয়েকজন গ্রেপ্তার এবং আবার ভুলে
যাওয়া। কিন্তু নিহতের পরিবার ভুলতে পারে না। একটি মায়ের কোল খালি হয়, একটি
পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যায়, একটি সমাজ আরও ভীত হয়ে পড়ে।
যে ধর্মকে রক্ষার নামে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো, সেই
ধর্মের ঐশীগ্রন্থ আল- কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা
করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য পাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে,
অন্যায় হত্যাকাণ্ড থেকে কাউকে রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষার সমতুল্য।
বাস্তবতা হলোÑ ধর্মের নামে হত্যা কোনো ধর্মেরই আদেশ হতে
পারে না। সত্যিকারের ধর্ম মানুষকে সংযত করে, ন্যায়বিচারের পথে রাখে। যারা ধর্মের
নামে সহিংসতা চালায়, তারা ধর্মকেই কলঙ্কিত করে। তাই আজ আমাদের প্রয়োজন সাহসী
অবস্থান। ধর্মীয় অনুভূতির সম্মান যেমন জরুরি, তেমনি জীবনের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে।
আইন নিজের পথে চলবেÑ এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। গুজব নয়, প্রমাণ; উন্মত্ততা নয়,
সংলাপ; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারÑ এই তিনটি নীতি হওয়া জরুরি আমাদের পথনির্দেশ।
আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইÑ দৃষ্টান্তমূলক
বিচার। এই পৈশাচিক বর্বরতার শাস্তি সভ্যতার দাবি। কেউ ধর্ম অবমাননা
করলে কিংবা কারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত করলে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হতেই পারে। আইনের
আদালতে বিচারে সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে তাকে সাজা
দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু বিনা প্রমাণে একজনের অভিযোগ শুনেই কাউকে পিটিয়ে, ঝুলিয়ে,
পুড়িয়ে মেরে ফেলার মতো নৃশংস বর্বরতা চলতে পারে না। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে
দেশ-সমাজ নৈরাজ্যে ভরে যাবে। লোকালয়কে আমরা হিংস্র শ্বাপদসংকুল অরণ্য হতে দিতে পারি
না। একই সঙ্গে চাই, সামাজিক আত্মসমালোচনা। উপলব্ধি হওয়া উচিতÑ
আমরা কি পরিবারে সহনশীলতা শেখাচ্ছি? ভিন্নমত সহ্য করার শিক্ষা দিচ্ছি? নাকি আমরা
নিজেরাই আগুনে ঘি ঢালছি?
এই মৃত্যু আমাদের চোখ খুলে দিক। আসুন, ধর্মকে
ভালোবাসিÑ তাই মানবতাকে বাঁচাই। আইনকে মানিÑ তাই বিচারকে সম্মান করি। নইলে
আগামীকাল আরেকটি নাম যুক্ত হবে লাশের তালিকায়, আর আমরা আবারও প্রশ্ন করবÑ কেন এই
নিষ্ঠুরতা!?